ম্যাকাইয়ের সকালটা যেন পুরোনো কোনো দুঃস্বপ্নের পুনরাবৃত্তি। ম্যাচের প্রথম বলেই উইকেট, এরপর মিচেল স্টার্কের তাণ্ডবে মাত্র ৬৪ রানে গুটিয়ে গেল বাংলাদেশ। মনে হচ্ছিল ডারউইনের প্রতিশোধ নিতে অস্ট্রেলিয়া বুঝি এবার একপেশে জয় নিয়েই মাঠ ছাড়বে।
কিন্তু ধ্বংসস্তূপের মাঝেও লড়াইটা বাঁচিয়ে রাখলেন একজন। ব্যাটাররা যখন অসহায়, বল হাতে বুক চিতিয়ে দাঁড়ালেন শরিফুল ইসলাম। একে একে ফেরালেন অস্ট্রেলিয়ার ছয় ব্যাটার, ক্যারিয়ারসেরা ৩৫ রানে ৬ উইকেট নিয়ে একাই বদলে দিলেন ম্যাচের চিত্র। তবে শরিফুলের কাছে এই ছয় উইকেটও বড় নয়, তার কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন হবে বাংলাদেশের জয়।
ম্যাকাইয়ে দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম দিনটা বাংলাদেশের শুরু হয়েছিল দুঃস্বপ্নের মতো। ইনিংসের প্রথম বলেই সাদমান ইসলামকে ফিরিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ধ্বংসযজ্ঞের শুরু করেন স্টার্ক। এরপর একের পর এক ব্যাটারকে সাজঘরে ফেরান এই বাঁহাতি পেসার। তার গতির সঙ্গে সুইং আর নিখুঁত লাইন-লেন্থের সামনে কোনো উত্তরই খুঁজে পাননি বাংলাদেশের ব্যাটাররা। শেষ পর্যন্ত মাত্র নিজদের চতুর্থ সর্বনিম্ন রানেই শেষ হয় বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস।
এমন বিপর্যয়ের পর অস্ট্রেলিয়ার সামনে বড় লিডের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই সুযোগটা সহজ হতে দেননি বাংলাদেশের বোলাররা। আর এই নেতৃত্ব দিয়েছেন শরিফুল। দ্বিতীয় সেশনে বল হাতে এসে একে একে সাজঘরের পথ দেখান ট্রাভিস হেড, মারনাশ লাবুশেন, স্টিভেন স্মিথ, বাউ ওয়েবস্টার, প্যাট কামিন্স ও মিচেল স্টার্ককে। তার দুর্দান্ত স্পেলেই ১৬৫ রানে ৮ উইকেট হারায় অস্ট্রেলিয়া। শেষ পর্যন্ত ১০১ রানের লিড পেলেও দিনের শেষে স্বস্তিতে থাকতে পারেনি স্বাগতিকরা।
ব্যক্তিগতভাবে শরিফুলের জন্য এটি ছিল ক্যারিয়ারসেরা বোলিং। এমন পারফরম্যান্সের পর প্রশংসা পাওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দিনের খেলা শেষে নিজের ছয় উইকেটের চেয়েও দলের জয়কেই বড় করে দেখেছেন এই বাঁহাতি পেসার। দিনের খেলা শেষে শরিফুল বলেছেন, ‘পাঁচ উইকেট পেয়েছি, এটা নিয়ে খুব খুশি। তবে আমি সাধারণত একটা টেস্ট জিতলে এর চেয়ে অনেক বেশি খুশি হব। চেষ্টা করব আমরা যাতে দলগতভাবে খেলি, ম্যাচটা কোনোভাবে জিততে পারি।’
বাংলাদেশের ৬৪ রানে অলআউট হওয়া নিয়ে অবশ্য হতাশ শরিফুল। তবে প্রথম দিনের ব্যাটিং ব্যর্থতাকে ম্যাচের শেষ বলে মানতে রাজি নন তিনি। অস্ট্রেলিয়া ১০১ রানের লিডে থাকলেও দ্বিতীয় ইনিংসে ঘুরে দাঁড়ানোর বিশ্বাস আছে তার। তিনি বলেন, ‘এখনও তো গেম শেষ হয়নি। প্রথম দিন গেছে। হ্যাঁ, আমরা ব্যাটিংয়ে একটু, আজকে আমাদের অবস্থা একটু খারাপ গেছে। তারাও কিন্তু তাদের কন্ডিশনে অস্ট্রেলিয়ার মতোই আছে। ইনশাআল্লাহ দেখা যাক কী হয়, সেকেন্ড ইনিংসে কতটুকু ওপরে দাঁড়াতে পারি।’
ম্যাকাইয়ের উইকেটেও বাংলাদেশের বোলারদের ঘুরে দাঁড়ানোর বড় সহায়তা পেয়েছেন শরিফুল। বিশেষ করে নতুন বলে বেশ কিছুক্ষণ বল সুইং করেছে বলে জানান তিনি। সেই সুবিধাই কাজে লাগিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের চাপে রাখার চেষ্টা করেছেন বাংলাদেশের পেসাররা। তিনি বলেন, ‘এখানে আপনারাও দেখছেন খেলা, নতুন বলে সবসময় সুইং করতেছিল, অনেকক্ষণ ধরে। ওটাও আমরা অ্যাডভান্টেজ হিসেবে কাজে লাগিয়েছি।’
প্রথম দিনের সবচেয়ে দারুণ মিলগুলোর একটি ছিল দুদলের দুই বাঁহাতি পেসারের ছয় উইকেট। সকালে মিচেল স্টার্ক বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ ধসিয়ে ৬ উইকেট নেন। দিনের শেষ ভাগে সেই স্টার্ককেই বোল্ড করে নিজের ষষ্ঠ উইকেট পূর্ণ করেন শরিফুল।
স্টার্কের বোলিং শরিফুলেরও পছন্দের। অথচ দিনের শুরুতে সেই স্টার্কই বাংলাদেশের জন্য হয়ে উঠেছিলেন আতঙ্কের নাম। পরে সেই একই বোলারের উইকেট নিয়েই নিজের ছয় উইকেট পূর্ণ করে শরিফুল যেন দিনের গল্পটা পূর্ণ করলেন।
বাংলাদেশের ব্যাটাররা যেখানে পুরোপুরি ব্যর্থ, সেখানে শরিফুলের ছয় উইকেট দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রেখেছে। অস্ট্রেলিয়া লিড নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু দিনের শেষটা যে পুরোপুরি তাদের হয়নি, তার বড় কারণ এই বাঁহাতি পেসার।
এখন বাংলাদেশের সামনে কাজ একটাই, দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট হাতে ঘুরে দাঁড়ানো। কারণ শরিফুলের ভাষাতেই, ‘খেলা তো এখনও শেষ হয়নি।’
সময়ের আলো/এসএকে