পাঁচ চ্যালেঞ্জে অর্থনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক

অর্থনীতি

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ বাড়ানো, রফতানিতে প্রবৃদ্ধি ফেরানো, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটানো- এখন এসবই বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ।

2026-08-26T04:28:53+00:00
2026-08-26T04:28:53+00:00
 
  বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬,
১১ ভাদ্র ১৪৩৩
বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬
অর্থনীতি
এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এমসিসিআইয়ের মূল্যায়ন
পাঁচ চ্যালেঞ্জে অর্থনীতি
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ৪:২৮ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ বাড়ানো, রফতানিতে প্রবৃদ্ধি ফেরানো, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটানো- এখন এসবই বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বস্তি ফিরলেও দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির চাপ কাটেনি। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগে স্থবিরতার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। রফতানিতেও প্রবৃদ্ধি দুর্বল।

তবে সামগ্রিকভাবে এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে মনে করছে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)। তাদের পর্যবেক্ষণ, অর্থনীতির এই পুনরুদ্ধারকে টেকসই করতে মূল্যস্ফীতি কমানোর পাশাপাশি ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটাতে হবে, বাড়াতে হবে বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ। সেই সঙ্গে বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা ধরে রাখায় অগ্রাধিকার দিতে হবে।

এমসিসিআইয়ের ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি : এপ্রিল-জুন ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেশের অর্থনীতির এই চিত্র উঠে এসেছে। গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি সাময়িক হিসাবে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ হয়েছে। আগের অর্থবছরে যা ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। তবে এই প্রবৃদ্ধি দেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার তুলনায় এখনও কম।

মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমলেও তা এখনও বড় উদ্বেগের বিষয়। জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে, মে মাসে যা ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ হয়েছে। তবে খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও জ্বালানির দামের চাপ এখনও মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় প্রভাব ফেলছে।

অন্যদিকে বৈদেশিক খাত অর্থনীতির জন্য বড় স্বস্তির জায়গা হয়ে উঠেছে। এপ্রিল-জুন সময়ে দেশে ৯ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন বা ৯৩৮ কোটি ডলার প্রবাসী আয় এসেছে। জুন শেষে মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে, মে শেষে যা ছিল ৩৪ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার।

তবে রফতানি খাতে সেই স্বস্তির প্রতিফলন দেখা যায়নি। জুনে রফতানি আয় অনেকটা বেড়ে ৪ দশমিক ১৯ বিলিয়ন বা ৪১৯ কোটি ডলারে উঠলেও পুরো অর্থবছরে রফতানি আয় বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশ। অর্থবছর শেষে মোট রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪৮ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ৮৩৮ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরে যা ছিল ৪৮ দশমিক ৩০ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ৮৩০ কোটি ডলার। অর্থাৎ সামান্য বেশি।

দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল। এর বড় নজির হলো বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের ধীরগতি। ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের জুন মাসের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এর বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

রাজস্ব ও সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রেও চাপ আছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। তবে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার চেয়ে আদায় কম হয়েছে ৮৭ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা বা ১৭ দশমিক ৪০ শতাংশ। একই সময়ে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশে নেমেছে, এক দশকের মধ্যে যা সর্বনিম্ন।

বৈদেশিক লেনদেনের সামগ্রিক হিসাবে বড় ধরনের উন্নতি হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টে ৬ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত হয়েছে। তবে এই উদ্বৃত্তের বিপরীতে বাণিজ্য ঘাটতি ৩৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেড়ে ২৭ দশমিক ২৯ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৭২৯ কোটি ডলারে উঠেছে। একই সময়ে নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ১৫ দশমিক ০২ শতাংশ কমে ১৪৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারে নেমে এসেছে। 

প্রতিবেদনের ভাষ্য, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার কিছু লক্ষণ দেখা গেলেও পুনরুদ্ধারে গতি আনতে চিহ্নিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি ফেরানো কঠিন হবে : এতে আরও বলা হয়, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে রেকর্ড নিম্নগতি, উচ্চ সুদের হার এবং জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প উৎপাদন চাপে রয়েছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা। তারা বলেছেন, স্থিতিশীল, পূর্বানুমানযোগ্য ও বিনিয়োগবান্ধব নীতিগত পরিবেশ নিশ্চিত না হলে অর্থনীতিতে কাক্সিক্ষত গতি ফেরানো কঠিন হবে। 

তা ছাড়া ক্ষুদ্র, মাঝারি ও অতি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতে প্রকৃত ঋণপ্রবাহ লক্ষ্যমাত্রার ২৫ শতাংশের বিপরীতে মাত্র ১৬ দশমিক ৮ শতাংশে আটকে আছে। ব্যবসার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এ খাতে খেলাপি ঋণের হারও বেড়ে ২৪ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রথাগত জামানতভিত্তিক ঋণের পরিবর্তে ডিজিটাল মূল্যায়নের মাধ্যমে নগদ প্রবাহভিত্তিক ঋণ সুবিধা বাড়ানো এবং সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি কেনার জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করা দরকার।


মূল্যস্ফীতি এখনও প্রত্যাশিত মাত্রায় নামেনি। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ দীর্ঘদিনের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। বিনিয়োগে স্থবিরতা বিরাজ করছে এবং অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হতে পারছে না। একই সঙ্গে উচ্চ সুদের হার, উৎপাদন ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিময় হারের চাপ এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। 

কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন, রফতানি সম্প্রসারণ ও রাজস্ব আহরণে বেসরকারি খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বিবেচনায় নিয়ে এ খাতের আস্থা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

এমসিসির মূল্যায়নে আরও বলা হয়, রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতিতে দীর্ঘ সময় উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকা উদ্বেগের বিষয়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে দেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ব্যাংক খাতে তারল্য বাড়ানো এবং সার্বিকভাবে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার।

বিশ্ব অর্থনীতির চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরে বলা হয়, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৩ দশমিক ১ শতাংশ। বাণিজ্য বাধা, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 


  বিষয়:   পাঁচ চ্যালেঞ্জ  অর্থনীতি  এপ্রিল-জুন  এমসিসিআই 


Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: