নতুন আবাসিক প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে মোট জমির কমপক্ষে ৩০ শতাংশ নাগরিক সুবিধা ও বিভিন্ন ইউটিলিটি সেবার জন্য সংরক্ষণ এবং প্রকল্পের অন্তত ৯০ শতাংশ জমির মালিকানা বা বৈধ উন্নয়ন-চুক্তি নিশ্চিত না হলে অনুমোদন না দেওয়ার বিধান রেখে ‘আবাসিক প্রকল্পের ভূমি উন্নয়ন বিধিমালা, ২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করেছে সরকার।
আবাসিক প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা কমানোর লক্ষ্যও রয়েছে প্রস্তাবিত বিধিমালায়। সঠিকভাবে আবেদন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিলের পর কর্তৃপক্ষের বোর্ডের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১৫০ দিনের মধ্যে প্রকল্প অনুমোদনের বিধান রাখা হয়েছে। তবে লে-আউট প্ল্যান অনুমোদনের পর সর্বোচ্চ ৭ বছরের মধ্যে নাগরিক সুবিধাসহ পুরো প্রকল্পের উন্নয়ন কাজ শেষ করতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ না হলে অনুমোদন বাতিল হয়ে যাবে।
এ ক্ষেত্রে মূল অনুমোদন ফির অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ টাকা জরিমানা দিয়ে পুনরায় নবায়নের আবেদন করতে পারবে। গত ১০ আগস্ট গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে সিটি করপোরেশন, নগর পরিকল্পনাবিদ ও আবাসন খাতের বিভিন্ন সংগঠসহ অংশীজনদের কাছে এই খসড়ার ওপর মতামত চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) তৈরি করা নতুন এই খসড়া বিধিমালায় আবাসন ব্যবসায়ীদের জন্য কিছু কঠোর শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। যেকোনো নতুন প্রকল্পে এখন থেকে অনুমোদনের আগেই অন্তত ৯০ শতাংশ জমির নিষ্কণ্টক মালিকানা বা বৈধ উন্নয়ন-চুক্তি উদ্যোক্তার নিজের নামে থাকতে হবে।
পাশাপাশি প্রকল্পের অনূর্ধ্ব ৭০ শতাংশ জমি কেবল আবাসিক প্লট হিসেবে বিক্রি করা যাবে। অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ জমি পার্ক, খেলার মাঠ, স্কুল, হাসপাতাল, প্রশস্ত রাস্তা, কবরস্থান ও অন্যান্য নাগরিক সেবামূলক কাজের জন্য স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত রাখতে হবে। খসড়ায় বলা হয়েছে, প্রকল্পের অনুমোদিত লে-আউট প্ল্যানে যে জমি রাস্তা, পার্ক, খেলার মাঠ, জলাধার বা অন্য কোনো নাগরিক সুবিধার জন্য নির্ধারিত থাকবে, তা পরবর্তী সময়ে অন্য কাজে ব্যবহার বা পরিবর্তন করা যাবে না। এমনকি অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া এসব জমির ব্যবহার পরিবর্তন করাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
পরিবেশ সুরক্ষায় ৫০ একরের বেশি আয়তনের প্রকল্পে নিজস্ব বর্জ্য শোধন প্লান্ট স্থাপন এবং আবাসন ব্যবসায়ীদের জন্য প্রথমবারের মতো ৫ লাখ টাকা নিবন্ধন ফি যার মেয়াদ থাকবে সর্বোচ্চ ৫ বছর ও সমপরিমাণ বিলম্ব জরিমানার নিয়ম চালু করা হচ্ছে। খসড়া বিধিমালা অনুযায়ী রাজউক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মহাপরিকল্পনাভুক্ত এলাকায় আবাসন ব্যবসা করতে হলে প্রতিটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা উদ্যোক্তাকে বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধন নিতে হবে। প্রতি ৫ বছর পর পর আড়াই লাখ টাকা ফি দিয়ে নিবন্ধন নবায়ন করতে হবে। তবে কোনো উদ্যোক্তা সময়মতো নবায়ন করতে ব্যর্থ হলে তাকে নিবন্ধন ফির সমপরিমাণ অর্থাৎ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা গুনতে হবে।
আবাসন প্রকল্পের কারণে যদি কোনো স্থানীয় বাসিন্দা জমি হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হন, তবে প্রকল্প এলাকার ভেতরেই তাকে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ কম মূল্যে অথবা পারস্পরিক চুক্তির ভিত্তিতে পুনর্বাসন প্লট বরাদ্দ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রকল্পের ভেতরের রাস্তার মাপ নিয়েও নতুন কঠোর নিয়ম চালু করা হচ্ছে। ৫০ একরের কম প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রধান সড়ক ন্যূনতম ৪০ ফুট প্রশস্ত হতে হবে। দ্বিতীয় সারির সড়ক ন্যূনতম ৩০ ফুট এবং সংযোগ বা অভ্যন্তরীণ গলিগুলো ন্যূনতম ২০ ফুট প্রশস্ত হওয়া বাধ্যতামূলক। ৫০ একরের বেশি প্রকল্পের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ বা সংযোগ সড়কের সর্বনিম্ন প্রশস্ততাই হতে হবে ২৫ ফুট। ফলে যেকোনো আধুনিক ফায়ার সার্ভিস বা জরুরি সেবা সহজেই প্রতিটি প্লট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে।
খসড়া বিধিমালায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের আবাসনের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। প্রকল্প পরিকল্পনার সময় বিভিন্ন আয়গোষ্ঠীর মানুষের আবাসনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রকল্পভেদে প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধার মানদণ্ড নির্ধারণের সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি আবাসিক প্রকল্পে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা সংরক্ষণের প্রস্তাব রয়েছে। জনসংখ্যা বিবেচনায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি বড় প্রকল্পে কলেজ বা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখার কথাও বলা হয়েছে। এমনকি প্রকল্প ছোট হলেও অন্তত একটি নার্সারি স্কুলের ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বিধিমালার খসড়াটি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর অংশীজনদের কাছে খসড়ার ওপর মতামত চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রস্তাবিত বিধিমালায় আবাসন প্রকল্পকে শুধু প্লট বিক্রির ব্যবসা হিসেবে না দেখে পরিকল্পিত জনবসতি হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। জমির মালিকানা, নাগরিক সুবিধা, পরিবেশ, সড়ক, পানি নিষ্কাশন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার বিষয়গুলোকে একই অনুমোদন কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত ও পরবর্তী সরকারি অনুমোদনের পর বিধিমালা চূড়ান্ত করা হবে।
সময়ের আলো/এসএকে