ডারউইনে বাংলাদেশ ইতিহাস লিখেছে। ম্যাকাইয়ে সেই ইতিহাসকে নতুন করে লেখার সুযোগ। প্রথম টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারানোর পরও যেন গল্পটা শেষ হয়নি, বরং শুরু হয়েছে নতুন এক অধ্যায়। কারণ এবার বাংলাদেশের সামনে এমন এক কীর্তির হাতছানি, যা অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ১৪০ বছর ধরে কেউ করতে পারেনি।
প্রথম টেস্টের সাড়ে তিন দিন ধরে অনেকেই হয়তো ভেবেছিলেন, অস্ট্রেলিয়া শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনোভাবে ঘুরে দাঁড়াবে। ঘরের মাঠের অভিজ্ঞতা, বিশ্বমানের বোলিং আক্রমণ কিংবা কঠিন পরিস্থিতিতে ম্যাচ বের করে নেওয়ার পুরোনো অভ্যাস, কিছু একটা করে স্বাগতিকরা ম্যাচটা নিজেদের করে নেবে।
কিন্তু প্রতিটি দিন পেরোনোর সঙ্গে সেই আশা আরও দূরে সরিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। স্টিভেন স্মিথ বাংলাদেশের পেসারদের সামনে প্রথম দিনেই ব্যর্থ হয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত বোলিং আক্রমণ বাংলাদেশের লিড ২০০ রানের নিচে আটকে রাখতে পারেনি। এরপর দ্বিতীয় ইনিংসে মেহেদী হাসান মিরাজের অফস্পিনে আবারও ধসে পড়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং। সবশেষে বাংলাদেশের লোয়ারঅর্ডারের ব্যাটারদের সঙ্গে মিরাজের প্রতিরোধ অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের ১৩৮ ওভার মাঠে আটকে রাখে।
এই জায়গাটিই হয়তো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন। শুধু দুইবার অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং ধসিয়ে দেওয়া নয়, তাদের বোলিং আক্রমণকেও দীর্ঘ সময় ধরে ক্লান্ত করে দিয়েছে বাংলাদেশ। তাই এবার ম্যাকাইয়ে যাওয়ার আগে বাংলাদেশের কোচ ফিল সিমন্স সতর্ক। ডারউইনের জয় উদযাপন করার সুযোগ থাকলেও সামনে যে আরও কঠিন অস্ট্রেলিয়া অপেক্ষা করছে, সেটি তিনি জানেন।
স্বাগতিকরা ‘আরও কঠিনভাবে’ ফিরবে, এমন সতর্কবার্তাও দিয়েছেন তিনি। ম্যাকাই টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার সামনে ঘুরে দাঁড়ানো ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পথ নেই। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দলগুলোর একটি তারা। অ্যাশেজ তাদের হাতে, ভারতের বিপক্ষেও সিরিজ জয় আছে। সর্বশেষ দুই বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালেও খেলেছে তারা। চলমান চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট তালিকাতেও শীর্ষে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া।
কিন্তু এসবই ডারউইন টেস্টের আগে সত্য ছিল। তবু সেই ম্যাচে দিন গড়ানোর সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ব্যবধান তত বাড়িয়েছে বাংলাদেশ। এখন ম্যাকাইয়ে অস্ট্রেলিয়ার সামনে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই, বাংলাদেশের সামনে সেই ব্যবধান আরও বাড়ানোর সুযোগ। ম্যাকাইয়ে সর্বশেষ প্রথম শ্রেণির ম্যাচ হয়েছিল ২০২৪ সালের নভেম্বরে।
সেই ম্যাচে ভারত ‘এ’ ১০৭ রানে এবং অস্ট্রেলিয়া ‘এ’ ১৯৫ রানে অলআউট হয়েছিল। মিডিয়াম পেসার ব্রেন্ডন ডগেট ও মুকেশ কুমার নিয়েছিলেন ছয়টি করে উইকেট। পরে অবশ্য উইকেট ব্যাটিংয়ের জন্য সহজ হয়ে এসেছিল। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ভারত অনূর্ধ্ব-১৯ দল ম্যাকাইয়ে একটি যুব টেস্ট জিতেছিল মাত্র দুই দিনেরও কম সময়ে। সেই ম্যাচে ভারতীয় পেসাররা নিয়েছিলেন ১৩ উইকেট, প্রতিটি উইকেটের জন্য গড়ে ১০ রানেরও কম খরচ করে।
ম্যাকাইয়ের উইকেটে এমন সহায়তা পেলে বাংলাদেশের পেসারদের জন্য সেটি হতে পারে বড় সুবিধা। তাসকিন আহমেদ, হাসান মাহমুদ ও ইবাদত হোসেন নিশ্চয়ই এমন কন্ডিশনের অপেক্ষায় থাকবেন। এর সঙ্গে যোগ হতে পারেন শরিফুল ইসলাম। চোটের কারণে ডারউইনে ইতিহাসের অংশ হতে পারেননি বাঁহাতি এই পেসার। ফিট হয়ে এখন তিনি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে মাঠে নামার জন্য প্রস্তুত। শরিফুল খেললে কন্ডিশন বিবেচনায় ইবাদত কিংবা তাইজুল ইসলামকে জায়গা ছেড়ে দিতে হতে পারে। ডারউইনের পর অস্ট্রেলিয়া অবশ্য বড় কোনো পরিবর্তনের পথে হাঁটেনি।
আপাতত স্কোয়াডে একটিই পরিবর্তন। ব্যর্থ জ্যাক ওয়েদারাল্ড বাদ পড়েছেন, তার জায়গায় দলে এসেছেন ম্যাট রেনশ। রেনশর ক্যারিয়ারও বেশ বিচিত্র। ২০১৮ সালের মধ্যে ১১ টেস্ট খেলে বাদ পড়েন। ২০২৩ সালে আরও তিনটি টেস্ট খেলে আবার হারিয়ে যান।
২০২৫ সালের শেষ দিকে ওয়ানডে অভিষেক, একই বছরের শুরুতে টি-টোয়েন্টি অভিষেক, আর এবার ৩০ বছর বয়সে সিরিজের মাঝপথে টেস্ট দলে প্রত্যাবর্তন। বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাকাইয়ে সেই রেনশই এবার ট্রাভিস হেডের সঙ্গে ওপেন করবেন। ক্যামেরন গ্রিনের দ্বিতীয় ইনিংসের সেঞ্চুরি এবং মর্নাস লাবুশেনের ব্যর্থতার কারণে অস্ট্রেলিয়ার আলোচনায় দুই ভিন্ন গল্প তৈরি হয়েছে। গ্রিনের ইনিংস তাকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে, কিন্তু লাবুশেনের রানখরা এখনও বড় প্রশ্ন।
অস্ট্রেলিয়ার সামনে দীর্ঘ ও ব্যস্ত টেস্ট মৌসুম পড়ে আছে। সেই কারণে পেসারদের ওপর বাড়তি চাপ এড়াতে পারত অজিরা। তবে ডারউইনে হারের পর স্কট বোলান্ডকে একাদশে আনা ও নাথান লায়নকে বাদ দিয়ে পুরোপুরি পেসনির্ভর আক্রমণের কথা ভাবতেও পারেনি স্বাগতিকরা। ডারউনের পর অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত একটি কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, ‘আমরা এখানে একটি টেস্ট খেলতে আসিনি, দুটি টেস্ট খেলতে এসেছি।’
সেই কথার বাস্তব প্রমাণ দেওয়ার সময় এখনই। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দুই টেস্টের সিরিজ ২-০ ব্যবধানে জেতার ঘটনা সর্বশেষ ঘটেছিল ১৮৮৬-৮৭ সালের অ্যাশেজে। ইংল্যান্ড সেই সিরিজ ২-০ ব্যাবধানে জিতেছিল। পরের বছর ১৮৮৭-৮৮ সালের অ্যাশেজেও একটি মাত্র টেস্ট জিতেছিল তারা। এরপর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোনো দল পুরুষদের দুই টেস্টের সিরিজে স্বাগতিকদের হোয়াইটওয়াশ করতে পারেনি।
অর্থাৎ বাংলাদেশের সামনে শুধু সিরিজ জয়ের সুযোগ নয়, এমন একটি ইতিহাস গড়ার সুযোগ, যার শিকড় ডন ব্র্যাডম্যানের জন্মেরও আগের সময় পর্যন্ত বিস্তৃত। তবে বাংলাদেশের দৃষ্টি শুধু অস্ট্রেলিয়ার সিরিজেই আটকে নেই। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপেও বড় স্বপ্ন দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের পয়েন্ট শতাংশ ৬৬.৬৭। বাকি আট টেস্টের মধ্যে চারটি জিততে পারলে সেটি ৬০ শতাংশের ওপরে থাকবে। পাঁচটি জয় এলে পয়েন্ট শতাংশ দাঁড়াবে ৬৯.৪৪, যা ফাইনালে ওঠার জন্য প্রায় নিশ্চিত অবস্থান তৈরি করতে পারে।
বাকি সূচিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঘরের মাঠে দুটি করে টেস্ট রয়েছে বাংলাদেশের। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাকাইয়ে জয় এবং এরপর ঘরের মাঠের ম্যাচগুলো থেকে পূর্ণ পয়েন্ট পেলে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের পথ অনেকটাই খুলে যাবে। শুনতে হয়তো এখনও অনেক দূরের স্বপ্ন মনে হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য ডারউইনের আগেও তো অস্ট্রেলিয়াকে তাদের মাটিতে হারানো ছিল তেমনই এক অসম্ভব কল্পনা।
ডারউইনে বাংলাদেশ অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। এবার ম্যাকাইয়ে সামনে আরও বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশ কি শুধু অস্ট্রেলিয়াকে হারাবে, নাকি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ১৪০ বছরের পুরোনো এক ইতিহাসও বদলে দেবে?
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও