চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় নিয়ে প্রায় দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফেরে বিএনপি। সরকার গঠনের পর থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার পথচলার ছয় মাস (১৮০ দিন) পূর্ণ হয়েছে। শপথ নেওয়ার পর দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ শুরু করেছিল সরকার। এই ছয় মাস শেষে একদিকে সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী সফলতা ও সংস্কার কাজের অগ্রগতির দাবি করা হলেও, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা, মূল্যস্ফীতি ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ও অসন্তোষ দেখা গেছে।
ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই রাষ্ট্রীয় খরচ কমানোর সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপে নজর কাড়ে নতুন সরকার। শপথের পরপরই সংসদ সদস্যদের ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি ও প্লট সুবিধা না নেওয়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়। এ ছাড়া শপথ নেওয়ার পর থেকেই তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের ৩১ দফা এবং জুলাই জাতীয় সনদকে সামনে রেখে কাজ এগিয়ে নেওয়ার দাবি করে সরকার। জুলাই শহিদদের তালিকা প্রণয়ন, কৃষিঋণ মওকুফ এবং মসজিদ-মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরতদের সম্মানী ভাতা প্রদানের মতো জনকল্যাণমুখী কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড চালুর মতো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো সাধারণ মানুষের মাঝে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।
ক্ষমতা গ্রহণের সময় দেশের দুর্বল ব্যাংকিং খাত এবং দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতি সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং পূর্বে মার্জ করা পাঁচটি ব্যাংককে পুনরায় কার্যকরের উদ্যোগ একটি ইতিবাচক দিক। বন্ধ থাকা শিল্পকারখানা চালুর জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়েছে। তবে দীর্ঘ চার বছর ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অস্বস্তি ও অসন্তোষ এখনো রয়ে গেছে।
বর্তমান সরকারের ছয় মাসের কার্যকালে সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে কেন্দ্র করে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে তীব্র লোডশেডিং এবং জুন মাসের অস্বাভাবিক বা ‘ভূতুড়ে’ বিদ্যুৎ বিল সাধারণ গ্রাহকদের চরম বিপাকে ফেলে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক সংকট এবং এলএনজি টার্মিনালে ত্রুটির কারণে দেশজুড়ে গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এই জ্বালানি সংকটের জেরে আগস্টের শুরুর দিকে রাজধানী ঢাকায় সচিবালয় ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচি পালন করে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। সরকারের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত ব্যয়ে এলএনজি আমদানি ও সংকট সমাধানের সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে বলা হলেও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমল থেকে চলে আসা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নতুন সরকারের জন্যও বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশজুড়ে ২২০ জন নারী ও শিশু সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছে। এই ছয় মাসে ৯টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, কারাগারে ৫৫ জনের মৃত্যু, ৩৬৫টি ধর্ষণের ঘটনা এবং মব সহিংসতায় ১২০ জনের মৃত্যুর তথ্য উঠে এসেছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক সহিংসতার হার এবং নারী নির্যাতনের ঘটনা গত বছরের তুলনায় লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে। ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রদল ও শিবিরের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর হামলার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে অপরাধ বিশ্লেষকরা হতাশা প্রকাশ করেছেন।
অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের মধ্যেও সরকারের বৈদেশিক কূটনীতি বেশ প্রশংসিত হয়েছে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়াকে দেশের বড় কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। এ ছাড়া গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। চীনের সঙ্গে ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর, তিস্তা প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডিতে তাদের অংশগ্রহণ এবং অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব দেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়াদিল্লিতে প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনের প্রেক্ষাপটে ভারতের সঙ্গে প্রস্তাবিত সফর আপাতত স্থগিত রেখেছে ঢাকা।
রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ক্ষেত্রে ৩১ দফার লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ অর্জিত হয়েছে বলে দাবি করছে সরকার। তবে জুলাই সনদের গণভোটের রায় বাস্তবায়নে শৈথিল্য এবং স্বাধীন বিচার বিভাগ, পুলিশ ও মানবাধিকার কমিশন গঠনে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় রাজনৈতিক মহলে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। সংস্কার ও সুশাসনের দাবিতে এরই মধ্যে জামায়াত-এনসিপি জোট মাঠের আন্দোলনে নেমেছে। সব মিলিয়ে, সরকারের প্রথম ছয় মাস নানা নীতিগত উদ্যোগ ও বৈদেশিক সফলতার পাশাপাশি বহুমুখী অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাতেই কেটেছে।
সময়ের আলো/জেডি