প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে বেশ কয়েক দিন কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রধানমন্ত্রীর এই সফর নিয়ে সম্ভাব্য সময় জানিয়ে একের এক খবর প্রকাশ করেছে।
কিন্তু গতকাল রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপত্র এ কে এম শহীদুল করিম প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, অনূকূল পরিবেশ না হলে ভারত যাবেন না প্রধানমন্ত্রী। সেই অনূকুল পরিবেশ তৈরি করতে হলে দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত প্রত্যর্পণ চুক্তির মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ড নিয়ে ভারতে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে হবে। একই সঙ্গে হস্তান্তর করতে হবে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদির সন্দেহভাজন হত্যকারীদেরও।
মুখপাত্র জানান, বাংলাদেশ ও ভারতের কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারতে একটি দ্বিপক্ষীয় সফরের সম্ভাবনা নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। তবে দিল্লিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য মতবিনিময়ের ফলে এই প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হয়েছে। যিনি মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।
শহীদুল করিম বলেন, আমরা এই বিষয়ে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করছি। আমরা মনে করি, এই সফরের জন্য একটি অনূকূল পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। সে জন্য আমরা ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছি শেখ হাসিনা ও অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের প্রত্যর্পণে যেন আমাদের অনুরোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেন।
তিনি বলেন, আমাদের দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শহিদ ওসমান হাদির অভিযুক্ত খুনিদের বাংলাদেশের হাতে তুলে দিতে হবে। আমরা তাদের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় আছি। আমরা আবারও বলছি, আমরা সার্বভৌম সমতা ও জাতীয় মর্যাদায় একে অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যেন হস্তক্ষেপ না করি। পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে আমাদের প্রতিবেশীসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি অনুসরণ করে যাব।
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে থাকা ও এ দেশ থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো নিয়ে আপত্তি রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের। এ টানাপোড়েনের আবহে সম্প্রতি ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত দীনেশ ত্রিবেদী। জুন মাসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পর সেটিই ছিল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দীনেশের প্রথম সাক্ষাৎ। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পরেই দিল্লি যান দীনেশ।
গত মঙ্গলবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। তবে বৈঠকে কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে তা প্রকাশ্যে আনেননি বাংলাদেশের ভারতীয় দূতাবাস। এমনকি দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সাক্ষাতের বিষয় নিয়ে কিছু জানায়নি। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে যে আলোচনা হয়েছে তার একটি সারসংক্ষেপ উপস্থাপনা করা হয়েছে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে।
আগামী সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন। ওই সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে দিল্লি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেবেন না বলে আভাস পাওয়া যায়। তবে দুই দেশের মধ্যে একটি দ্বিপক্ষীয় সফর করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সরকারের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা চেয়েছিল আগস্ট মাসের শেষের দিকে যেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফর করেন। কিন্তু আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এসএসিও সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কিরঘিজস্তান সফরে যাচ্ছেন। তাই ঢাকার পরিকল্পনা বাতিল হয়ে যায়। আবার জাতিসংঘের সাধারণ সভার সভাপতি হিসেবে দায়িত্বভার নিতে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নিউইয়র্ক যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। এ কারণে আগস্টের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়টি চূড়ান্ত করতে চেয়েছিল বাংলাদেশ ও ভারত।
জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের শপথ নেওয়ার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ভারতের লোকসভার স্পিকার ঢাকায় এসেছিলেন। সে সময় তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে তাকে ভারত সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা গত ৫ আগস্ট নতুন দিল্লিতে প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনের যেভাবে কথা বলেছেন তাতে এ প্রক্রিয়ার পরিবেশ বিনষ্ট হয়েছে। এ কারণে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরের আগে অনূকূল পরিবেশ তৈরিতে দিল্লিকে বার্তা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে ভারত সরকারের এক শীর্ষ কমর্কতা বলেছেন, প্রত্যর্পণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে আমাদের আদালত। এটি কোনো কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হবে না।
২০১৩ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যে প্রত্যর্পণ চুক্তি হয়েছিল সে অনুযায়ী সব নথি যুক্ত করেই বাংলাদেশ মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত হাসিনাকে ফেরত চেয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। এরপর দ্ইু বছরের বেশি সময় ধরে তিনি সেখানেই আছেন। বর্তমানে তিনি দিল্লির একটি রেস্ট হাউসে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
সময়ের আলো/এসএকে