অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নতুন বসতি নির্মাণ পরিকল্পনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও কানাডা। দেশগুলো এই পরিকল্পনাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ উল্লেখ করে তা অবিলম্বে প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে পাঁচ দেশ জানায়, পশ্চিম তীরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘ই১’ এলাকায় প্রায় ১ হাজার ২০০টি বসতবাড়ি নির্মাণের জন্য ইসরায়েল যে দরপত্র আহ্বান করেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
বিবৃতিতে বলা হয়, পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনের এমন উদ্যোগ শান্তির সম্ভাবনাকে আরও দূরে সরিয়ে দেবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের অবস্থানকে আরও দুর্বল করবে।
জাতিসংঘের মহাসচিবও পৃথক বিবৃতিতে ই১ প্রকল্পকে একটি সংযুক্ত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য ‘অস্তিত্বের হুমকি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
জেরুজালেমের পূর্বদিকে অবস্থিত ই১ এলাকায় ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে বসতি নির্মাণের পরিকল্পনা করে আসছে। আন্তর্জাতিক চাপের কারণে কয়েক দশক ধরে ওই এলাকায় বড় ধরনের নির্মাণকাজ থেকে বিরত ছিল দেশটি।
ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলের অনেক মিত্রের আশঙ্কা, ই১ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পশ্চিম তীর কার্যত উত্তর ও দক্ষিণ অংশে বিভক্ত হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে পূর্ব জেরুজালেম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে একটি স্বাধীন ও সংযুক্ত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে।
বুধবার ইসরায়েলের আবাসন মন্ত্রণালয় ই১ এলাকায় ১ হাজার ২৩৪টি আবাসন ইউনিট নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করে। গত বছরের আগস্টে ইসরায়েলি সরকার মোট ৩ হাজার ৪০১টি আবাসন ইউনিট নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছিল। নতুন দরপত্র তারই একটি অংশ।
প্রকল্পটির আওতায় পূর্ব জেরুজালেম ও ইসরায়েলি বসতি মালে আদুমিমের মধ্যবর্তী প্রায় ১২ বর্গকিলোমিটার এলাকা রয়েছে।
এলাকায় বসবাসকারী বেদুইন ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি শান্তিকামী গোষ্ঠীগুলো আদালতে প্রকল্পটির বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। তবে সেই আইনি চ্যালেঞ্জের মধ্যেই দরপত্র প্রকাশ করা হয়েছে।
ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী ও বসতি স্থাপনপন্থী নেতা বেজালেল স্মোটরিচ এর আগে ই১ প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রকাশের সময় বলেছিলেন, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা ‘মুছে ফেলা হচ্ছে’।
ই১ প্রকল্পের দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় আগামী ১৯ অক্টোবর। এর মাত্র আট দিন পর, ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নির্বাচনের আগে দরপত্রের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হলে ভবিষ্যতের কোনো সরকার চাইলে তা বাতিল করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পর পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম দখলে নেয় ইসরায়েল। ফিলিস্তিনিরা পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও গাজা নিয়ে ভবিষ্যৎ স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি করে আসছে।
বর্তমানে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে প্রায় ১৬০টি ইসরায়েলি বসতিতে প্রায় ৭ লাখ ইহুদি বসবাস করছেন। তাদের পাশাপাশি পশ্চিম তীরে প্রায় ৩৩ লাখ ফিলিস্তিনি বসবাস করেন।
আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক বিরোধিতা সত্ত্বেও ধারাবাহিকভাবে ইসরায়েলি সরকারগুলো এসব বসতি সম্প্রসারণের অনুমতি দিয়ে আসছে। তবে ২০২২ সালের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কট্টর ডানপন্থী ও বসতিপন্থী জোট নিয়ে ক্ষমতায় ফেরার পর বসতি সম্প্রসারণের গতি আরও বেড়েছে।
ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ বলে বিবেচিত হলেও ইসরায়েল এ অবস্থানকে স্বীকার করে না।
ই১ প্রকল্পের বিরোধীরা বলছেন, এটি বাস্তবায়িত হলে পশ্চিম তীরের উত্তর ও দক্ষিণ অংশের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে রামাল্লা, পূর্ব জেরুজালেম ও বেথলেহেমকে যুক্ত করে একটি সংযুক্ত ফিলিস্তিনি নগরাঞ্চল গড়ে তোলার সম্ভাবনাও নষ্ট হবে।
সময়ের আলো/কেএইচ