দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সাতলার লাল শাপলার বিল। বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে ফুটে থাকা লাল শাপলার অপরূপ সৌন্দর্য প্রতি বছর দেশ-বিদেশের প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের আকৃষ্ট করে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সাতলার শাপলার বিলকে আরও আধুনিক, আকর্ষণীয় ও পর্যটকবান্ধব করে গড়ে তুলতে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ এগিয়ে চলছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, শাপলার বিলের প্রবেশদ্বারে নির্মাণ করা হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন গেট ও আধুনিক ভিউ পয়েন্ট। পাশাপাশি পর্যটকদের স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপদে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ তৈরি করতে ঘাটলাসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রম হাতে নিয়ে কাজ শুরু করেছেন প্রকৃতিপ্রেমী রুচিশীল উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আলী সুজা। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সাতলার শাপলার বিলের সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য এটি আরও আকর্ষণীয় একটি গন্তব্যে পরিণত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, উজিরপুরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটন সম্ভাবনাকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরার লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। স্থিরচিত্র ও ভিডিওচিত্রের মাধ্যমে সাতলার লাল শাপলার বিলের সৌন্দর্য দেশজুড়ে তুলে ধরার পাশাপাশি পর্যটন বিকাশে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, সাতলার শাপলার বিল শুধু উজিরপুর নয়; বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক পর্যটন সম্পদ। প্রতিবছর শাপলা ফোটার মৌসুমে দূর দূরান্ত থেকে পর্যটকরা এখানে ছুটে আসেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পর্যটন অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে দর্শনার্থীদের নানাধরনের অসুবিধায় পড়তে হয়েছে। নতুন ভিউ পয়েন্ট, গেট ও ঘাটলা নির্মাণসহ সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ পর্যটকদের সেই দুর্ভোগ অনেকটাই কমিয়ে আনবে বলে প্রত্যাশা করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আলী সুজা যোগদানের পর থেকে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি জনসেবামূলক ও জনকল্যাণমুখী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তার উদ্যোগ ও উপজেলা প্রশাসনের সমন্বিত কার্যক্রমে সাতলার লাল শাপলার বিলকে আধুনিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার এ উদ্যোগ ইতিমধ্যে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে পরিকল্পিতভাবে পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে সাতলার শাপলার বিলকে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় গ্রামীণ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এতে উজিরপুরের পর্যটন সম্ভাবনা বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রকৃতির অপরূপ লাল শাপলা, বিস্তীর্ণ বিল, নৌ-ভ্রমণ এবং গ্রামীণ পরিবেশ। সব মিলিয়ে সাতলার শাপলার বিল ইতিমধ্যে একটি অনন্য পর্যটন আকর্ষণ। এর সঙ্গে আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো যুক্ত হলে দেশের পর্যটন মানচিত্রে উজিরপুরের সাতলার অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে। এমনটাই প্রত্যাশা করেছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আলী সুজা।
লাল শাপলার স্বর্গরাজ্য : বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সাতলা ইউনিয়নের সাতলার বিল। জুলাই থেকে লাল শাপলা ফোটা শুরু হয়। ফুলের বুকে সূর্যের স্নিগ্ধ আলো পড়া মাত্রই পুরো বিল হেসে ওঠে। নৌকায় চড়ে বিলে বেড়ানো, পানির কল কল ধ্বনি আর তাজা ফুলের দৃশ্য এক স্বর্গীয় অনুভূতি দেয়।
এই সময়ে যারা লাল শাপলার মোহনীয় রূপের সৌন্দর্য উপভোগ করতে চান, তারা চলে যেতে পারেন বরিশালে। বরিশাল সদর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরত্বে উজিরপুর উপজেলার সাতলা ইউনিয়নের উত্তর সাতলা গ্রাম। গ্রামের নামেই বিলের নাম, সাতলা বিল। তবে শাপলার রাজত্বের কারণে সেটি এখন শাপলা বিল নামেই বেশি পরিচিত। প্রাকৃতিকভাবেই শাপলা বিলের রঙিন হাসিতে উজ্জ্বল গ্রামটি। বিলটি টলটলে পানিতে ভরা। বরিশালের অন্য জনপ্রিয় পর্যটন স্থানের মতো এটি খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বহু দূর থেকে মানুষ দেখতে আসেন এই শাপলার বিল।
বছরের একটা সময় কয়েক একর এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে লাল শাপলা। সন্ধ্যা নদীর প্লাবন ভূমি এই ছোট্ট গ্রাম, যা এখন সবার কাছে শাপলারাজ্য। গ্রামের নিম্নাঞ্চল বর্ষার পানিতে ডুবে গেলে জুলাই থেকে শাপলা ফোটা শুরু হয় এবং নভেম্বর পর্যন্ত ফুল ফুটতে থাকে। বিলের মাঝেই যাদের বাড়ি, যাতায়াতে নৌকাই তাদের একমাত্র বাহন। সেখানে গেলে এক পলকে মনে হবে, লাল শাপলার কোনো চাদরের ওপর দিয়ে যাচ্ছেন। কেন না, বিলজুড়ে শাপলা তার রূপের পসরা সাজিয়ে বসেছে।
এই বিলকে শাপলার রাজধানী বললেও ভুল হবে না। এ বিলে ভ্রমণের জন্য রয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় নৌকা। সূর্যের স্নিগ্ধ আলো পড়া মাত্রই এক সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে পরিণত হয়।
নৌকায় করে পুরো বিল বেড়ানো, পানির কল কল ধ্বনি আর তাজা ফুলের দৃশ্য মনে ভিন্ন এক অনুভূতির জোগান দেয়। আর নয়নাভিরাম দৃশ্যে চোখ তো জুড়াবেই। আবার তার মাঝেই সাদা বক, পানকৌড়ি, মাছরাঙা, ফিঙে, শালিক, দোয়েল, চড়ুই, কাঠঠোকরাসহ বিভিন্ন ধরনের দেশীয় প্রজাতির পাখির কলকাকলি তো আছেই।
এখানে কবে থেকে শাপলা ফোটা শুরু হয়েছে, তা কারও জানা নেই। কিন্তু গ্রামের বয়স্কজনের কাছ থেকে জানা যায়, জন্মের পর থেকেই তারা এই বিলে শাপলা ফুটতে দেখেন। লাল, সাদা ও বেগুনি তিন ধরনের শাপলার দেখা মিলবে এই বিলে। তবে লাল শাপলাই বেশি দেখা যায়।
কীভাবে আসবেন : সাতলার শাপলা গ্রামে যেতে চাইলে ঢাকা থেকে বরিশালে সড়ক পথে কিংবা নৌ-পথে যেতে হবে। ঢাকা থেকে আসা বাসগুলোতে যারা আসবেন তাদের উজিরপুরের ইচলাদী বাসস্ট্যান্ডে নামতে হবে। ঢাকা থেকে এসি বাসে সাত থেকে আটশ এবং নন-এসি বাসে পাঁচশ থেকে ছয়শ টাকা করে ভাড়া লাগবে।
ঢাকার সদরঘাট থেকে নৌ-পথে বিলাসবহুল লঞ্চে করে বরিশাল আধুনিক নৌ-টার্মিনালে কিংবা ঢাকা-শিকারপুর রুটের লঞ্চে এসে শিকারপুর লঞ্চঘাটে নামতে হবে। সদরঘাট থেকে রাত আটটা থেকে নয়টার মধ্যে অনেক লঞ্চ বরিশালের উদ্দেশে ছেড়ে আসে। রাতের লঞ্চগুলো ভোর পাঁচটার মধ্যে বরিশাল পৌঁছায়।
এক্ষেত্রে ডেকের ভাড়া হবে ১৫০-২০০ টাকা, ডাবল কেবিনের ভাড়া ১৬শ থেকে ১৮শ টাকা এবং ভিআইপি কেবিন ভাড়া ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা। লঞ্চ কিংবা বাসে যারা বরিশাল শহরে আসবেন তাদের বরিশাল থেকে আবার বাসে করে উজিরপুরের ইচলাদী বাসস্ট্যান্ডে আসতে হবে। ইচলাদী থেকে ইজিবাইক কিংবা মাহিন্দ্রা ভাড়া করে উত্তর সাতলার শাপলার বিলে যেতে হবে।
খাবারের ব্যবস্থা : শাপলার গ্রামে লোকাল কিছু খাবারের হোটেল রয়েছে। চাইলে সেখানে খেতে পারেন। অথবা উজিরপুর সদর কিংবা বরিশাল শহরে গিয়েও ভালোমানের খাবার খেতে পারবেন।
থাকার ব্যবস্থা : শাপলার গ্রামে থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। রাতে থাকতে চাইলে স্থানীয়দের কারও বাড়িতে কিংবা উজিরপুর উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে সরকারি ডাকবাংলোতে থাকতে হবে। তবে বরিশাল শহরে ভালোমানের আবাসিক হোটেল রয়েছে। বাজেটের মধ্যে হোটেল বেছে নিতে পারেন।
সময়ের আলো/এসএকে