তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকার প্রবণতা বাড়ছে। স্বাস্থ্যঝুঁকি, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং বদলে যাওয়া সামাজিক জীবনের কারণে জেনারেশন জেড (জেনজি) আগের প্রজন্মগুলোর তুলনায় কম মদ পান করছে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে এই প্রজন্মের একটি অংশই আবার অ্যালকোহল কোম্পানিগুলোর জন্য হয়ে উঠছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ক্রেতা। কারণ তারা হয়তো বেশি পান করছে না, তবে প্রতি গ্লাসে বেশি খরচ করছে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে যুক্তরাজ্য— বিভিন্ন দেশের তথ্য বলছে, তরুণদের মধ্যে মদ্যপান কমছে। ভারতেও শহুরে তরুণদের মধ্যে ‘সচেতনভাবে পান’ করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য ও মানসিক সুস্থতার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি অনেকেই মাসজুড়ে মদ না খাওয়ার অভ্যাস করছেন। কেউ কেউ আবার একই রাতে অ্যালকোহল ও অ্যালকোহলবিহীন পানীয়— দুই ধরনের পানীয়ই বেছে নিচ্ছেন। তাহলে অ্যালকোহল কোম্পানিগুলোর ব্যবসা বাড়ছে কীভাবে?
কম পান, দামি পানীয়
ভারতের অ্যালকোহল বাজারের সাম্প্রতিক চিত্রেই এর উত্তর মিলছে। রেডিকো খাইতানের এক প্রান্তিকের মুনাফা ৭৩ শতাংশ বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দামি ও প্রিমিয়াম পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধিই এর অন্যতম কারণ। তাদের ‘প্রেস্টিজ অ্যান্ড অ্যাবাভ’ শ্রেণির পণ্যের বিক্রি বেড়েছে ৪০ দশমিক ৮ শতাংশ। একই প্রবণতা দেখা গেছে ইউনাইটেড স্পিরিটসের ক্ষেত্রেও। জনি ওয়াকার ও ট্যানক্যারের মতো প্রিমিয়াম পণ্যের নিট বিক্রয়মূল্য এক বছরে ৯ শতাংশ বেড়েছে। এর প্রভাবে প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক বিক্রিও বেড়েছে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ।
ভারতের অ্যালকোহল বাজারও বিশ্বের বড় ২০টি বাজারের তুলনায় দ্রুত বেড়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশটিতে অ্যালকোহলের বিক্রি ৭ শতাংশ বেড়ে ৪৪ কোটি কেস ছাড়িয়েছে। তবে প্রিমিয়াম ও তার চেয়ে উচ্চমূল্যের পণ্যের বাজার আরও দ্রুত— পরিমাণ ও মূল্য, উভয় দিক থেকেই ৮ শতাংশ করে বেড়েছে।
বদলে ফেলেছে পছন্দ
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, জেন জেড পুরোপুরি অ্যালকোহল ছেড়ে দেয়নি। বরং তারা পানীয় বাছাইয়ের ধরন বদলে ফেলেছে। ভারতের অ্যালকোহল শিল্পের সংগঠন সিআইএবিসির মহাপরিচালক অনন্ত এস আইয়ারের মতে, প্রিমিয়াম পণ্যের দিকে ঝোঁকই বর্তমানে বাজারের অন্যতম প্রধান প্রবৃদ্ধির চালিকা শক্তি। ২০২৫ সালে ভারতীয় সিঙ্গেল মল্টের বিক্রি প্রায় ২২ শতাংশ বেড়ে প্রায় পাঁচ লাখ কেসে পৌঁছেছে। এর প্রায় ৯২ শতাংশই দেশীয় ব্র্যান্ডের।
তার মতে, জেন জেড এখন বিভিন্ন ধরনের পানীয়, স্বাদ, পরিবেশনের ধরন ও ককটেল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। অভ্যাসের বশে নয়, উপলক্ষ বুঝে পানীয় বেছে নিচ্ছে তারা।
রেডিকো খাইতানের প্রধান বিক্রয় কর্মকর্তা সুধীর উপাধ্যায়ের ভাষায়, জেন জেড হলো ‘পরীক্ষাপ্রবণ ও আর্থিকভাবে সক্ষম’ ভোক্তা। ভদকার বাজারে এর প্রভাব স্পষ্ট। ভারতের আইএমএফএল বাজারে ভদকার অংশ ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে পরের অর্থবছরের একই সময়ে বেড়ে ৬ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির ম্যাজিক মোমেন্টস ব্র্যান্ডের বিক্রিও এক বছরে ৪৩ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে স্বাদযুক্ত ভদকার দখলই সবচেয়ে বেশি— মোট বিক্রির ৬৫ শতাংশের বেশি এখন ফ্লেভারড ভদকা।
‘দামি’ মানেই এখন শুধু বিদেশি নয়
মোদি ইলভা ইন্ডিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক অভিষেক মোদির মতে, ভদকার বাজারেও বড় পরিবর্তন এসেছে। কয়েক বছর আগে যেখানে সাধারণ ভদকার বাজার ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ এবং স্বাদযুক্ত ভদকা ৪০ শতাংশ, এখন চিত্রটি উল্টো। বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশই ফ্লেভারড ভদকা।
তার মতে, ভোক্তারা এখন শুধু দাম বা বিদেশি ব্র্যান্ডের দিকে তাকাচ্ছে না। মান, কারুশিল্প এবং আলাদা বৈশিষ্ট্যের জন্যও বেশি অর্থ খরচ করতে আগ্রহী তারা।
স্মোক ল্যাবের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী বরুণ জৈনের মতে, তরুণদের কেনাকাটার সিদ্ধান্ত ক্রমেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল অনুসন্ধান এবং পণ্যের উৎস, স্বাদ ও অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করছে। অর্থাৎ, একটি পানীয় শুধু পানীয় হিসেবে থাকছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে গল্প, ঐতিহ্য, উৎপাদনের পদ্ধতি এবং ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা।
বিলাসিতার সংজ্ঞাও বদলাচ্ছে
সাউথ সিজ ডিস্টিলারিজের পরিচালক রুপি চিনয়ের মতে, জেন জেডের কাছে বিলাসিতার সংজ্ঞাও বদলে গেছে। শুধু বেশি দাম বা নামী ব্র্যান্ড এখন তাদের আকর্ষণের কেন্দ্র নয়। পণ্যের নিজস্বতা, উৎপত্তি এবং এর পেছনের গল্পও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ফলে একটি নির্দিষ্ট প্রজন্মকে একই সঙ্গে দুটি বিপরীত প্রবণতার মধ্যে দেখা যাচ্ছে। একদিকে তারা অ্যালকোহল থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, অন্যদিকে যারা পান করছে, তাদের একটি অংশ আগের চেয়ে বেশি দামি ও উন্নতমানের পানীয় বেছে নিচ্ছে।
কম উপলক্ষ, বড় বিল
এই দুই প্রবণতাকে পাশাপাশি রাখলেই আপাতবিরোধী চিত্রটির ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। জেনজি সত্যিই আগের প্রজন্মের তুলনায় কম মদ পান করছে। স্বাস্থ্যসচেতনতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং বদলে যাওয়া সামাজিক সংস্কৃতিই এর বড় কারণ। কিন্তু ভারতের আর্থিকভাবে সক্ষম তরুণদের একটি অংশ কমবার পান করলেও প্রতিবার বেশি অর্থ ব্যয় করছে। সস্তা হুইস্কি-সোডার বদলে তারা বেছে নিচ্ছে ক্রাফট ককটেল, পরিচিত ব্র্যান্ডের বদলে গল্প ও স্বাতন্ত্র্যসম্পন্ন সিঙ্গেল মল্ট কিংবা স্বাদযুক্ত ভদকা।
অ্যালকোহল কোম্পানিগুলোও তাই ভোক্তার এই পরিবর্তিত অভ্যাসের সঙ্গে নিজেদের ব্যবসার কৌশল বদলে নিচ্ছে। জেনজি হয়তো সস্তা ও অভ্যাসনির্ভর মদ্যপান থেকে দূরে সরে যাচ্ছে; কিন্তু বিশেষ উপলক্ষে ভালো মানের পানীয়ের জন্য বাড়তি অর্থ খরচ করতে তারা আগ্রহী। তাই ‘জেনজি মদ ছেড়ে দিয়েছে’— এই কথাটি পুরোপুরি ভুল নয়। তবে এর আরেকটি অংশও আছে: তারা হয়তো সস্তা অ্যালকোহল ছেড়ে দিচ্ছে, কিন্তু দামি ও অভিজ্ঞতানির্ভর পানীয়ের বাজারে আরও গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা হয়ে উঠছে।
সময়ের আলো/কেএইচ