আদালতের গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অভিযোগ ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে

সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

সারাদেশ

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার ঢেমশা ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতের বিচারিক কার্যক্রমের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রচারের অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন

2026-08-25T20:25:57+00:00
2026-08-25T20:25:57+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬,
১০ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬
সারাদেশ
আদালতের গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অভিযোগ ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে
সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ৮:২৫ পিএম 
গ্রাম আদালতের বিচারিক কার্যক্রমের ভিডিও ফেসবুকে। ছবি : সংগৃহীত
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার ঢেমশা ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতের বিচারিক কার্যক্রমের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রচারের অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবু তাহেরের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় বিচারপ্রার্থীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও গ্রাম আদালতের কার্যক্রমের সংবেদনশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদে বিভিন্ন বিরোধ নিষ্পত্তির সময় গ্রাম আদালতের কার্যক্রমের ভিডিও ধারণ করা হয় এবং পরে সেসব ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ করা হয়। ভিডিওতে বিচারপ্রার্থী, প্রতিপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চেহারা ও বক্তব্য প্রকাশ্যে চলে আসছে বলেও অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।

এতে একদিকে যেমন ব্যক্তিগত বিরোধ জনসম্মুখে চলে আসছে, অন্যদিকে বিচারপ্রার্থীরা সামাজিকভাবে হেয় বা বিব্রত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, গ্রাম আদালতে অনেক সময় পারিবারিক বিরোধ, আর্থিক লেনদেন, জমিজমা কিংবা ব্যক্তিগত অভিযোগ নিয়ে মানুষ বিচার চাইতে আসেন। এসব বিষয়ে প্রকাশ্য ভিডিও প্রচার করা হলে ভবিষ্যতে অনেকেই সামাজিক লজ্জা বা পরিচয় প্রকাশের আশঙ্কায় বিচার চাইতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।


নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বিচারপ্রার্থী বলেন, আমরা সমস্যার সমাধানের জন্য ইউনিয়ন পরিষদে যাই। কিন্তু সেখানে কী বলছি, কীভাবে বিচার হচ্ছে— সেটি যদি পরে ফেসবুকে সবাই দেখে, তাহলে ব্যক্তিগত বিষয় আর ব্যক্তিগত থাকে না। এতে মানুষ বিচার চাইতেও ভয় পাবে।

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব হলো নিরপেক্ষ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে বিরোধ নিষ্পত্তিতে ভূমিকা রাখা। কিন্তু বিচার কার্যক্রমের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করলে সেটি বিচারপ্রার্থীদের কাছে প্রচারণার অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

গ্রাম আদালত মূলত স্থানীয় পর্যায়ে নির্দিষ্ট ধরনের বিরোধ দ্রুত ও সহজে নিষ্পত্তির একটি আইনগত ব্যবস্থা। এখানে উভয় পক্ষের বক্তব্য, সাক্ষ্য ও অন্যান্য তথ্য বিবেচনায় নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, বিচারপ্রক্রিয়ার সংবেদনশীল মুহূর্ত ক্যামেরায় ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অনুমতি বা প্রয়োজনীয়তা কতটুকু? বিশেষ করে কোনো পক্ষের সম্মতি ছাড়া তাদের ছবি, বক্তব্য বা ব্যক্তিগত বিরোধ প্রকাশ করা হলে তা নৈতিক ও আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে বলেও মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় সচেতন মহলের ভাষ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ হওয়ার পর সেটি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। ভিডিও শেয়ার ও পুনরায় প্রচার হতে পারে। ফলে কোনো ব্যক্তি পরবর্তী সময়ে ভিডিওটি সরিয়ে নেওয়ার দাবি করলেও এর ক্ষতি পুরোপুরি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে।

বিচার কার্যক্রমের ভিডিও প্রকাশকে কেন্দ্র করে চেয়ারম্যানের নিরপেক্ষতার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, একজন জনপ্রতিনিধি যখন নিজেই বিচারকার্য পরিচালনা বা তাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, তখন সেই কার্যক্রমের নির্বাচিত অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করলে জনমত প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।


তাদের প্রশ্ন, ভিডিওতে কি পুরো বিচারপ্রক্রিয়া তুলে ধরা হচ্ছে, নাকি শুধু এমন অংশ প্রকাশ করা হচ্ছে যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি আলোচনার জন্ম দেয়? কোনো একটি পক্ষের বক্তব্য আংশিকভাবে প্রকাশ হলে সেটি অন্য পক্ষের জন্য সামাজিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলেও মনে করছেন তারা।

বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। তাদের দাবি, গ্রাম আদালতের কার্যক্রম ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের ঘটনা আইন ও বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা তদন্ত করা প্রয়োজন।

অভিযোগকারীরা বলছেন, গ্রাম আদালত সাধারণ মানুষের সহজলভ্য বিচার পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সেখানে মানুষ যেন নির্ভয়ে নিজের সমস্যা নিয়ে যেতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। বিচারপ্রক্রিয়া যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রদর্শনীতে পরিণত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এর প্রতি মানুষের আস্থা কমে যেতে পারে।

একজন স্থানীয় আইনজীবী বলেন, বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মর্যাদা ও গোপনীয়তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ভিডিও প্রচারের আগে সংশ্লিষ্ট আইন, বিধিমালা এবং ব্যক্তির সম্মতির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

গ্রাম আদালতের কার্যক্রম পরিচালনায় নির্ধারিত আইন ও বিধিমালা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে স্থানীয় পর্যায়ে এ আদালত পরিচালিত হয়। তবে বিচারপ্রক্রিয়ার ভিডিও ধারণ ও তা ফেসবুকে প্রচারের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট অনুমোদন আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী গ্রাম আদালতের কার্যক্রম রেকর্ড বা সংরক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হওয়া উচিত বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। ব্যক্তিগত প্রচারণা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট তৈরির উদ্দেশ্যে বিচারকার্যের ভিডিও ব্যবহার করা হলে তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।

গ্রাম আদালতের বিচার কার্যক্রম ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে প্রচারের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢেমশা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবু তাহেরের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সংযোগ না পাওয়ায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, গ্রাম আদালতের মূল উদ্দেশ্য হলো স্থানীয় পর্যায়ে সহজ, দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে বিরোধ নিষ্পত্তি করা। বিচারপ্রার্থীদের মর্যাদা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। বিচার কার্যক্রমের ভিডিও ধারণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করার সুযোগ নেই। এমনটা করা হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সময়ের আলো/আতা


  বিষয়:   আদালত  গোপনীয়তা লঙ্ঘন  ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: