জনবল সংকটে স্থবির জাবির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দফতর

হাবিবুর রহমান সাগর, জাবি

শিক্ষা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) অ্যাকাডেমিক জীবনের প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি যেন নিয়মিত অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে। অ্যাকাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট, নম্বরপত্র,

2026-08-22T15:31:21+00:00
2026-08-22T15:31:21+00:00
 
  শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬,
৭ ভাদ্র ১৪৩৩
শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬
শিক্ষা
জনবল সংকটে স্থবির জাবির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দফতর
হাবিবুর রহমান সাগর, জাবি
প্রকাশ: শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬, ৩:৩১ পিএম 
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি : সময়ের আলো
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) অ্যাকাডেমিক জীবনের প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি যেন নিয়মিত অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে। অ্যাকাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট, নম্বরপত্র, সনদ কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রের জন্য পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ে আবেদন করার পর নির্ধারিত সময়ে সেবা না পাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এর পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে দফতরটির দীর্ঘস্থায়ী জনবল সংকট।

শুধু নথিপত্র সরবরাহেই নয়, পর্যাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভাবে বিভিন্ন বিভাগের ফলাফল প্রস্তুত ও প্রকাশেও বিলম্ব হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে। একই সঙ্গে আটকে যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত ‘সম্পূরক আর্থিক সাহায্য’ বৃত্তির কার্যক্রমও। ফলে একটি দফতরের জনবল সংকটের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রেও।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ১২টি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে একজন উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বর্তমানে পিআরএলে আছেন। অন্যদিকে, সর্বশেষ ২০১৬ সালে একজন কম্পিউটার অপারেটর নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলেও সেই নিয়োগ প্রক্রিয়াও এখনো সম্পন্ন হয়নি।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৬টি বিভাগ ও চারটি ইনস্টিটিউটের পরীক্ষার ফলাফল প্রস্তুত ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব এই দফতরের। সীমিত জনবল দিয়ে বিপুল পরিমাণ কাজ সামাল দিতে গিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। দপ্তরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে দুই থেকে তিনজনের কাজ একজনকে সামলাতে হচ্ছে। এতে কাজের গতি কমার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সেবাপ্রাপ্তিতেও তৈরি হচ্ছে বিলম্ব।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কার্যালয় থেকে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহে জরুরি আবেদনের ক্ষেত্রে সাধারণত পাঁচ দিন এবং জরুরি নয় এমন আবেদনের ক্ষেত্রে ১৫ দিন সময় নির্ধারিত রয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অনেক সময় নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত নথি হাতে পাওয়া যায় না।

এমনকি আবেদন জমা দেওয়ার পরও কাজের অগ্রগতি জানতে বা নথি সংগ্রহ করতে একাধিকবার কার্যালয়ে আসতে হয় বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। এতে একদিকে সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে দূর-দূরান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীদের বাড়তি অর্থ ও শ্রম ব্যয় হচ্ছে।


বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১ ব্যাচের শিক্ষার্থী শিমুল বলেন, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিসে গেলেই ভোগান্তির কথা মনে হয়। সনদ উত্তোলন কিংবা পরীক্ষায় বসার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজ জমা দিতে একাধিকবার আসতে হয়। প্রশাসন ও জাকসুর পক্ষ থেকে অফিসের অটোমেশনের কথা বারবার বলা হলেও এখনো কার্যকর সমাধান হয়নি।

তিনি আরও বলেন, দেড় বছর আগে প্রকাশিত দ্বিতীয় বর্ষের বৃত্তির টাকা এখনো পাইনি। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিসের কার্যক্রমে বিলম্বের কারণে শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তাও সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না।

একজন স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী বলেন, স্নাতকোত্তরে ওঠার পরও তৃতীয় বর্ষের বৃত্তির ফলাফল কিংবা টাকা— কোনোটিই তিনি পাননি। তার ভাষায়, বৃত্তির উদ্দেশ্যই হলো শিক্ষার্থীদের আর্থিকভাবে সহায়তা করা। কিন্তু দুই-তিন বছর পর সেই অর্থ হাতে এলে তার কার্যকারিতা অনেকটাই কমে যায়। ফলাফল প্রকাশের পর আবার পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিসে গিয়ে টাকা পাওয়ার জন্য দৌড়াতে হবে কি না, সেটিও অনিশ্চিত।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বৃত্তির অর্থ সময়মতো না পাওয়ার কারণে যাদের জন্য এই আর্থিক সহায়তা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তারাই কাঙ্ক্ষিত সময়ে সুবিধাটি পাচ্ছেন না।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক আবু উবায়দা বলেন, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংকট রয়েছে। প্রায় ১২টি পদ শূন্য থাকায় স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব শিক্ষার্থীদের সেবার ওপর পড়ছে।

তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনকে একাধিকবার অবহিত করা হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ফলে শিক্ষার্থীদেরই এর খেসারত দিতে হচ্ছে।

সম্পূরক বৃত্তির ফল প্রকাশে বিলম্বের বিষয়ে তিনি বলেন, বৃত্তির তালিকা প্রকাশের আগে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের অনুমোদন ও স্বাক্ষরের প্রয়োজন হয়। এ- সংক্রান্ত কাজের সঙ্গে আগে উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক সালাম সাহেব যুক্ত ছিলেন। তিনি অবসরে যাওয়ার পর অভিজ্ঞ জনবলের অভাবে কাজটি আরও জটিল হয়ে পড়ে।

আবু উবায়দার দাবি, সালাম সাহেবকে সাময়িকভাবে কাজে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সম্মানী চূড়ান্ত না হওয়ায় তিনি এখনো কাজে যোগ দেননি। ফলে বর্তমানে দুজন অপেক্ষাকৃত অনভিজ্ঞ কর্মকর্তার ওপর দায়িত্ব পড়েছে। এতে বৃত্তির কাজেও বিলম্ব হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

সম্পূরক আর্থিক সাহায্য বৃত্তির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা ও বৃত্তি শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার লুৎফর রহমান আরিফ বলেন, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় ফলাফল পেতে দেরি হওয়ায় বৃত্তির কার্যক্রমও পিছিয়েছে।

তিনি বলেন, মাত্র একটি বর্ষের ফলাফল আমাদের হাতে এসেছে। সব বর্ষের ফলাফল পাওয়া গেলে বৃত্তির ফলাফল ঘোষণা করা হবে। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কানিজ ফাতেমা বলেন, প্রতিটি শিক্ষাবর্ষের ‘সম্পূরক আর্থিক সাহায্য’ ফলাফল প্রকাশের পরপরই দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে বিভিন্ন বিভাগের পরীক্ষা ও ফলাফল প্রকাশে বিলম্বের কারণে পুরো প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সালাম অবসরে যাওয়ায় কাজটি আরও বিলম্বিত হয়েছে।

জনবল সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের অফিসে প্রায় ১২ জনের মতো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংকট রয়েছে। লোকবল ও পর্যাপ্ত জায়গা— দুই ধরনের সংকটই আছে। ফলে আমরা কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারছি না। যারা কর্মরত আছেন, তাদের ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। অনেক সময় দুই-তিনজনের কাজ একজনকে করতে হচ্ছে। এতে কাজের গতি কমছে এবং শিক্ষার্থীরাও ভোগান্তিতে পড়ছেন।

জনবল নিয়োগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, শুধু পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কার্যালয় নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দপ্তরেই জনবল সংকট রয়েছে।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির কোনো কর্মকর্তা নিয়োগ হয়নি। সর্বশেষ ইউজিসি থেকে মাত্র চারটি পদের অনুমোদন এসেছিল। তবে সংকট বিবেচনায় প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত নিয়োগের ব্যবস্থা করা হবে।

তবে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, শুধু নিয়োগের আশ্বাস নয় পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের দীর্ঘদিনের জনবল সংকট নিরসনের পাশাপাশি সেবাব্যবস্থাকে অটোমেশনের আওতায় এনে দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করা হবে। কারণ অ্যাকাডেমিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ নথি কিংবা প্রাপ্য আর্থিক সহায়তা পেতে শিক্ষার্থীদের বারবার একটি দফতরের দরজায় ঘুরতে হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক প্রশাসনিক ব্যবস্থার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সে প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে।

সময়ের আলো/জোই


  বিষয়:   জনবল সংকট  স্থবির  জাবি  পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক  দফতর  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
শিক্ষা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: