হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়েছে। জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় তেলের বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ইরান পাল্টা হামলা চালানোর কথা জানালে সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়।
সোমবার (৩১ আগস্ট) আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ২.৮৭ ডলার বা ৩.২৬ শতাংশ বেড়ে ৯০.৯৭ ডলারে পৌঁছায়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ২.৯১ ডলার বা ৩.৪৯ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৬.৩১ ডলারে দাঁড়ায়।
কেন হঠাৎ তেলের দাম বাড়ল?
রোববার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত ইরানের লারাক দ্বীপে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী স্থাপনায় হামলা চালায়। জুলাইয়ের শেষের পর ইরানের বিরুদ্ধে এটিই যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম জানা সামরিক হামলা।
এর জবাবে ইরান জর্ডানে থাকা দুটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে বলে ইরানের গণমাধ্যমে দেশটির রেভল্যুশনারি গার্ডের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আর এই আশঙ্কাই তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।
ইউবিএসের বিশ্লেষক জিওভানি স্তাউনোভো বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে আবারও সামরিক হামলা এবং তেল সরবরাহ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।
তার মতে, এখন বাজারের মূল নজর থাকবে পরিস্থিতি দ্রুত শান্ত হয় কি না, নাকি সংঘাত আরও বাড়ে।
হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথ। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো।
ফলে এই জলপথে জাহাজ চলাচল দীর্ঘ সময় বন্ধ বা সীমিত হয়ে গেলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ কমে যেতে পারে। এর ফলে তেলের দাম আরও বাড়ার পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় ও বিভিন্ন পণ্যের দামও বাড়তে পারে।
বর্তমানে সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল অনেকটাই কমে গেছে।
শিপিং তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহান্তে প্রণালিটি দিয়ে দৃশ্যমান পণ্যবাহী জাহাজের সংখ্যা কমে প্রতিদিন মাত্র পাঁচটিতে নেমে আসে।
এটি দেখাচ্ছে যে হামলার আশঙ্কায় জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত সতর্ক হয়ে গেছে।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সংস্থাও জানিয়েছে, শনিবার হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের সময় একটি ট্যাংকারে একটি প্রজেক্টাইল আঘাত করেছিল।
খার্গ দ্বীপ নিয়ে ট্রাম্পের দাবি
রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ টুকরো টুকরো করে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
তবে ওই দ্বীপে হামলা হয়েছে, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ট্রাম্পের পোস্টের সঙ্গে একটি ভিডিওও ছিল। পরে রয়টার্সের যাচাইয়ে সেটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যায়।
ইরানও খার্গ দ্বীপে হামলার খবর অস্বীকার করেছে। দেশটি জানিয়েছে, সেখানে তেল কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে।
খার্গ দ্বীপ ইরানের তেল রফতানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সেখানে সত্যিকারের হামলা হলে আন্তর্জাতিক তেল বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
আলোচনা থমকে আছে
এদিকে যুদ্ধ বন্ধের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও এখনো এগোয়নি। মধ্যস্থতাকারীরা হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে সংঘাত অব্যাহত থাকায় সেই উদ্যোগে এখনো বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল ফিরিয়ে আনা না গেলে তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে।
তবে সোমবার তেলের দাম দ্রুত বাড়ার পেছনে আরেকটি কারণও রয়েছে। যুক্তরাজ্যে সরকারি ছুটি থাকায় বাজারে লেনদেনের পরিমাণ তুলনামূলক কম ছিল। কম লেনদেনের বাজারে সামান্য খবরেও দামের ওঠানামা বেশি হতে পারে।
ইরানের ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা আসছে
ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট রয়টার্সকে বলেছেন, ইরানের ওপর প্রতি সপ্তাহে নতুন করে সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে।
এসব নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা তৃতীয় দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকেও চাপের মধ্যে আনা হতে পারে।
এর ফলে ইরানের তেল রফতানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আরও চাপ তৈরি হতে পারে।
আগস্টে তেলের দাম সামগ্রিকভাবে কমেছে
সোমবার ৩ শতাংশের বেশি বাড়লেও আগস্ট মাসের হিসাবে ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই উভয় ধরনের তেলের দাম এখনো সামান্য কমার পথে রয়েছে।
গত সপ্তাহেই তেলের দাম ৪ শতাংশের বেশি কমেছিল। তিন সপ্তাহের মধ্যে সেটিই ছিল প্রথম সাপ্তাহিক দরপতন।
অর্থাৎ সোমবারের বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও মাসিক হিসাবে তেলের বাজার এখনো তুলনামূলকভাবে নিম্নমুখী।
যুক্তরাষ্ট্রের তেলের মজুতও আলোচনায়
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার সঙ্গে একটি চুক্তির মাধ্যমে পাওয়া তেল যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (এসপিআর) পুনরায় পূরণ করতে ব্যবহার করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশলগত তেলের মজুত বর্তমানে প্রায় ৪৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বাড়লে এই মজুত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবার হামলা-পাল্টা হামলা শুরু হওয়ায় বাজারে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন আরও ব্যাহত হতে পারে। এই আশঙ্কায় সোমবার তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
এখন বাজারের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, সংঘাত কি দ্রুত কমবে, নাকি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আরও বাধাগ্রস্ত হবে?
যদি হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়, তাহলে তেলের দাম আরও বাড়ার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী পরিবহন ও পণ্যের দামেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ