অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফার বিরুদ্ধে। গুদামে ধান সংরক্ষণে গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। অভিযোগ উঠেছে, এই কর্মকর্তাকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে কৃষকদের কৃষি কার্ড দিয়ে গুদামে ধান দেন ব্যবসায়ীরা এবং ধান সংরক্ষণে নানা হয়রানিসহ অতিরিক্ত টাকাও গুণতে হয়। তার বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের তথ্যমতে, গত ইরি-বোরো মৌসুমে ১ লাখ ৯২ হাজার ৪৭৭ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছিল। এরকম মোটা বা হাইব্রিড জাতের ধান ১৮ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়েছিল। যা মোট আবাদি জমির ১০ শতাংশ। যা থেকে ধানের উৎপাদন হয়েছিল ১ লাখ ৫১ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন। জেলায় ২০ হাজার ২১৮ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের বরাদ্দ পাওয়া গেছে। গত ৫ বছর পর এবার গুদামে শতভাগ ধান সংগ্রহ হয়েছে। পত্নীতলা খাদ্য গুদামে অভ্যন্তরীণ বোরো ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৫৬ টন।
ইরি-বোরো মৌসুম শেষ হয়েছে অনেক আগে। কিন্তু কৃষকরা এখনো খোলা বাজারে ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। সরু ধান কাটারিভোগ প্রায় ১৭শ টাকা মন, সুফলতা ১৩শ টাকা ও জিরাশাইল ১২শ টাকা মন দরে বিক্রি হচ্ছে। সরকার খাদ্যগুদামে সংগ্রহ করে মোটা ধান। বিশেষ করে হাইব্রিড, গুটি স্বর্না ও স্বর্না-৫ ধান। তবে প্রান্তিক কৃষকদের ন্যায্যমূল্য দিতে সরকার অভ্যন্তরীণ বোরো ধান সংগ্রহ করছে ১ হাজার ৪৪০ টাকা মণ দরে।
সরকারি গুদামে ধান নিয়ে গেলে ধান আর্দ্র (ভেজা) বা মানসম্মত নয় বলে অজুহাত দেখানোসহ নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয় কৃষকদের। এছাড়া টনপ্রতি কৃষকদের গুনতে হয় দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। কিন্তু মধ্যস্বত্বভোগী ও ব্যবসায়ীরা অনায়াসে গুদামে ধান সরবরাহ করছেন।
এই ধরনের সিন্ডিকেট ও অনিয়মের কারণে সরকার প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে এবং প্রান্তিক কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কৃষকরা স্বচ্ছতার মাধ্যমে কোনো ধরণের হয়রানি ছাড়াই গুদামে ধান সরবরাহ করতে চান।
পত্নীতলা উপজেলার গয়ারপুর গ্রামের কৃষক তানজির আহম্মেদ বলেন, খাদ্যগুদামে ৩ টন ধান দিয়েছি। প্রতি টনে দেড় হাজার টাকা (৬০ টাকা মণ) হিসেবে ৪ হাজার ৫০০ টাকা গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফাকে দিয়েছি। এছাড়া স্টাফ, স্প্রে-মান রফিকুল ও ঝাড়ুদার অন্তরকে ৩০০ টাকা এবং পয়েন্টে প্রতি টনে ১০০ টাকা হিসেবে ৩০০ টাকা দিতে হয়েছে। মিটার পাস থাকার পরও আমার গ্রামের ১০ জন কৃষক ৩০ টন ধান গুদামে দিয়ে গোলাম মোস্তফাকে ৪৫ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। এছাড়া অন্য স্টাফদের টাকা দিতে হয়েছে। গুদামের ঝাড়ুদার অন্তর যদি বলে ধান চলবে, তাহলে গুদামে ধান ঢুকবে, না হলে হবে না।
কৃষ্ণপুর গ্রামের কৃষক খোরশেদ আলম বলেন, গুদামে ধান দিতে গেলে আর্দ্র (ভেজা) ও ধুলাবালি থাকাসহ বিভিন্ন ভুল ধরে কৃষকদের হয়রানি করা হয়। সাধারণ কৃষকরা গুদামে ধান দিতে পারে না। কিন্তু ব্যবসায়ীরা সহজেই গুদামে ধান দিচ্ছে।
কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, খোলা বাজারে ধানের দাম কম। ভাল দাম পাওয়ার আশায় পত্নীতলা খাদ্য গুদামে ৩ টন ধান দিয়েছিলাম। পরে ৪ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়ার পর আমাকে চেক দেওয়া হয়। যারা এ অনিয়মের সাথে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হওয়া দরকার।
পত্নীতলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা বলেন, কিছু ব্যক্তি সুবিধা না পেয়ে গুজব ছড়িয়েছে। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ ভীত্তিহীন।
পত্নীতলা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আমিনুল কবির বলেন, ব্যবসায়ীরা অনেক সময় কৃষকদের প্রভাবিত করে তাদের মাধ্যমে গুদামে ধান দিতে উদ্বুদ্ধ করে। তবে কৃষি কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা গুদামে ধান সরবরাহ করেন। ধান আর্দ্রতা বা মিটার পাশ হলেই কৃষকরা গুদামে ধান দিতে পারেন। অর্থের বিনিময়ে গুদামে ধান প্রবেশের বিষয়টি ভিত্তিহীন।
নওগাঁ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ফরহাদ খন্দকার বলেন, গুদামে ধান সরবরাহে অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই। কৃষি কার্ড ছাড়া অন্য কেউ গুদামে ধান দিতে পারবে না। পত্নীতলা খাদ্য গুদামে ধান সংগ্রহ নিয়ে একটি অভিযোগ হয়েছে। এ বিষয়ে তদন্ত হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সময়ের আলো/এনএন/আতা