ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) শাখা ছাত্রশিবিরের এক নেতাকে চড় মারাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে শহীদুল ও বাবুল নামে দুই জামায়াতকর্মী আহতের ঘটনা ঘটেছে। এর আগে শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) দুপুর ৩টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের এক ছাত্রকে ছাত্রদলের সদস্য থাপ্পড় দিলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের জিয়া হল সেক্রেটারি জুহায়ের হোসেনকে চড় মারেন শাখা ছাত্রদলের সদস্য আলীনূর রহমান। জুহায়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের দাওয়াহ বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং আলীনূর আরবি বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। এ ঘটনার পর ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে শহীদ জিয়া হলে আসেন। সেখানে ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মীও উপস্থিত হন। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয়। পরে আলীনূর হলটির ২১৭ নম্বর কক্ষে অবস্থান নেন।
পরে বিষয়টি সমাধানের জন্য জিয়া হলের প্রভোস্টের কক্ষে আলোচনায় বসেন ভুক্তভোগী জুহায়েরসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান, হল প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. সেলিম রেজা, শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি রাশেদুল ইসলাম রাফি, ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক সাহেদ আহমেদ, আহ্বায়ক মাসুদ রুমী মিথুন ও সদস্যসচিব রাফিজ আহমেদসহ অন্যান্য নেতাকর্মী। এ সময় কক্ষের বাইরে শিবিরের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। পরে প্রক্টরিয়াল বডির নেতৃত্বে আলীনূরকে আনতে গেলে ফের উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। কক্ষটি তালাবদ্ধ থাকায় তাকে সেখান থেকে বের করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে, আলীনূরকে উপস্থিত করতে না পারা এবং শিবিরের নেতাকর্মীরা উত্তেজনা সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ তুলে ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দ আলোচনা থেকে উঠে চলে যান। এ সময় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে আবারও ধাক্কাধাক্কি ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ ও প্রক্টরিয়াল বডির নেতৃত্বে তাকে হল থেকে উদ্ধার করে সরিয়ে নেওয়া হয়। এ সময় শিবিরের নেতাকর্মীরা আলীনূরের ওপর চড়াও হন এবং প্রক্টরের গাড়িতে ইট নিক্ষেপ করেন।
এ সময় ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে জিয়া মোড়ে অবস্থান নেন। ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা রামদাসহ দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে অবস্থান নেন। এ সময় ছাত্রদল প্রধান ফটক বন্ধ করে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রক্টরিয়াল বডির পাশাপাশি অতিরিক্ত পুলিশ ও র্যাব মোতায়েন করা হয়।
পরে সাড়ে পাঁচটার দিকে ছাত্রদল প্রধান ফটক খুলে দিয়ে ফের ফটকের সামনে অবস্থান নেয়। এ সময় স্থানীয় কয়েকজন জামায়াতকর্মী প্রধান ফটকে এলে তাঁদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে শহীদুল ও বাবুল নামে দুই জামায়াতকর্মী আহত হন। আহতদের হরিনারায়ণপুর চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, এ ঘটনায় সন্ধ্যায় প্রক্টর অফিসে উভয় সংগঠনের নেতৃবৃন্দের মধ্যে সমঝোতা হয়। তবে এরপরও স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা খুলনা-কুষ্টিয়া মহাসড়কে শোডাউন দিচ্ছেন। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া মোড়, লালন শাহ হলের পকেট গেট ও আজিজ হলের পকেট গেটে অবস্থান করছেন স্থানীয় জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা।
এ বিষয়ে শাখা ছাত্রশিবিরের জিয়া হল সেক্রেটারি জুহায়ের হোসেন বলেন, আমি ক্লাস শেষে অনুষদে অবস্থান করছিলাম। হঠাৎ আলীনূর এসে আমাকে থাপ্পড় মারেন এবং গালাগালি করেন। পরে কেন আমাকে মারলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার ইচ্ছা হয়েছে, তাই মেরেছি। আপনি কী করতে পারেন করেন।’ আমি তাঁর স্থায়ী বহিষ্কার দাবি করছি। পাশাপাশি তিনি হলের অবৈধ শিক্ষার্থী। তাঁকে হল থেকে বের করে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করতে হবে।
অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা আলীনূর রহমান বলেন, আমি তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাকে বেয়াদব বলি। পরে তিনি আমাকে গালি দেন। এ সময় আমি তাকে থাপ্পড় দিই। তবে তার সঙ্গে আমার আগে কোনো সমস্যা ছিল না।
শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি রাশেদুল ইসলাম রাফি বলেন, আমরা এ ঘটনার বিচার চাই। বিষয়টি সমাধানের জন্য আমরা আলোচনায় বসেছিলাম। কিন্তু ছাত্রদল কর্মী রাহী আমাদের নেতাকর্মীদের গালাগালি করায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে ছাত্রদলের নেতারা সমঝোতার আলোচনা থেকে বেরিয়ে যান। তারা মূলত বিচার চান না।
শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মাসুদ রুমী মিথুন বলেন, সবাই বসে সমঝোতা হয়েছে। বাকিটা প্রশাসন দেখবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান বলেন, আপাতত ঘটনাটি সমাধান হয়েছে। খুব শিগগিরই তদন্ত কমিটি গঠন, অতিরিক্ত পুলিশ ও র্যাব মোতায়েন, হলের গেট বন্ধ, বহিরাগত নিষিদ্ধ এবং মেধার ভিত্তিতে সিট দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, খুব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ঘটনাটি ঘটেছে, যা দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত। তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রক্টর, স্টুডেন্ট অ্যাডভাইজার ও উভয় পক্ষকে নিয়ে বৈঠক করা হয়েছে। ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে।
সময়ের আলো/আতা