মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত, ভারত-চীন সম্পর্ক, ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিকল্প বাণিজ্যপথ, এবারের সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) সম্মেলনে এসব বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের বাইরে বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নতুন ভারসাম্য তৈরির বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে।
কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে শুরু হয়েছে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) দুই দিনের শীর্ষ সম্মেলন। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দেশের নেতা এই সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন।
সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একসঙ্গে অংশ নিচ্ছেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও সম্মেলনে উপস্থিত রয়েছেন।
এছাড়া পাকিস্তান, উজবেকিস্তান, বেলারুশ, কাজাখস্তানসহ এসসিওর অন্যান্য সদস্য দেশের নেতারাও অংশ নিচ্ছেন।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং আসিয়ানের মহাসচিব কাও কিম হর্নেরও সম্মেলনে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
এবারের সম্মেলনের মূল স্লোগান— টেকসই শান্তি, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য একসঙ্গে।
এসসিও গঠনের ২৫ বছর পূর্তির বছর হওয়ায় এবারের সম্মেলনকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কেন এবারের এসসিও সম্মেলন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বর্তমান বিশ্বে একসঙ্গে বেশ কয়েকটি বড় সংকট চলছে।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। অন্যদিকে রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধও দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
এর প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই। তেল ও গ্যাসের দাম, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জাহাজ চলাচল এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়ছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বের জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে চীন, রাশিয়া, ভারত ও ইরানের মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো একই টেবিলে বসছে।
তাই এবারের সম্মেলন থেকে একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে— এসসিওর সদস্যরা কি নিজেদের মধ্যে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার বাইরে একটি বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন চেষ্টা দেখা গেলেও এসসিওকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী জোট বলা ঠিক হবে না। কারণ সংগঠনটির সদস্য দেশগুলোর নিজেদের মধ্যেই অনেক মতপার্থক্য রয়েছে।
এসসিও কী এবং কীভাবে তৈরি হলো?
এসসিওর ইতিহাস শুরু হয় ১৯৯৬ সালে। তখন চীন, রাশিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তান মিলে “সাংহাই ফাইভ” নামে একটি সংগঠন তৈরি করেছিল।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে চীনের সীমান্ত নিয়ে যেসব সমস্যা তৈরি হয়েছিল, সেগুলো সমাধান এবং পারস্পরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
২০০১ সালে উজবেকিস্তান যোগ দেওয়ার পর সংগঠনটির নাম হয় সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন বা এসসিও। পরবর্তী সময়ে সংগঠনটি শুধু নিরাপত্তা নিয়ে কাজ না করে অর্থনীতি, বাণিজ্য, পরিবহন, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়েও কাজ শুরু করে।
২০১৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান পূর্ণ সদস্য হয়। এরপর ২০২৩ সালে ইরান এবং ২০২৪ সালে বেলারুশ পূর্ণ সদস্য হিসেবে যোগ দেয়।
এখন এসসিওর সদস্য দেশগুলো বিশ্বের বিশাল একটি অংশজুড়ে বিস্তৃত।
এসসিওভুক্ত দেশগুলোর জনসংখ্যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৩ শতাংশ। একই সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ২৩ শতাংশ এই দেশগুলোর হাতে। এ কারণে এসসিওকে শুধু একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংগঠন হিসেবে দেখা হয় না। এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বও দিন দিন বাড়ছে।
এবারের সম্মেলনে প্রধান আলোচ্য কী?
১. ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ এবারের সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় তেল ও গ্যাস পরিবহনে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের উল্লেখযোগ্য অংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।
ফলে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা শুধু ইরান বা উপসাগরীয় দেশগুলোর বিষয় নয়; এটি ভারত, চীন, রাশিয়া এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
এসসিওর দেশগুলো তাই জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিকল্প বাণিজ্যপথ নিয়ে আলোচনা করতে পারে।
২. রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধও সম্মেলনের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হতে পারে।
যুদ্ধটি দীর্ঘদিন ধরে চলায় এর প্রভাব ইউরোপের পাশাপাশি পুরো বিশ্বে পড়েছে।
রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফলে রাশিয়া চীন, ভারত, ইরান ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে।
এসসিওর বৈঠকে যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাব্য পথ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এবং রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের মধ্যেও ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলাদা আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
৩. ভারত-চীন সম্পর্ক
এবারের সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে ভারত ও চীনের সম্পর্ক।
২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্ক বেশ কয়েক বছর ধরে উত্তপ্ত ছিল।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও চীন সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে।
এসসিও সম্মেলন দুই দেশের নেতাদের সরাসরি আলোচনার আরেকটি সুযোগ তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা শুধু ভারত ও চীনের জন্য নয়, পুরো এশিয়ার অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
৪. ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক
ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কও সহজ নয়। দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ রয়েছে এবং সন্ত্রাসবাদ নিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
ভারত দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদে মদদ দেওয়ার অভিযোগ করে আসছে। পাকিস্তান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এবং পাল্টা ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে।
এসসিওর মধ্যে ভারত ও পাকিস্তান, দুই দেশই সদস্য হওয়ায় এই বিষয়টি সংগঠনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত চাইছে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে এসসিও আরও কঠোর অবস্থান নিক।
তবে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্যের কারণে এ বিষয়ে একমত হওয়া সবসময় সহজ হয় না।
৫. বাণিজ্য ও বিকল্প পরিবহনপথ
এবারের সম্মেলনে অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
বর্তমান যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বিশ্বের প্রচলিত বাণিজ্যপথগুলো নানা ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিকল্প বাণিজ্যপথের গুরুত্ব বেড়েছে।
এর মধ্যে অন্যতম হলো ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডোর বা আইএনএসটিসি।
প্রায় ৭ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পরিবহনপথ রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে শুরু হয়ে ইরানের মধ্য দিয়ে ভারতের মুম্বাই পর্যন্ত যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই পথ চালু হলে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে পণ্য পরিবহনের সময় ও খরচ কমানোর পাশাপাশি প্রচলিত সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হতে পারে।
আর্কটিকের নতুন বাণিজ্যপথও আলোচনায়
হরমুজ প্রণালিতে সংকটের কারণে আর্কটিক মহাসাগরের মধ্য দিয়ে বাণিজ্যের সম্ভাবনাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। রাশিয়ার উত্তর উপকূল ঘেঁষে যে পথটি রয়েছে, সেটিকে বলা হয় নর্দার্ন সি রুট।
এই পথ ব্যবহার করে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে পণ্য পরিবহনের সময় কমানো সম্ভব হতে পারে।
ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে এই পথ ব্যবহারের বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।
চীনও আর্কটিক মহাসাগর দিয়ে নতুন বাণিজ্যপথ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি বা লোহিত সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথে সংকট তৈরি হলে বিকল্প পথ ব্যবহারের সুযোগ বাড়তে পারে।
এসসিও উন্নয়ন ব্যাংক ও বিনিয়োগ তহবিল
শুধু বাণিজ্যপথ নয়, নিজেদের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও এসসিও সদস্যরা আলোচনা করছে।
এর আগে চীনের তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত এসসিও সম্মেলনে এসসিও ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক গঠনের বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল।
এছাড়া এসসিও ডেভেলপমেন্ট ফান্ড এবং এসসিও ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড নিয়েও আলোচনা চলছে।
এবারের সম্মেলনে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি হয় কি না, সেদিকেও নজর থাকবে।
এসসিও কি যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী জোট?
এসসিও নিয়ে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি করা হয়, তা হলো— এটি কি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি নতুন জোট?
বিশেষজ্ঞদের মতে, না, এসসিওকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী জোট বলা ঠিক হবে না।
চীন ও রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমিয়ে একটি বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা চায়।
ইরানেরও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে।
কিন্তু ভারত একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে। ভারত যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে কোয়াড জোটেরও সদস্য।
অর্থাৎ ভারত একদিকে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে এসসিওতে কাজ করছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও বাড়াচ্ছে।
এটি ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন নীতির অংশ।
চীন কী চায়?
চীনের জন্য এসসিও একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। চীন চাইছে, ইউরেশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে।
এর মাধ্যমে চীন মধ্য এশিয়ায় নিজের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব আরও বাড়াতে পারে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের বাইরে একটি বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও এসসিওকে কাজে লাগাতে চায় বেইজিং।
রাশিয়ার লাভ কী?
ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়া পশ্চিমা দেশগুলোর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে। এ অবস্থায় চীন, ভারত, ইরান এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রাশিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এসসিওর মাধ্যমে রাশিয়া দেখাতে পারে যে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও তার গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অংশীদার রয়েছে। তবে মস্কো শুধু চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে চায় না।
ভারতের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রাখাও রাশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের লাভ কোথায়?
ভারতের অবস্থান সবচেয়ে আলাদা।
ভারত একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইছে। এসসিও ভারতের জন্য মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করে।
রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ধরে রাখাও ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে সীমান্ত সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যও সরাসরি যোগাযোগ দরকার।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও ভারতের প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক দ্রুত বাড়ছে। তাই ভারত এসসিওকে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের জোট হিসেবে নয়, বরং নিজের স্বার্থ রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কী বার্তা?
এসসিও সম্মেলন যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্ব রাজনীতিতে অনেক দেশ এখন আর শুধু একটি শক্তির ওপর নির্ভর করতে চাইছে না।
চীন, রাশিয়া ও ইরানের মতো দেশগুলো নিজেদের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াচ্ছে। ভারতও একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া-চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি, নিষেধাজ্ঞা এবং একতরফা সিদ্ধান্ত অনেক দেশকে বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে উৎসাহিত করছে।
তবে ওয়াশিংটনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসসিওকে একটি ঐক্যবদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী জোট হিসেবে না দেখা।
কারণ চীন, রাশিয়া ও ভারতের মধ্যে রাজনৈতিক ও কৌশলগত মতপার্থক্য যথেষ্ট।
সব বিষয়ে কি এসসিও একমত হতে পারবে?
এটাই এবারের সম্মেলনের বড় প্রশ্ন। এসসিওর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অনেক বিষয়ে ঐকমত্য নেই।
রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে নিজের অবস্থানের পক্ষে সমর্থন চায়। ভারত আবার এই যুদ্ধে তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিয়ে শান্তির কথা বলে আসছে।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যেও রয়েছে দীর্ঘদিনের বিরোধ। চীন ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত সমস্যা রয়েছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কও অত্যন্ত উত্তপ্ত। ফলে সব বিষয়ে এসসিওর সদস্যদের একমত হওয়া কঠিন।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সংগঠনটির গুরুত্ব এখানেই যে, মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও এসব দেশ একই প্ল্যাটফর্মে বসে আলোচনা করতে পারছে।
এবারের সম্মেলনের আসল গুরুত্ব কোথায়?
এসসিও সম্মেলন থেকে হয়তো বড় কোনো যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি বা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নাও আসতে পারে।
তবে সম্মেলনটি বিশ্ব রাজনীতির একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
চীন, রাশিয়া, ভারত, ইরান এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলো নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য, জ্বালানি, পরিবহন ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াতে চাইছে।
একই সময়ে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখছে।
অর্থাৎ বিশ্ব এখন আর শুধু একটি শক্তিকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে না। বরং বিভিন্ন দেশ নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করছে।
এসসিও সম্মেলনের মূল লক্ষ্য শুধু চীন, রাশিয়া বা ভারতের মধ্যে সম্পর্ক বাড়ানো নয়। বরং যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে সদস্য দেশগুলো কীভাবে নিজেদের নিরাপত্তা, জ্বালানি ও বাণিজ্য নিশ্চিত করবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
শি জিনপিং, পুতিন ও মোদির একই মঞ্চে উপস্থিতি তাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তিন দেশই বিশ্বের বড় শক্তি হলেও তাদের লক্ষ্য এক নয়।
চীন চায় নিজের প্রভাব বাড়াতে, রাশিয়া চায় পশ্চিমা চাপ মোকাবিলা করতে, আর ভারত চায় কোনো একটি পক্ষের ওপর নির্ভর না করে নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা ধরে রাখতে।
এই কারণে এবারের এসসিও সম্মেলন শুধু একটি আঞ্চলিক বৈঠক নয়; এটি বিশ্ব রাজনীতিতে শক্তির নতুন ভারসাম্য কীভাবে তৈরি হচ্ছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি।
সূত্র : আল-জাজিরা
সময়ের আলো/ইউএমএইচ