রফতানিমুখী হিমায়িত খাদ্য ও মৎস্য খাতের বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে দুই হাজার কোটি টাকার একটি নতুন প্রাক-অর্থায়ন (প্রি-ফাইন্যান্সিং) তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেন, উচ্চ মজুদ ব্যয়, কোল্ড-চেইন পরিচালনার বিপুল খরচ এবং স্বল্প সুদে চলতি মূলধনের ঘাটতি মেটাতে এ খাতের ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন ছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে দেশের রফতানি বহুমুখীকরণ, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গ্রামীণ অর্থনীতি সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক তিন বছর মেয়াদি এই তহবিল গঠন করেছে।
এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ রোববার একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহীদের বিস্তারিত নির্দেশনা দিয়েছে।
সুদ কত, কারা পাবে : কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ঘোষিত তহবিলের আওতায় গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ শতাংশ। এর বিপরীতে অংশগ্রহণকারী তফসিলি ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৪ শতাংশ সুদে প্রাক-অর্থায়ন সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে।
তফসিলি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রফতানির উদ্দেশ্যে হিমায়িত চিংড়ি, মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য এবং রেডি-টু-কুক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে যুক্ত উৎপাদনকারী ও রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো এ ঋণসুবিধা পাবে। তবে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুসারে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত কোনো ঋণগ্রহীতা বা প্রতিষ্ঠানকে এই তহবিলের আওতায় কোনো ঋণ দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে ইডিএফ, ইএফপিএফ কিংবা কৃষিভিত্তিক প্রাক-অর্থায়নের মতো সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্য কোনো তহবিল থেকে সুবিধা চলমান থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো একই খাতের জন্য এ তহবিল থেকে আবারও অর্থায়ন পাবে না।
নীতিমালা অনুযায়ী, প্রাক-অর্থায়ন তহবিলের ঋণপ্রবাহকে মূলত একাধিক খাতে ভাগ করা হয়েছে।
হিমায়িত খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য সম্পূর্ণ নতুন কারখানা নির্মাণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত মেয়াদি ঋণ পাওয়া যাবে। অন্যদিকে বিদ্যমান অবকাঠামো সংস্কার, আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের জন্য মেয়াদি ঋণ হিসেবে সর্বোচ্চ ২০ কোটি টাকা সুবিধা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। নতুন কারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণ পরিশোধের সর্বোচ্চ মেয়াদ হবে সাত বছর। আর সংস্কার বা আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ পরিশোধের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর।
এ ছাড়া কাঁচামাল ক্রয়, চুক্তিভিত্তিক চাষিদের কাছ থেকে সংগ্রহ, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা প্রদান ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধের মতো চলতি মূলধন মেটাতে প্রতিষ্ঠানের টার্নওভারের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ২০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া যাবে। চলতি মূলধনের মেয়াদ এক বছর হলেও ব্যবসায়িক লেনদেন সন্তোষজনক হলে তা সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত নবায়নযোগ্য হবে।
সৌরবিদ্যুতে আরও ঋণ মিলবে : বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিবেশবান্ধব শিল্প গঠন ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে। কোনো কারখানা যদি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করতে চায়, সে ক্ষেত্রে মূল প্রকল্পের ঋণের বাইরে অতিরিক্ত সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি টাকা (বা মূল ঋণের ৩০ শতাংশ) ঋণসুবিধা পাবে।
তবে শর্ত হিসেবে তহবিল গ্রহণকারী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে দুই বছরের মধ্যে তাদের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার অন্তত ১৫ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে মেটানোর বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। এ ছাড়া কারখানায় কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাগত স্বাস্থ্যঝুঁকি নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে