পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার লক্ষ্মীকুন্ডা গ্রাম থেকে কাদিমপাড়ার দিকে হেঁটে চললে কয়েক মাস আগেও চোখে পড়ত এক করুণ দৃশ্য। গভীর খানাখন্দে ভরা মেঠো পথে সবজি বোঝাই ভ্যান উল্টে চাকা আটকে থাকত কাদা-মাটিতে। রোদে, ধুলো আর বর্ষায় কাদার সেই নরক যন্ত্রণা সহ্য করে প্রতিদিন বাজারে পৌঁছাতে পৌঁছাতেই অর্ধেকের বেশি তাজা সবজি নষ্ট হয়ে যেত, পকেটে উঠত না ন্যায্য দামও।
তবে সেই দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ আর নিরাশার গল্পে এখন লেগেছে পরিবর্তনের হাওয়া। গ্রামীণ সড়ক মেরামত প্রকল্পের আওতায় লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কদমিপাড়া হাট হয়ে বাবুলচারা পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ৫ কিলোমিটার সড়কটি নতুন রূপ পেতেই যেন নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে চারপাশের ১০টি গ্রাম। ধুলোবালি আর কাদার পথ রূপ নিয়েছে মসৃণ পাকা রাস্তায়, যা রূপ বদলে দিয়েছে পুরো অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতির।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, সম্পূর্ণ নতুনভাবে প্রশস্তকরণ ও পুনর্নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ায় সড়কটি দিয়ে এখন দিন-রাত নির্বিঘ্নে চলাচল করছে যানবাহন।
ঈশ্বরদীর লক্ষীকুন্ডা, কাদিমপাড়া, দাদাপুর, কামালপুর, ছিলিমপুর ও বিলকেদার এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সবজি উৎপাদনকারী এসব গ্রামের মাঠে মাঠে এখন লাউ, করলা, শসা ও কলাসহ নানা জাতের সবজির বাম্পার ফলন। নতুন পাকা সড়ক হওয়ায় এখন মাঠের পাশ থেকেই ভ্যান, পিকআপ ও ট্রাকে করে মুহূর্তের মধ্যে এসব তাজা সবজি পৌঁছে যাচ্ছে ছিলিমপুর ও কামালপুরের স্থানীয় আড়তে। আর সেখান থেকেই তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকারি বাজারে। সময় ও পরিবহন খরচ অর্ধেকের বেশি কমে যাওয়ায় অবশেষে নিজেদের কষ্টের ফসলের উপযুক্ত মূল্য পাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
সড়কটির সুফল শুধু কৃষির বাম্পার ফলনেই সীমাবদ্ধ নেই, বদলে দিয়েছে পুরো এলাকার জনজীবনও। আগে রাস্তা খারাপ থাকায় মধ্যরাতে মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া কিংবা বর্ষার দিনে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া ছিল এক মহা যুদ্ধ। মসৃণ পাকা সড়ক হওয়ায় এখন এক নিমিষেই দূর হয়েছে সেই দুর্ভোগ।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আওতায় ‘লক্ষ্মীকুন্ডা ইউপি কাদিমপাড়া হাট আরএইচডি হয়ে বাবুলচারা সড়ক’ পুনর্বাসন কাজটি সম্পন্ন হয়েছে। প্রায় ২ কোটি ৬৪ লাখ ৬১ হাজার টাকা ব্যয়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে কাজ শুরুর পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সড়কটির সংস্কার কাজ শেষ হয়।
যোগাযোগ ব্যবস্থার এই আমূল পরিবর্তনে উচ্ছ্বসিত স্থানীয় বাসিন্দারাও। বাবুলচারা গ্রামের ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন জানান, কৃষিপ্রধান এই অঞ্চলে ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি। রাস্তাটি দীর্ঘদিন সংস্কারহীন থাকায় স্থানীয়দের কষ্ট হচ্ছিল। মানসম্মতভাবে কাজটি সম্পন্ন হওয়ায় এখন কৃষক সরাসরি আড়তে ফসল পৌঁছাতে পারছেন।
একই সুর বিলকেদার গ্রামের কৃষক জিন্নাহ মন্ডলের কণ্ঠে। তিনি জানান, আগে সড়ক ভাঙা থাকায় খেত থেকে সবজি তুলে সময়মতো হাটে নেওয়া মারাত্মক কষ্টকর ছিল। পরিবহন খরচ যেমন বেশি হতো, তেমনি ন্যায্যমূল্যও মিলত না। এখন রাস্তা মসৃণ হওয়ায় সময় ও যাতায়াত খরচ কমেছে এবং দামও ভালো পাওয়া যাচ্ছে।
ছিলিমপুর গ্রামের বেলাল উদ্দিন বলেন, আগে মুমূর্ষু রোগী বা গর্ভবতী মায়েদের হাসপাতালে নিতে চরম বিপদে পড়তে হতো আমাদের। শিক্ষার্থীরাও সময়মতো স্কুলে যেতে পারত না বেহাল সড়কের কারণে। এখন গাড়ি সহজেই দ্রুত যাতায়াত করতে পারছে। কৃষিকাজ করতেও বেশ সুবিধা হচ্ছে। ফসল উৎপাদন কার্যক্রম থেকে শুরু করে বিপণন কাজ করতে এই সড়ক আমাদের বেশ উপকারে আসছে। ধন্যবাদ সরকার ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে।
পাবনা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম বলেন, কৃষিপ্রধান এই অঞ্চলে ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি। রাস্তাটি দীর্ঘদিন সংস্কারহীন থাকায় স্থানীয়দের কষ্ট হচ্ছিল। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মানসম্মতভাবে সড়কটির কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। কৃষকেরা সরাসরি আড়তে ফসল পৌঁছাতে পারছেন, যা এলাকার সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার এই উন্নয়ন শুধু স্থানীয় মানুষের যাতায়াত সহজ করেনি, বরং গতি ফিরিয়েছে থমকে থাকা গ্রামীণ অর্থনীতিতে। পর্যায়ক্রমে পাবনার কৃষিপ্রধান সকল গ্রামীণ সড়কই আধুনিক উন্নত মানের করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
সময়ের আলো/আতা