মুসলিম দেশগুলোর বিনিয়োগ পেতে সরকারের বড় উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

অর্থনীতি

আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে নজিরবিহীন অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঋণের নামে অর্থ লুটে নিঃস্ব হয়ে পড়া বেসরকারি খাতের পাঁচ ব্যাংককে একীভূত

2026-09-02T03:38:37+00:00
2026-09-02T03:38:37+00:00
 
  রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬,
২ কার্তিক ১৪৩৩
রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
অর্থনীতি
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাকে কাতারের অংশীদারিত্ব
মুসলিম দেশগুলোর বিনিয়োগ পেতে সরকারের বড় উদ্যোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:৩৮ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে নজিরবিহীন অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঋণের নামে অর্থ লুটে নিঃস্ব হয়ে পড়া বেসরকারি খাতের পাঁচ ব্যাংককে একীভূত করে গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর জন্য আন্তর্জাতিক কৌশলগত অংশীদার খোঁজা শুরু করেছে সরকার। ব্যাংকটির মূলধন ভিত্তি পুনর্গঠন, দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থায়িত্ব অর্জন এবং প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের লক্ষ্যে মুসলিম বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক ইসলামী সংস্থাগুলোর দ্বারে কড়া নাড়ছে অর্থ মন্ত্রণালয় ও নীতি নির্ধারকরা। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশ কাতারকে আনুষ্ঠানিকভাবে কৌশলগত অংশীদার হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ।

সম্প্রতি সরকারের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে কাতার সফরের সময় দেশটিকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হিসেবে যুক্ত হওয়ার এই আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়। সফরে নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। সফরকালে তিনি কাতারের উচ্চপদস্থ অর্থ কর্মকর্তা ও বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

এ বিষয়ে সরকারের সর্বশেষ অবস্থান স্পষ্ট করে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা গণমাধ্যমকে জানান, কাতারকে ইতিমধ্যেই ব্যাংকের কৌশলগত অংশীদার হওয়ার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। কাতার সফরে এ বিষয়ে প্রথম ধাপের প্রাথমিক আলোচনা ইতিবাচক পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে, তবে এখনো বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। সফর পরবর্তী প্রক্রিয়ায় কাতারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আরও বিশদ আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হবে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই উদ্যোগ কেবল কাতারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে বিশ্বমানের ইসলামী ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি ও মূলধন সংকট কাটাতে অন্যান্য প্রধান মুসলিম দেশ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইসলামী অর্থলগ্নি সংস্থাকেও কৌশলগত অংশিদারিত্বের প্রস্তাব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

এদিকে একীভূতকরণের প্রক্রিয়ায় পূর্বে নেওয়া বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ‘হেয়ারকাট’ (আমানতকারীদের মূল অর্থের একটি অংশ কর্তন করা) বাতিলের গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছে সরকার। নীতিগত এই পরিবর্তনের ফলে ব্যাংকটির লাখো গ্রাহক তাদের জমানো মূল অর্থ সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় ফেরত পেতে যাচ্ছেন।

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, আমানতকারীদের কষ্টার্জিত পাওনা শতভাগ পরিশোধ করার জন্য সরকারের সামনে বর্তমানে দুটি সুনির্দিষ্ট পথ খোলা রয়েছে। প্রথমটি হলো, রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সরাসরি প্রয়োজনীয় অর্থ জোগান দিয়ে আমানতকারীদের পাওনা মেটানো। আর দ্বিতীয়টি হলো, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিদেশি কোনো রাষ্ট্র, সার্বভৌম তহবিল বা সংস্থাকে ব্যাংকের কৌশলগত অংশীদার করে ইকুইটি ও মালিকানায় যুক্ত করা।

সরকার রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর একক চাপ না বাড়িয়ে দ্বিতীয় পথটিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এ কারণেই মুসলিম বিশ্বের ধনী দেশ ও ইসলামী সংস্থাগুলোকে স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হিসেবে নিয়ে আসার জন্য ব্যাপক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক তৎপরতা শুরু করা হয়েছে।


একটি ব্যাংকের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার বা কৌশলগত অংশীদারদের মূল দায়িত্ব হলো ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন ও ব্যবসায়িক পরিধি বাড়াতে সরাসরি ভূমিকা রাখা। তারা সাধারণত কেবল সাধারণ শেয়ারহোল্ডার বা নিষ্ক্রিয় বিনিয়োগকারী নন, বরং ব্যাংকের পরিচালন ও নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকেন। তারা ব্যাংকের মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করতে বড় অঙ্কের দীর্ঘমেয়াদি তহবিল বা ইকুইটি বিনিয়োগ করেন এবং সংকটের সময়ে প্রয়োজনীয় আর্থিক ব্যাকআপ দিয়ে স্থিতিশীলতা বজায় রাখেন।

ব্যক্তি আমানতকারীদের অর্থ ফেরত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু  আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের বিষয়ে জানা গেছে, আগামী ৭ সেপ্টেম্বর থেকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যক্তি হিসাবের গ্রাহকদের জমানো মূল টাকা ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাথমিক ঘোষণা অনুযায়ী ১ সেপ্টেম্বর থেকেই ব্যক্তি হিসাবে স্বাভাবিক লেনদেন শুরু হওয়ার কথা

থাকলেও ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনার সার্বিক প্রস্তুতির কারণে তা কিছুটা পেছানো হয়েছে। শাখা ও উপশাখাগুলোতে নিরাপদ নগদ টাকার জোগান নিশ্চিত করা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় ক্যাশ রিকুইজিশন পাঠানো এবং সার্বিক ঝুঁকিমুক্ত ক্যাশ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে বাড়তি কয়েক দিন সময়ের প্রয়োজন দেখা দেয়। এর ফলেই ৭ সেপ্টেম্বর থেকে পুরোদমে আমানত ফেরত দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এই আমানত উত্তোলনের জন্য ১ সেপ্টেম্বর থেকেই ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোতে গ্রাহকদের আবেদনপত্র গ্রহণ করা শুরু হচ্ছে।

ব্যাংকিং রেগুলেশন ডিপার্টমেন্ট থেকে জারি করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক সার্কুলার অনুযায়ী, ব্যক্তি গ্রাহকরা তাদের সঞ্চয়ী ও মেয়াদি আমানতের এককালীন মূল অর্থ তুলে নিতে পারবেন। তবে এ ক্ষেত্রে মেয়াদি আমানতদারিরা (এফডিআর) যদি একবারে সব মূল টাকা তুলে নেন, তবে তারা ব্যাংকের অর্জিত কোনো সুদ পাবেন না। সুদসহ পাওনা পেতে হলে আমানতকারীকে বিশেষ ‘ব্যাংক রেজুলেশন স্কিম’-এর আওতায় যুক্ত থাকতে হবে। অন্যদিকে, চলতি ও সাধারণ সঞ্চয়ী হিসাবের গ্রাহকেরা কোনো শর্ত ছাড়াই মুনাফাসহ মূল টাকা এককালীন তুলতে পারবেন।
একীভূত হওয়া ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের নেপথ্যে রয়েছে বিগত সরকারের আমলের নজিরবিহীন আর্থিক কেলেঙ্কারি। এস আলম গ্রুপের সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণে থাকা ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক— এই চার ইসলামী ব্যাংক ছাড়াও বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম মজুমদারের এক্সিম ব্যাংক চরম তারল্য সংকট ও অনাদায়ী ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে এসব ব্যাংক আমানতকারীদের দৈনিক চাহিদা অনুযায়ী টাকা ফেরত দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলে অন্তর্বর্তী সরকার তাদের একীভূত করে শতভাগ সরকারি মালিকানাধীন ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, একীভূত হওয়া এই পাঁচ ব্যাংকে মোট ৭৬ লাখ আমানতকারীর প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণের মধ্যে কেবল সাধারণ ব্যক্তি আমানতকারীদের সঞ্চয়ী হিসাবের পরিমাণই প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা।

ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত ভঙ্গুর। এই পাঁচ ব্যাংকে বিতরণ করা মোট ১ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা ঋণের মধ্যে প্রায় ৮৬ শতাংশই বর্তমানে ভয়াবহ খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। ব্যাংকগুলোর পুঞ্জীভূত মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। 

গত বছরের নভেম্বরে শতভাগ সরকারি ব্যাংক হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত মূলধন ধরা হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এই পরিশোধিত মূলধনের মধ্যে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা যোগান দিয়েছে এবং অবশিষ্ট ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ারে রূপান্তরের মাধ্যমে সমন্বয় করা হচ্ছে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 
  বিষয়:   মুসলিম দেশ  বিনিয়োগ  সরকার  উদ্যোগ 


Advertisement
Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: