উত্তরবঙ্গের শস্যভাণ্ডারখ্যাত রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের কৃষি অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং সার্বিক কৃষিভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক রূপান্তরকে বেগবান করতে বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই অঞ্চলের কৃষিপণ্য উৎপাদন, শিল্প স্থাপন, সংরক্ষণ ও রফতানি বৃদ্ধিতে ইতিপূর্বে গঠিত তিন হাজার কোটি টাকার বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের আওতায় ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ সুদের হার ৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোর প্রাপ্ত পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার সুদহারও ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করা হয়েছে, যা উত্তরবঙ্গের কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে এক নতুন গতির সঞ্চার করবে।
দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির সম্ভাবনাকে শতভাগ কাজে লাগানো এবং শস্য পরবর্তী অপচয় রোধ করে আধুনিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প বিকাশের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক এই যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। রবিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কৃষি ঋণ বিভাগ থেকে সংশোধিত নীতিমালার সার্কুলার জারি করে সংশ্লিষ্ট সকল তফসিলি ব্যাংকে পাঠিয়ে অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
জানা গেছে, চলতি বছরের জুলাই মাসে উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬টি জেলার অর্থনৈতিক উন্নয়নকে কেন্দ্র করে তিন হাজার কোটি টাকার এই বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। উত্তরাঞ্চল বরাবরই দেশের খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান চালিকাশক্তি হলেও আধুনিক ফসল- পরবর্তী ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনীয় হিমাগার, সংরক্ষণ অবকাঠামো, পরিবহন সুবিধা এবং কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের অভাবে এই অঞ্চলের কৃষকরা প্রায়শই উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন।
সেই সংকট কাটাতে উৎপাদন থেকে শুরু করে পণ্য বিপণন ও বিদেশে রফতানি পর্যন্ত পুরো ভ্যালু চেইন বা মূল্য শৃঙ্খলকে একটি শক্তিশালী কাঠামোর ওপর দাঁড় করাতেই এই তহবিল কাজ করছে।
নতুন সংশোধিত নীতিমালার আলোকে তহবিল ব্যবহারের ক্ষেত্রগুলোকে প্রধান চারটি খাতে ভাগ করে অর্থায়নের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। সাধারণ কৃষি উৎপাদন খাতে মোট তহবিলের ১৫ শতাংশ বরাদ্দ থাকবে, যার আওতায় কৃষকরা ফসল চাষ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতসহ সেচ ও কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে সহজ ঋণ পাবেন।
কৃষিপণ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণের জন্য আধুনিক হিমাগার, বিশেষায়িত গুদাম, সাইলো ও কোল্ড চেইন অবকাঠামো নির্মাণ, পরিবহন এবং বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়নে রাখা হয়েছে তহবিলের সবচেয়ে বড় অংশ, যা মোট বরাদ্দের ৩৫ শতাংশ।
একইভাবে কৃষিজাত কাঁচামাল ব্যবহার করে কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতকে উৎসাহিত করতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে আরও ৩৫ শতাংশ অর্থ। বাকি ১৫ শতাংশ অর্থ সরাসরি কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য বিদেশের বাজারে রফতানির উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করা হবে।
গ্রাহক পর্যায়ে ঋণ বা বিনিয়োগ বিতরণের ক্ষেত্রেও সুস্পষ্ট সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নীতিমালা অনুযায়ী, প্রান্তিক বা একক কৃষি উৎপাদন খাতে একজন কৃষক বা উদ্যোক্তা সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা পাবেন। তবে কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, কোল্ড চেইন অবকাঠামো নির্মাণ, বাণিজ্যিক পরিবহন কিংবা শিল্পভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপনের মতো বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৪০ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থায়নের সুযোগ রয়েছে।
এর পাশাপাশি সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যদ্রব্য ও কৃষিভিত্তিক পণ্য রফতানির জন্য সর্বোচ্চ ১৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া যাবে। তবে কোনো প্রকল্পের বাস্তব সম্ভাব্যতা ও প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে ব্যাংকগুলো স্বীয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার নীতি অনুসরণ করে এই নির্ধারিত ঋণসীমা সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে বা কমাতে পারবে।
সংশোধিত নির্দেশনায় ঋণের পরিশোধের মেয়াদে কোনো পরিবর্তন আনা না হলেও গ্রাহকবান্ধব গ্রেস পিরিয়ডের সুবিধা রাখা হয়েছে। কৃষি উৎপাদন খাতে স্বল্পমেয়াদি এই ঋণের সর্বোচ্চ সময়সীমা ১৮ মাস, যার মধ্যে তিন মাস পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ড মিলবে। অন্যদিকে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্প কারখানা স্থাপন ও রফতানিভিত্তিক বড় প্রকল্পের ঋণের মেয়াদে মোট ৩৬ মাস সময় পাওয়া যাবে, যেখানে প্রকল্পভেদে তিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ড উপভোগ করা যাবে। এ ছাড়া শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ মুনাফা ধার্যের নিয়ম চূড়ান্ত করা হয়েছে।
তহবিলের অপব্যবহার রোধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যদি কোনো ব্যাংক গ্রাহকের কাছ থেকে নির্ধারিত ৭ শতাংশের চেয়ে অতিরিক্ত সুদ বা মুনাফা আদায় করে, তবে অতিরিক্ত সুদের ওপর অতিরিক্ত আরও ২ শতাংশ হারে দণ্ডমূলক জরিমানা আরোপ করে এককালীন ফেরত নেওয়া হবে। পাশাপাশি পুনঃঅর্থায়নের অর্থ ব্যাংকের কাছে অব্যবহৃত থাকলেও চুক্তি অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রযোজ্য হবে।
এই সুবিধার বার্তা প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রান্তিক চাষি ও সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ব্যাংকগুলোকে বিশেষ প্রচার ক্যাম্পেইন চালানোর নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সকল ব্যাংকের স্থানীয় ও আঞ্চলিক শাখাগুলোর দৃশ্যমান স্থানে এই ৭ শতাংশ সুদের হার সম্পর্কিত নোটিস প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই সহজ শর্তের ও স্বল্প সুদের ঋণ উত্তরাঞ্চলে নতুন কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সার্বিক গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।
সময়ের আলো/এসএকে