আস্থা ফেরাতে দিল্লিকেই এগিয়ে আসতে হবে

এমএকে জিলানী

জাতীয়

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি ও ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে তৈরি হয় নতুন বাস্তবতা। দেখা

2026-08-21T02:00:48+00:00
2026-08-21T02:00:48+00:00
 
  শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬,
৬ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
আস্থা ফেরাতে দিল্লিকেই এগিয়ে আসতে হবে
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে টানাপোড়েন
এমএকে জিলানী
প্রকাশ: শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬, ২:০০ এএম 
প্রতীকী ছবি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি ও ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে তৈরি হয় নতুন বাস্তবতা। দেখা দেয় অবিশ্বাস ও টানাপোড়েন। তবে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কে ফের স্বাভাবিকতা ও উন্নতির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু সেই আশার মধ্যেই ৫ আগস্ট দিল্লিতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিতর্কিত রাজনৈতিক বক্তব্য নতুন করে অস্বস্তি ও জটিলতা তৈরি করেছে। ঢাকার পক্ষ থেকেও ওই বক্তব্যকে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে— দুই দেশের সম্পর্কে যে অবিশ্বাসের দেয়াল তৈরি হয়েছে, তা ভাঙার উদ্যোগ নেবে কে? সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক ও আস্থার ভিত্তিতে ফিরিয়ে আনতে হলে দিল্লিকেই এ ক্ষেত্রে আরও সক্রিয় ও ইতিবাচক ভূমিকা নিতে হবে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, দিল্লিকে একাধিকবার স্পষ্ট বার্তা দিয়ে ঢাকা জানিয়েছে, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায় এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক গড়তে চায়, নির্দিষ্ট কোনো দল বা ব্যক্তির সঙ্গে নয়। কিন্তু ভারত বাংলাদেশের এ বার্তার প্রতি কোনো সম্মান দেখায়নি। ঢাকার বার্তা আমলে নিলে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত ফাঁসির আসামি শেখ হাসিনাকে গত ৫ আগস্ট ভারতের মাটিতে বসে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কথা বলতে দিত না দিল্লি। এমন ঘটনায় ভারত বাংলাদেশের আস্থা হারিয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চলতি আগস্টে ভারত সফরের কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। এমন ঘটনায় দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কে নতুন সংকট ও জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। এই সংকট ও জটিলতা নিরসনে ভারতকেই এগিয়ে আসতে হবে এবং আস্থার সম্পর্ক গড়তে হবে।


প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশে দেড় হাজারের বেশি মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর অপরাধী হিসেবে ভারতে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেওয়া, ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনাকে সেখানে রাজনৈতিক কিংবা মিডিয়াতে কথা বলার সুযোগ দেওয়া ভারতের গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার পরিপন্থী। ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যেকোনো অস্থিতিশীল তৎপরতা চালানো কিংবা দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি, সন্ত্রাসী বা খুনিকে স্পেস দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষকে গভীরভাবে ক্ষুব্ধ করেছে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী দিল্লি এটিকে কোনোভাবেই যৌক্তিক প্রমাণ করতে পারে না। সেই সঙ্গে তা কোনো অবস্থাতেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অজুহাতে জাস্টিফাই করা যায় না। এ বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক আইনি দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সরকার ইতিমধ্যে নয়াদিল্লির কাছে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানিয়েছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশবিরোধী যেকোনো অপতৎপরতা বন্ধে কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকবে।

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে গুঞ্জন থাকলেও সুনির্দিষ্ট জাতীয় স্বার্থ ও ঐকমত্য ছাড়া বাংলাদেশ এ মুহূর্তে কোনো তাড়াহুড়ো না করার নীতি গ্রহণ করেছে। তাড়াহুড়ো করে নয়; বরং দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনা এবং সম্মানজনক আমন্ত্রণ প্রস্তাবের ভিত্তিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর অনুষ্ঠিত হতে পারে। দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের শীর্ষ পর্যায়ের সফরের বিষয়টি ভারতের বর্তমান নেতৃত্বের মাইন্ডসেট (মানসিকতা) বা দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করছে। বাংলাদেশে দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের ম্যান্ডেট নিয়ে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে ভারত কী ধরনের সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করতে চায়— তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। জাতীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে তাড়াহুড়ো করে কোনো শীর্ষ সফর করার যুক্তি নেই। সুনির্দিষ্ট বিষয়ে উভয় দেশের ঐকমত্য এবং সম্মানজনক আমন্ত্রণ প্রস্তাবের ভিত্তিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হওয়া ছাড়া আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা অনেকটা ক্ষীণ।

এদিকে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি ভারতীয় বার্তা সংস্থা এএনআইকে বলেন, বাংলাদেশ সরকার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের সঙ্গে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি যুক্ত করার চেষ্টা করছে— এটা খুবই বিস্ময়কর। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে বিবৃতি বা ফেসবুক পোস্ট দিয়েছে, সেটি খুবই রূঢ় ও অহংকারী। এমন পরিস্থিতি তৈরি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে আলোচনা এখনও চলছে এবং সফরের তারিখ ও অন্যান্য প্রস্তুতি নিয়ে কাজ হচ্ছে।

ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রির এমন মন্তব্যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে সাবেক রাষ্ট্রদূত শহীদুল হক সামাজিকমাধ্যম এক্স হ্যান্ডেলে বৃহস্পতিবার বলেন, ‘কে বলেছে? সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক ছিলেন সেইসব স্থপতিদের একজন, যারা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করেছিল এবং যেকোনো উপায়ে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখতে সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করেছিল। তিনি ছিলেন অহংকারী, কুৎসা রটনাকারী, অজ্ঞ, ভণ্ড এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত। একজন কট্টরপন্থি হিন্দুত্ববাদের প্রতীক!’


অন্যদিকে বীণা সিক্রির মন্তব্যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে সাবেক রাষ্ট্রদূত শহীদুল ইসলাম সামাজিকমাধ্যম এক্স হ্যান্ডেলে বৃহস্পতিবার বলেন, ‘ঢাকায় কর্মরত থাকাকালীন মিসেস সিক্রি নিজেই খুব অভদ্র এবং অহংকারী ছিলেন। মনে হচ্ছে কালোর আর কোনো রং বদলাবে না। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনি একেবারেই অযোগ্য।’

ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎ শেষে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘ওনারা আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে দাওয়াত দিয়েছেন, এটা শুধু বলেছেন। তারা আশা করছেন তিনি যাবেন।’

সাবেক রাষ্ট্রদূত রাশেদ আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, কূটনীতিতে সারাজীবনের বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নেই। কিন্তু প্রতিবেশী সবসময় একই থাকবে, এটা বদলাবে না। ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে নিকটতম প্রতিবেশী এবং বাংলাদেশের দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনা এখন ভারতের আশ্রয়ে আছেন। বাংলাদেশের মানুষ আশা করে, দিল্লি প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনাকে ঢাকার কাছে হস্তান্তর করবে। তবেই সম্পর্কে গতি ফিরবে। দুই প্রতিবেশীর মধ্যে পানি, জ্বালানিসহ একাধিক ইস্যুতে অনেক কাজ করার আছে। কিন্তু তার আগে দুই পক্ষের মধ্যে সহায়ক পরিবেশ গড়ে না উঠলে কিছুই করা সম্ভব হবে না। চলমান প্রেক্ষাপটে ভারত যে অবিশ্বাসের পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে তাতে দিল্লির ওপর আস্থা রাখা যায় না। আস্থার সম্পর্ক ফেরাতে হলে ভারতকেই এগিয়ে আসতে হবে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা


  বিষয়:   বাংলাদেশ  ভারত  টানাপোড়েন  দিল্লি  ঢাকা  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: