মায়ের প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তুলতে ঘুস, ক্ষোভে ছেলে তৈরি করল ‘ঘুষ.সাইট’

সময়ের আলো ডেস্ক

প্রযুক্তি

মায়ের মৃত্যুর পর সরকারি প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তুলতে গিয়ে একের পর এক দপ্তরে ঘুস চাওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিল ১৭ বছরের

2026-08-31T15:24:01+00:00
2026-08-31T15:24:01+00:00
 
  সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬,
১৬ ভাদ্র ১৪৩৩
সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬
প্রযুক্তি
মায়ের প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তুলতে ঘুস, ক্ষোভে ছেলে তৈরি করল ‘ঘুষ.সাইট’
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬, ৩:২৪ পিএম 
‘ঘুষ ডট সাইট’-এর প্রতিষ্ঠাতা শাহেদ শরীফ আহমেদ। ছবি : সংগৃহীত
মায়ের মৃত্যুর পর সরকারি প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তুলতে গিয়ে একের পর এক দপ্তরে ঘুস চাওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিল ১৭ বছরের শাহেদ শরীফ আহমেদের পরিবারের। নিজের পাসপোর্ট করাতেও একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় তাকে। সরকারি সেবা পেতে অর্থ দাবি করার এই তিক্ততা থেকেই ভিন্ন কিছু করার চিন্তা আসে তার মাথায়। সেই ভাবনা থেকেই তৈরি করেছে ‘ঘুষ ডট সাইট’—যেখানে পরিচয় গোপন রেখে ঘুষ চাওয়ার অভিজ্ঞতা জানাতে পারছেন সাধারণ মানুষ।

ময়মনসিংহ সদরের আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ছিলেন শাহেদের মা আমিনা খাতুন। ২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর শারীরিক অসুস্থতায় মারা যান তিনি। মৃত্যুর সময় তার চাকরির বয়স হয়েছিল ১৩ বছর।

মায়ের মৃত্যুর পর পরিবারের পাওনা ছিল প্রায় ৭ লাখ টাকা প্রভিডেন্ট ফান্ড। সেই অর্থ তুলতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ঘুরতে হয়। তাদের অভিযোগ, টাকা ছাড় করাতে একাধিক জায়গায় ঘুস দিতে হয়েছে। ট্রেজারি অফিসে ১০ হাজার, জেলা শিক্ষা অফিসে ২০ হাজার এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ৮ হাজার টাকা—সব মিলিয়ে প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা পেতেই ৩৮ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে বলে দাবি পরিবারের।

এরপরও তাদের ভোগান্তি শেষ হয়নি। কল্যাণ তহবিলের ২ লাখ টাকা এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ৮ লাখ টাকা পাওয়ার কথা রয়েছে পরিবারের। এসব অর্থের ফাইল এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে আরও ১ লাখ টাকা ঘুষ চাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ শাহেদের পরিবারের। টাকা না দিলে ফাইল এগোবে না বলেও জানানো হয়েছে বলে তাদের দাবি।

মায়ের প্রাপ্য টাকা পেতে এমন অভিজ্ঞতা শাহেদের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে। সরকারি ব্যবস্থার প্রতি ক্ষোভের পাশাপাশি তার মনে প্রশ্ন জাগে— একজন সাধারণ মানুষ কেন নিজের বৈধ পাওনা পেতেও ঘুস দিতে বাধ্য হবেন?

ময়মনসিংহ ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় বাবার সঙ্গে ভাড়া বাসায় থাকা শাহেদ বর্তমানে ব্রিটিশ কাউন্সিলের অধীনে ক্যামব্রিজ ইন্টারন্যাশনালের এ-লেভেলে পড়ছে। পড়াশোনার পাশাপাশি ওয়েবসাইট তৈরি ও কোডিং শেখার প্রতি তার আগ্রহ রয়েছে। প্রযুক্তির সেই জ্ঞানই এবার কাজে লাগিয়েছে ঘুষের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরিতে। 

শাহেদের ভাষ্য, মায়ের পেনশনের ফাইল আটকে রেখে লাখ টাকা ঘুস দাবি করা হচ্ছিল। এর আগে প্রায় দেড় বছর আগে ও-লেভেল পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য পাসপোর্ট করতে গিয়েও একই অভিজ্ঞতা হয় তার। ফাইল আটকে রেখে ১ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয়েছিল। টাকা দেওয়ার মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যে পাসপোর্টের কাজ হয়ে যায়। এসব অভিজ্ঞতাই তাকে ‘ঘুষ ডট সাইট’ তৈরির সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করে। 

দুই ঘণ্টার কোডিং থেকে বড় উদ্যোগ

একটি ভারতীয় ওয়েবসাইট দেখে ধারণাটি পান শাহেদ। এরপর মাত্র দুই ঘণ্টার কোডিংয়ে তৈরি করেন ‘ঘুষ ডট সাইট’-এর প্রাথমিক কাঠামো। পরে বন্ধু ও সহপ্রতিষ্ঠাতা সাইফ কবিরের সহযোগিতায় ডোমেইন কেনা হয়। গত ২১ আগস্ট সাইটটি চালু করা হয়। পুরো উদ্যোগ বাস্তবায়নে তাদের খরচ হয়েছে প্রায় ১০০ ডলার।

শুরুতে শাহেদ নিজেও ভাবেনি, এত অল্প সময়ে ওয়েবসাইটটি মানুষের মধ্যে সাড়া ফেলবে। তার ধারণা ছিল, এটি হয়তো নিজের জীবনবৃত্তান্তে যুক্ত করার মতো একটি ছোট প্রকল্প হিসেবেই থাকবে। কিন্তু সাইট চালুর পর পরিস্থিতি বদলে যায়।

মাত্র ৯ দিনের মধ্যে শনিবার দুপুর পর্যন্ত ওয়েবসাইটটিতে ৯ হাজার ৬৬৫টি অভিযোগ জমা পড়ে। এসব অভিযোগে ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের পরিমাণ ৩২১ থেকে ৩৩২ কোটি টাকার মধ্যে বলে জানানো হয়েছে।

অভিযোগের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় বর্তমানে চার সদস্যের একটি পর্যালোচনা দল সেগুলো যাচাই করছে। ড্যাশবোর্ডে ফিল্টার করার পর যাচাই করা অভিযোগগুলো ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হচ্ছে।

পরিচয় গোপন রাখাই অগ্রাধিকার

ঘুসের অভিযোগ জানাতে গিয়ে কোনো ব্যক্তি যাতে নতুন করে বিপদে না পড়েন, সে বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন উদ্যোক্তারা। তাই অভিযোগকারীদের পরিচয় গোপন রাখা হচ্ছে।

শাহেদ জানায়, এখন পর্যন্ত কোনো হুমকি পায়নি তারা। সাইটটি এত দ্রুত ভাইরাল হবে, সেটিও তারা ভাবেনি। তবে আইনি ঝুঁকি বিবেচনায় ভুক্তভোগীর নাম-পরিচয় কিংবা নির্দিষ্ট অভিযুক্ত ব্যক্তির তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না। ভবিষ্যতে আইনি দল গঠন করা সম্ভব হলে অথবা সরকারি সমর্থন পাওয়া গেলে পূর্ণাঙ্গ তথ্য যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

শাহেদের লক্ষ্য শুধু অভিযোগের তালিকা তৈরি করা নয়। তার ভাষায়, সরকারি অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কোথায় অপচয় হচ্ছে—সেটি মানুষের সামনে তুলে ধরাই তাদের উদ্দেশ্য। শেষ পর্যন্ত সরকারি সেবা নিতে গিয়ে যেন কাউকে ঘুস দিতে না হয়, সেটিই তাদের প্রত্যাশা। 

ছেলের উদ্যোগে বাবার পূর্ণ সমর্থন

শাহেদের এই উদ্যোগের পেছনে সবচেয়ে বড় সমর্থন তার বাবা শরিফুল ইসলাম শামীমের। একসময় সৌদি আরবের একটি ব্যাংকে চাকরি করা শরিফুল নিজেও স্ত্রীর মৃত্যুর পর সরকারি অর্থ পেতে গিয়ে ঘুসের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। 

স্ত্রীকে হারানোর শোকের মধ্যেই পরিবারের প্রাপ্য অর্থের জন্য সরকারি দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে হয়েছে তাকে। একদিকে জীবনসঙ্গীকে হারানোর বেদনা, অন্যদিকে নিজের বৈধ পাওনা পেতে ঘুস দেওয়ার চাপ— দুই ধরনের কষ্টই তাকে সহ্য করতে হয়েছে। 

শরিফুল বলেন, স্ত্রীর মৃত্যুর পর সরকারি টাকা তুলতে গিয়ে ঘুস দিতে হয়েছে। বাধ্য হয়েই প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তুলেছেন। কিন্তু এখনো প্রায় ১০ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে। সেই অর্থ পেতেও ১ লাখ টাকা ঘুস চাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ তার। উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিস থেকে টাকা না দিলে কাজ হবে না বলে জানানো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।  

তবে এবার আর ঘুস দিতে রাজি নন শরিফুল। তিনি বলেন, ঘুস না দিয়েই বাকি টাকা তুলতে চান। আর এ কারণেই ছেলের উদ্যোগকে তিনি নিজের অভিজ্ঞতার প্রতিবাদ হিসেবেও দেখছেন। ছেলের এই কাজে তার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।  

অভিযোগ অস্বীকার শিক্ষা কর্মকর্তার 

ঘুস চাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারী মো. মজিবুর রহমান। তার দাবি, কেউ তার কাছে এলে তিনি সহযোগিতা করেন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে এলে দ্রুত স্বাক্ষরের ব্যবস্থা করেন। 

সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মনিকা পারভীন বলেন, ঘুস চাওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কেউ তাকে কিছু জানাননি। এমন কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে পরিবারের বকেয়া অর্থ দ্রুত পরিশোধের আশ্বাস দেন তিনি। 

ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, তরুণদের এই উদ্যোগ পুলিশের নজরে এসেছে। ঘুস বা অনিয়মের কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো শঙ্কা তৈরি হলে পুলিশও প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেবে। 

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ময়মনসিংহ জেলা শাখার সহসভাপতি শরীফুজ্জামান টিটু বলেন, ঘুসের কারণে দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিভিন্ন পর্যায়ে ছড়িয়ে থাকা ঘুসের চিত্র এমন উদ্যোগের মাধ্যমে সামনে আসছে। সরকারের উচিত প্রযুক্তিনির্ভর এসব স্বচ্ছতার উদ্যোগকে কাজে লাগানো। এতে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে।  

মায়ের মৃত্যুর পর পাওয়া উচিত ছিল যে অর্থ, সেটুকু পেতেই ঘুসের মুখোমুখি হয়েছিল শাহেদের পরিবার। সেই ব্যক্তিগত কষ্টই শেষ পর্যন্ত তাকে অন্যদের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠার পথে ঠেলে দিয়েছে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে তার এই উদ্যোগ তাই শুধু একটি ওয়েবসাইট নয়; নিজের দেখা অন্যায়ের বিরুদ্ধে একজন কিশোরের নীরব প্রতিবাদও। 

সময়ের আলো/জেডি 


  বিষয়:   প্রভিডেন্ট ফান্ড  টাকা  ঘুস  ক্ষোভ  ঘুষ ডট সাইট 


Loading...
Loading...
প্রযুক্তি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: