হবিগঞ্জের খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে পানিবন্দি সদর উপজেলার লস্করপুর ও পৈল ইউনিয়নের অন্তত ২০টি গ্রামের ৪ হাজার পরিবার। নদীর পানি ঢুকে শত শত ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও সড়ক তলিয়ে গেছে। বসতঘরে পানি ঢুকে পড়ায় অনেকে সড়কের পাশে ছাউনি তৈরি করে রাত কাটাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ মালামাল নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে সদর উপজেলা কৃষি বিভাগ প্রাথমিকভাবে বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির তথ্য জানিয়েছে।
কৃষি বিভাগের হিসাবে, বাঁধ ভেঙে ১২৫ হেক্টর আউশ ধান, ৯৫ হেক্টর রোপা আমন, ২২ হেক্টর বীজতলা এবং ২৫ হেক্টর শাকসবজি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। তবে, পানি পুরোপুরি না কমা পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। তাদের আশঙ্কা, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা একেএম মাকসুদুল আলম সময়ের আলোকে জানান, লস্করপুর ইউনিয়ন ধান ও সবজি চাষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। সেখানে শীতকালীন আগাম সবজি চাষের প্রস্তুতি চলছিল। এর মধ্যেই বন্যার পানি ঢুকে সব তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। তালিকা সম্পন্ন হলে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সাদ বিন জাহাঙ্গীর জানান, ইতোমধ্যে ৪ হাজার পানিবন্দি পরিবারের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের জন্য ১০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আরও কিছু সহায়তার চাহিদা পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘নতুন করে বৃষ্টি না হলে এক-দুই দিনের মধ্যে বন্যার পানি নেমে যেতে পারে।’
বাঁধ ভেঙে গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থাও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) হবিগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ তানজীর উল্লাহ সিদ্দিকী জানান, বাঁধ ভেঙে কাঁচা ও আধাপাকা মিলিয়ে গ্রামীণ সড়কে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বাঁধ নির্মাণের কাজে অনিয়ম ও গাফিলতির অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কৃষকরা।
কৃষক মো. দবির মিয়া বলেন, ‘বাঁধ নির্মাণের ঠিকাদার সময়মতো কাজ করেননি। স্থানীয়রা কাজের বিষয়ে জানতে চাইলে তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা ও হুমকি দেওয়া হয়েছে।’
দবির মিয়া আরও বলেন, ‘নদীতে পানি বাড়লে শত শত কৃষিজমি তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথা আমরা ঠিকাদারকে জানিয়েছিলাম। কিন্তু যথাযথভাবে বাঁধের কাজ না হওয়ায় এবার আমার প্রায় ২ লাখ টাকার শসা বাগান নষ্ট হয়েছে। এছাড়া, ২ কিয়ার পাকাধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বর্তমানে ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় রাস্তার পাশে আশ্রয় নেওয়া ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নেই।’
বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার ঘরের মালামাল সরিয়ে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
জুলেখা বেগম নামে এক নারী জানান, আগের বন্যায় রাতের মধ্যে তার ঘরের অর্ধেক মালামাল নষ্ট হয়েছিল। পরে নতুন করে ঘর সাজালেও আবারও বন্যার পানিতে সব লন্ডভন্ড হয়ে গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সময়মতো বাঁধের কাজ শেষ না করা এবং নিম্নমানের কাজের কারণেই সামান্য পানি বাড়লেই বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। দ্রুত বাঁধ সংস্কার, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও কৃষকদের সহায়তা এবং ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
উল্লেখ্য, প্রায় ৪৫ দিন আগে গভীর রাতে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালিগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হয়। সেই বাঁধ মেরামতের জন্য ঠিকাদারের মাধ্যমে প্রায় ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে কাজ শুরু করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু পরিপূর্ণ কাজ না হওয়ায় রোববার আবারও বাঁধ ভেঙে পড়ে।
সময়ের আলো/মহু