ইরান যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নতুন ও বড় ধরনের কৌশল নিয়ে কাজ করছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এই পরিকল্পনার লক্ষ্য ইরানকে মোকাবিলায় আঞ্চলিক মিত্রদের আরও ঘনিষ্ঠ করা এবং ইসরায়েলের সঙ্গে আরব দেশগুলোর সম্পর্ক আরও গভীর করা।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে গালফ নিউজ জানিয়েছে, ট্রাম্প ব্যক্তিগত আলোচনায় মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ‘আরও বড় কিছু’ করার কথা বলেছেন। গত কয়েক সপ্তাহে জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাদের সঙ্গে দুটি বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি। তবে পরিকল্পনাটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
দুই মার্কিন কর্মকর্তা ও আলোচনার বিষয়ে অবগত আরও দুই ব্যক্তি অ্যাক্সিওসকে জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এবং ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতির দিকনির্দেশনা দিতে এই কৌশল তৈরি করা হচ্ছে।
পরিকল্পনায় তিনটি প্রধান দিক
প্রস্তাবিত কৌশলের প্রথম দিক হলো ইরানকে মোকাবিলায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের আরও ঘনিষ্ঠভাবে একত্রিত করা। এ ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন নিরাপত্তার নিশ্চয়তাদাতা হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি হওয়া বিভিন্ন সংঘাত ও উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া। এর মধ্যে গাজায় ট্রাম্পের পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপ এগিয়ে নেওয়া, ইসরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা এবং ইসরায়েল-লেবানন চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয় থাকতে পারে।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ হতে পারে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের পরিধি বাড়ানো এবং সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি করা।
সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে পারলে তা ট্রাম্পের জন্য বড় কূটনৈতিক অর্জন হতে পারে এবং ইরান যুদ্ধের পর নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ার প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে।
সৌদি আরব কেন গুরুত্বপূর্ণ
সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক হলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করাও কঠিন।
রিয়াদ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে অগ্রগতির শর্ত দিয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েলি রাজনীতিতে এ ধরনের উদ্যোগের বিরোধিতা রয়েছে।
এ ছাড়া ইরানের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সম্পর্ক ও স্বার্থ এক নয়। ফলে ওয়াশিংটনের পরিকল্পনা অনুযায়ী এসব দেশকে একই আঞ্চলিক জোটে নিয়ে আসা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
পরিকল্পনার কেন্দ্রে ইরান
বৃহত্তর কূটনৈতিক উদ্যোগের পরও ট্রাম্পের নতুন কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে ইরান। যুদ্ধের কারণে ইরানের সামরিক সক্ষমতার কিছু অংশ দুর্বল হয়েছে এবং দেশটির অর্থনীতিও চাপের মুখে পড়েছে। তারপরও তেহরান এখনো প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করার সক্ষমতা দেখিয়ে যাচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি এ সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে রয়েছে। ওয়াশিংটন সেখানে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে চাইছে। অন্যদিকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুটটির ওপর নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে চাইছে তেহরান।
ছয় মাসের সংঘাতে ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক চাপ, আলোচনা ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে বারবার কৌশল পরিবর্তন করেছে। ফলে স্থায়ী সমাধানের পথ এখনো অনিশ্চিত।
ইসরায়েলের নির্বাচনেও প্রভাব
ট্রাম্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে নির্বাচন এবং নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন আশা করছে, নির্বাচনের পর গঠিত ইসরায়েলি সরকার ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক কৌশলের সঙ্গে সহযোগিতা করবে। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, ইসরায়েলের নির্বাচনে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হলেও ট্রাম্প পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারেন।
এখনো পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত রূপ পায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ রাজনৈতিক পর্যায়ের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি সংস্থাও এটি নিয়ে কাজ করছে। সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, প্রস্তাবটি চূড়ান্ত হতে আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
তবে ট্রাম্পের উচ্চাকাঙ্ক্ষার দিকটি স্পষ্ট—ইরান, গাজা, সিরিয়া, লেবানন এবং আরব-ইসরায়েল সম্পর্ককে আলাদা আলাদা সমস্যা হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত আঞ্চলিক কৌশলের অংশ হিসেবে মোকাবিলা করতে চাইছে ওয়াশিংটন।
তবে নতুন মধ্যপ্রাচ্য ব্যবস্থা গড়ার আগে ট্রাম্প প্রশাসনকে চলমান ইরান যুদ্ধেরই একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।
সময়ের আলো/কেএইচ