নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে বিপর্যস্ত নেপাল। দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়েছে। এখন উদ্ধারকারীদের প্রধান লক্ষ্য, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে পড়া শত শত শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা।
নেপালের উদ্ধারকারী দলগুলো চীন ও ভারতের বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় ৯০০-এর বেশি শ্রমিককে উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে তারা আটকা পড়েছেন।
নেপালি কর্মকর্তারা সোমবার (৩১ আগস্ট) জানান, কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষে বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রায় এক ডজন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ খুলে শ্রমিকদের কাছে পৌঁছানোই এখন তাদের প্রধান অগ্রাধিকার।
দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বুধবার নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসে বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত নেমে আসে। এতে নেপালে এ পর্যন্ত ৯০৩ জন নিহত এবং ৪ হাজার ২৪৭ জন নিখোঁজ হয়েছেন।
সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বত অঞ্চলও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে অন্তত ১৬ জন নিহত এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
সুড়ঙ্গ খুড়তে বড় চ্যালেঞ্জ
নেপালের উদ্ধারকারী দলগুলোর প্রকাশ করা ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে, রাতের অন্ধকারেও আলোর ব্যবস্থা করে মাটি কাটার যন্ত্র দিয়ে সুড়ঙ্গের মুখ থেকে কাদা ও পাথরের স্তূপ সরানো হচ্ছে। সেনারা টর্চের আলো ব্যবহার করে বড় গর্ত তৈরি করে সুড়ঙ্গে প্রবেশের পথ খুঁজছেন।
নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেট রয়টার্সকে বলেন, বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ জমে যাওয়ায় সুড়ঙ্গগুলো খুলে দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, সুড়ঙ্গগুলো খুলে দেওয়াই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।
এদিকে, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ৯৩৩ জন শ্রমিকের পাশাপাশি ট্রাক ও কনটেইনার অ্যাসোসিয়েশনের প্রায় ৫০০ কর্মীও নিখোঁজ রয়েছেন।
স্বজনদের আহাজারি, হাসপাতালেও ভিড়
পাহাড়ি এলাকা থেকে প্রবল স্রোতে ভেসে আসা বহু মরদেহ এখনও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। আর্দ্র আবহাওয়ায় মরদেহ দ্রুত পচতে শুরু করায় শত শত মরদেহ অগভীর কবরে দাফন করা হয়েছে।
রাজধানী কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালের মর্গে মরদেহ রাখার আর কোনো জায়গা নেই। নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে পরিবারের সদস্যরা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটছেন বলে জানিয়েছেন আল জাজিরার প্রতিবেদক মিনেল ফার্নান্দেজ।
রেড ক্রসের হিসাব অনুযায়ী, এই দুর্যোগে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
চীনও এই বিপর্যয়ের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের যোগসূত্রের কথা উল্লেখ করেছে।
২১ হাজার নিরাপত্তাকর্মী উদ্ধার অভিযানে
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ এই পরিস্থিতিকে নজিরবিহীন ও ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি করা এখনো কঠিন।
রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে শাহ বলেন, প্রতিকূল আবহাওয়া, দুর্গম ভূখণ্ড এবং চলমান ঝুঁকি সত্ত্বেও নাগরিকদের জীবন বাঁচাতে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, বেসামরিক কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি প্রায় ২১ হাজার নিরাপত্তাকর্মী উদ্ধারকাজে অংশ নিচ্ছেন।
অনেক সড়ক ও মহাসড়কে যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করা হলেও প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক সম্পূর্ণভাবে ভেসে গেছে। ফলে দুর্গত এলাকায় ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা পৌঁছানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
নেপালকে সহায়তায় চীন ও ভারত
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, দেশটি ২ হাজার ১০০-এর বেশি উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করেছে। পাশাপাশি ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তার জন্য অন্তত ২২ কোটি ইউয়ান (প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার) বরাদ্দ করা হয়েছে।
সামনের সারির উদ্ধারকারীদের কাছে বিমান থেকে উদ্ধার সরঞ্জাম ও ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। নিখোঁজদের সন্ধানে চীনা সেনারাও জীবন শনাক্তকারী বিশেষ প্রযুক্তির সরঞ্জাম ব্যবহার করছে।
বেইজিং জানিয়েছে, তিব্বতে ২৩টি দেশের ২৬১ জন বিদেশি নাগরিকের এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিখোঁজদের উদ্ধারে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
চীন নেপালে সুড়ঙ্গ উদ্ধারে বিশেষজ্ঞ ৯ জনকে পাঠিয়েছে। পাশাপাশি নেপালি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে স্যাটেলাইটের তথ্যও শেয়ার করেছে।
নেপাল সাধারণভাবে বৃহৎ পরিসরের অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই বলে জানালেও সুড়ঙ্গ থেকে শ্রমিক উদ্ধারে বিশেষ দক্ষতার কারণে প্রতিবেশী চীন ও ভারতের সহায়তা গ্রহণ করেছে।
খারাপ আবহাওয়ায় বারবার ব্যাহত উদ্ধারকাজ
শুক্রবার থেকে খারাপ আবহাওয়া ও নতুন করে বন্যার আশঙ্কায় উদ্ধার অভিযান কয়েক দফা স্থগিত করা হয়। নেপাল-চীন সীমান্তে দুর্যোগের ফলে একটি হ্রদ তৈরি হয়েছে। হ্রদটির পানি উপচে নেপালের নদীগুলোতে নতুন করে বন্যা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে সোমবার আবহাওয়ার পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হওয়ায় উদ্ধার অভিযান আবারও গতি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন রাসুয়া জেলার প্রশাসক নরেন্দ্র পারিয়ার।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ