সম্প্রতি অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন বিশিষ্ট ব্যাংকার সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ। ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আমানতকারীদের নিরাপত্তা এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে তার গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে সময়ের আলোর মুখোমুখি হয়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য শীর্ষ ২০ খেলাপি ঋণগ্রহীতার কাছে আটকে থাকা প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা উদ্ধার করা। একই সঙ্গে অগ্রণী ব্যাংককে আবারও দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর কাতারে ফিরিয়ে আনা। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সময়ের আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জাহিদুল ইসলাম। সাক্ষাৎকারটি নিচে উপস্থাপন করা হলো-
সময়ের আলো : ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে আপনি খেলাপিদের তালিকা প্রকাশের ওপর জোর দিচ্ছেন। এ বিষয়ে আপনার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব বা পরিকল্পনা কী?
সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ : খেলাপি ঋণ বর্তমানে আমাদের সবচেয়ে বড় ক্ষত। আমি মনে করি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ব্যাংকের প্রতিটি শাখায় শীর্ষ ২০ জন ঋণখেলাপির তালিকা টাঙিয়ে দেওয়া উচিত। একজন সাধারণ গ্রাহক বা আমানতকারী যখন ব্যাংকে ঢুকবেন, তখন তিনি যেন দেখতে পান কারা ব্যাংকের টাকা আটকে রেখেছেন।
এতে খেলাপিদের ওপর একটি বড় সামাজিক চাপ তৈরি হবে এবং সমাজে নিজেদের ইমেজ বা মান-সম্মান বাঁচানোর স্বার্থেই তারা টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হবে। এটি কেবল অগ্রণী ব্যাংকের বিষয় নয়, আমি চাই সরকার একে ‘টপ-টু-বটম’ একটি জাতীয় পলিসি হিসেবে গ্রহণ করুক।
প্রশ্ন : এ ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নিতে গেলে কি অতীতে কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে?
উত্তর : হ্যাঁ, অতীতে আমি যখন এই ব্যাংকে আসার পর এমন একটি উদ্যোগ নিয়েছিলাম, তখন আমাকে অনেক সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। কিন্তু আমার সেই উদ্যোগের ফলে কিছু টাকা রিকভারি বা আদায়ও হয়েছিল। কিছু মানুষ ব্রাঞ্চের সামনে এসে হট্টগোল বা স্লোগানও দিয়েছিল। তবে বর্তমানে যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে, তাতে ফ্যাকচুয়াল বা সত্য তথ্য প্রকাশে ভয় পেলে চলবে না। আইনি প্রক্রিয়া ও সরকারি নীতিমালার মধ্যে থেকেই বড় বড় খেলাপিদের নাম জনসম্মুখে আনা এখন সময়ের দাবি।
প্রশ্ন : আপনি ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ছিলেন এবং দীর্ঘ ১৪ বছর পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ফের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। এই দুই মেয়াদের শুরুতে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার চিত্র কেমন ছিল?
উত্তর : ২০০৪ সালে যখন আমি অগ্রণী ব্যাংকের এমডি হিসেবে দায়িত্ব নিই, তখন প্রায় সব আর্থিক সূচকই ছিল নেতিবাচক। ব্যাংকের মূলধনে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল, খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪০ শতাংশের বেশি এবং ইকুইটি ছিল ঋণাত্মক ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। আমাদের ক্রেডিট পোর্টফোলিও ছিল ২২ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে ৮ হাজার কোটি টাকা (প্রায় ৩৫ শতাংশ) ছিল ক্লাসিফাইড। আমরা পুনর্গঠন ও সুশাসনের ওপর জোর দিয়েছিলাম।
যার ফলে ২০১০ সালের মধ্যে ইকুইটিকে ১০ শতাংশ ইতিবাচক অবস্থানে নিয়ে আসি এবং লোকসানি শাখা ৪৪৭টি থেকে ৭৭টিতে নামিয়ে আনি। আমার সময়ে টোটাল পোর্টফোলিও ৩০ হাজার কোটি টাকা হয়েছিল এবং খেলাপি ঋণ কমিয়ে মাত্র ১০ শতাংশে (৩ হাজার কোটি টাকা) নামিয়ে এনেছিলাম।
কিন্তু ২০২৪ সালে যখন আবার দায়িত্ব নিলাম, তখন আর্থিক অবস্থার অবনতি দেখে আমি বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে যাই। আমি যখন ২০১০ সালে ব্যাংক ছেড়ে যাই, তখন মূলধন পর্যাপ্ততার হার (সিএআর) ছিল ১২.৫ শতাংশ, কিন্তু ২০২৪ সালে সেটি নেমে দাঁড়ায় মাত্র ০.৫ শতাংশে! আর খেলাপি ঋণের হার ১১ থেকে বেড়ে ৪২ শতাংশে পৌঁছে যায়।
প্রশ্ন : ব্যাংকটির এই বিপুল অবনতি এবং খেলাপি ঋণ বাড়ার মূল কারণগুলো কী বলে আপনি মনে করেন?
উত্তর : গত ১৫ বছরে দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাজনৈতিক তদবির ও প্রভাবের ভিত্তিতে ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে এবং যথাযথ ব্যাংকিং নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি। এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের চরম ঘাটতি ছিল। ঋণ বিতরণের পর কোনো কার্যকর তদারকি বা নিয়মিত ফলোআপ ছিল না। অনেক প্রকল্পে ঋণ দেওয়া হয়েছে যেগুলোর টেকসই পরিচালনার সক্ষমতাই ছিল না।
ফলে গত ১৫ বছরে অনিয়ম ও লুটতরাজ হয়েছে যা কল্পনার বাইরে। পোর্টফোলিও বেড়ে ৮০ হাজার কোটি টাকা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এর প্রায় ৫০ শতাংশ (৪০ হাজার কোটি টাকা) ক্লাসিফাইড বা খেলাপি হয়ে গেছে। আমি তো এসেছি মাত্র দেড় বছর, এই দীর্ঘ সময়ের পুঞ্জীভূত অনিয়মের দায় তো আমার ওপর চাপানো ঠিক নয়।
প্রশ্ন : আপনি দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকের ভেতরে আর কী কী অনিয়ম খুঁজে পেয়েছেন?
উত্তর : আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখেছি অনেক বড় বড় অনিয়ম ‘আন্ডার দ্য কার্পেট’ বা কার্পেটের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল এবং রেকর্ডও করা হয়নি। যেমনÑ বিদেশে পেমেন্ট চলে গেছে কিন্তু কাস্টমার অ্যাকাউন্ট ডেবিট করা হয়নি! দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকের এমডি এবং আমি এগুলো আইডেন্টিফাই করি এবং ফুল অডিট করাই। যারা দোষী তাদের অনেককে ফিরিয়ে আনা হয়েছে, যদিও এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত শাস্তি হয়নি, তবে আমরা রিকভারি করার আপ্রাণ চেষ্টা করছি।
প্রশ্ন : এই বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ আদায়ে এবং ব্যাংকের পুনর্গঠনে আপনারা বর্তমানে কী কী উদ্যোগ নিচ্ছেন?
উত্তর : আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো খেলাপি ঋণ ২০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা। এ লক্ষ্যে আমরা ব্যাংকের ১০ হাজার কর্মীকে রিকভারির কাজে নামিয়েছি। আমাদের ৯৭৯টি শাখার প্রত্যেককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা তাদের শীর্ষ ৫ জন কাস্টমারকে নিয়মিত করার ব্যবস্থা নেয়।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক ‘এক্সিট পলিসি’ আমাদের জন্য বড় সুযোগ। এর আওতায় অনারকৃত সুদ, অনিশ্চিত সুদ এবং দণ্ড সুদ শতভাগ মওকুফ করার সুযোগ আছে। এতে অনেক লোন অ্যাডজাস্ট হয়ে যাবে এবং খেলাপি ঋণের তকমা ঘুচে যাবে। এ ছাড়া গত দুই বছরে আমরা প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ পুনঃতফসিল করেছি এবং প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি নগদ আদায় করেছি।
প্রশ্ন : ব্যাংকিং খাতে আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় আপনার দর্শন কী?
উত্তর : আমার কাছে প্রথম অগ্রাধিকার হলো আমানতকারীর সুরক্ষা। বড়লোককে আরও বড় না বানিয়ে আমাদের স্মল, মাইক্রো, কটেজ বা নতুন ব্যবসায়ীদের অর্থায়ন করা উচিত। যারা হাজার কোটি টাকার মালিক হয়ে বসে আছেন, তারা দেশের জন্য কতটুকু কর্মসংস্থান করছেন? এ ছাড়া আমানতকারীদের উৎসাহিত করতে আমানতের সুদের হার অবশ্যই মূল্যস্ফীতির হারের ওপরে থাকতে হবে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ থেকে ১০ শতাংশ।
কিন্তু অনেক বেসরকারি ব্যাংক আমানতের সুদের হার সাড়ে ৯ শতাংশ বা তার নিচে নামিয়ে এনেছে। এতে আমানতকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং নিরুৎসাহিত হয়ে টাকা পাচার করছে বা অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করছে। তাই আমি মনে করি, রিয়েল রেট অব ইনকাম নিশ্চিত করতে আমানতের হার মূল্যস্ফীতিকে কভার করতে হবে।
প্রশ্ন : অগ্রণী ব্যাংকের ডিজিটাল সেবা ও সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে গ্রাহকদের কিছু অভিযোগ রয়েছে। এগুলোর উন্নয়নে কী করছেন?
উত্তর : আমাদের কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার হলো ‘টেমানস ২৪’, যা বিশ্বের সেরা ব্যাংকগুলো ব্যবহার করে। কিন্তু স্থানীয় মেইনটেন্যান্স কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা গ্রাহকদের কাক্সিক্ষত সেবা দিতে পারছিলাম না। আমরা এখন সফটওয়্যারটিকে লেটেস্ট ভার্সনে আপগ্রেড করার কাজ করছি। এ ছাড়া সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমরা আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নিয়মিত অডিট এবং ২৪/৭ মনিটরিংয়ের ওপর জোর দিচ্ছি। আরেকটি বিষয় হলো, ক্যাশহীন অর্থনীতি গড়ে তুলতে আমরা ‘বাংলা কিউআর’-এর বিস্তার ও ব্যবহারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।
প্রশ্ন : অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি এবং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?
উত্তর : পদোন্নতি বা প্রমোশন হতে হবে সম্পূর্ণ মেরিট বা মেধার ভিত্তিতে। চাপের মুখে আমার সময়ে ৩,০৮৪ জন কর্মী ‘সুপার প্রমোশন’ পেয়েছেন, যা আমি নীতিগতভাবে সমর্থন করি না। সিবিএ বা কোনো অফিসার ফোরামের গায়ের জোরে প্রমোশন আদায়ের এখতিয়ার নেই। ব্যাংকের টপ লেভেল থেকে শুরু করে মেসেঞ্জার পর্যন্ত সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশ্ন : দেশে প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০টি কারখানা বন্ধ রয়েছে। এগুলো চালু করার বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
উত্তর : বন্ধ থাকা কারখানাগুলো চালু করা আমাদের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত জরুরি। সরকার কিন্তু ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র ১ পার্সেন্ট ডাউন পেমেন্ট দিয়ে বন্ধ কারখানা রিশিডিউল ও রি-ওপেন করার সুযোগ দিয়েছে। তবে এস আলম গত ৩০ বা ১ তারিখে নোটিস দিয়ে চট্টগ্রামে তার ১১টি কারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন। এগুলো চালু রাখার বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী পলিসি প্রয়োজন হবে।
প্রশ্ন : আগামীতে অগ্রণী ব্যাংককে কোন অবস্থানে দেখতে চান?
উত্তর : ২০১০ সালে অগ্রণী ব্যাংকের মোট সম্পদ ছিল ২৬,৪৮৫ কোটি টাকা, যা ২০২৬ সালের শেষে বেড়ে ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হলো শীর্ষ ২০ খেলাপি ঋণগ্রহীতার কাছে আটকে থাকা প্রায় ১৩,৫০০ কোটি টাকা উদ্ধার করা। আমার লক্ষ্য অগ্রণী ব্যাংককে আবারও দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর কাতারে ফিরিয়ে আনা। গ্রাহকের আস্থা পুনর্গঠন, সেবার মানোন্নয়ন এবং আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে অগ্রণী ব্যাংককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়াই আমাদের অঙ্গীকার।
সময়ের আলো/এসএকে