ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হওয়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা প্রায় ১০০ জনের দেহাবশেষ দাফন করছেন ফিলিস্তিনিরা। নিহতদের মধ্যে অন্তত ৬০ জন শিশু রয়েছে। গাজার উত্তরাঞ্চলের জেইতুন এলাকায় এসব ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করা হয়।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) পরিবারের সদস্যরা জেইতুন এলাকা থেকে দেহাবশেষগুলো মধ্য গাজা সিটির আল-মামাদানি কবরস্থানে নিয়ে যান। সেখানে স্বজনদের উপস্থিতিতে তাদের দাফন করা হয় বলে ঘটনাস্থল থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক গাজি আল-আলুল জানিয়েছেন।
গাজায় ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িঘরের ধ্বংসস্তূপ থেকে নিহতদের দেহাবশেষ উদ্ধারে কয়েক সপ্তাহ ধরে কাজ করেছেন বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য ও স্বজনেরা। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে বহু ভবন ধ্বংস হয়েছে।
উদ্ধার হওয়া নিহতদের অনেকেই মালাকা পরিবারের সদস্য। শুধু এই পরিবারেই ৫৫ জন সদস্য নিহত হয়েছেন।
আল-আলুল জানান, স্বজনেরা দীর্ঘদিন ধরে প্রিয়জনদের ‘পরিচিত ও যথাযথ কবরস্থানে’ দাফনের সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। তবে গাজার সব পরিবার এই সুযোগ পাচ্ছে না। যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি বাহিনী গাজার বিভিন্ন এলাকায় কবরস্থান ধ্বংস ও খুঁড়ে ফেলেছে বলেও তিনি জানান।
ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা দেহাবশেষগুলো কাফনে মোড়ানো থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলো মরদেহের সম্পূর্ণ অংশ নয়, বরং হাড় ও শরীরের বিভিন্ন খণ্ডাংশ।
আল-আলুল বলেন, এসব মূলত হাড়ের অংশ এবং বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে মরদেহের সঙ্গে পাওয়া ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের অবশিষ্টাংশ।
তিনি জানান, ওই স্থান থেকে কোনো পূর্ণাঙ্গ মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তার দাবি, ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর কারণে উদ্ধার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং দ্রুত কাজ শেষ করার ক্ষেত্রেও বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।
আরও হাজারো মরদেহ ধ্বংসস্তূপের নিচে
গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রধান রায়েদ আল-দাহশান আল জাজিরাকে জানান, ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা আরও হাজারো নিখোঁজ মানুষের মরদেহ উদ্ধারে তার সংস্থা পরিকল্পনা করছে। তবে ভারী যন্ত্রপাতির সংকটের কারণে উদ্ধারকাজ এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, উদ্ধারকর্মীদের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সুরক্ষা সামগ্রীও তাদের কাছে নেই।
আল-দাহশানের ধারণা, ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা আনুমানিক ৮ হাজার মরদেহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পাওয়া গেলে প্রায় ৯০ দিনের মধ্যে উদ্ধার করা সম্ভব। তবে এসব সরঞ্জাম গাজায় প্রবেশ করতে না দেওয়া হলে উদ্ধারকাজ শেষ হতে বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে।
প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতির একটি বিস্তারিত তালিকা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। এমনকি উদ্ধার কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়েও তারা রাজি বলে জানান তিনি।
উদ্ধারকাজের জন্য বড় আকারের খননযন্ত্র, উদ্ধারকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে দেহাবশেষ শনাক্তের জন্য বিশেষ অনুসন্ধান সরঞ্জাম প্রয়োজন বলে জানান আল-দাহশান।
স্বজনদের তথ্যের ভিত্তিতে মরদেহ শনাক্ত
ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা দেহাবশেষ শনাক্ত করতে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি ও প্রতিবেশীদের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। কোনো ভবনে কারা ছিলেন এবং হামলার সময় তারা কোথায় অবস্থান করছিলেন, এসব তথ্যের ভিত্তিতে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হয়।
একইসঙ্গে প্রকৌশলীদের একটি দল ঘটনাস্থলেই উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন আলামত বাছাই ও নথিভুক্ত করেছে।
আল-দাহশান বলেন, হামলার আগে বাসিন্দাদের সতর্ক না করার কারণে এখনও গাজার বহু বাড়ি খনন করে তল্লাশি চালানো প্রয়োজন। তার মতে, কয়েক ডজন, এমনকি কয়েক শ বাড়ির ধ্বংসস্তূপ এখনো খুঁজে দেখা বাকি।
‘এই ধ্বংসাবশেষ যুদ্ধের নির্মমতার স্মারক’
অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়ের প্রধান অজিত সুনগে আল জাজিরাকে বলেন, উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষের দৃশ্য এই সংঘাতের নির্মমতার কথা মনে করিয়ে দেয়। কিছু দেহাবশেষ ২০২৩ সালের নভেম্বরের বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, হাজারো মানুষ এখনো এই ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে আছেন। এমন কিছু এলাকাও রয়েছে, যেগুলো ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে। গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকায় প্রবেশ করে মরদেহ উদ্ধারে বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই হবে। এই সংবেদনশীল সময়ে আমরা যে প্রমাণ সংগ্রহ করতে পেরেছি, সেগুলো সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৭৩ হাজার ৬৫১ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৪ হাজার ৫৯২ জন আহত হয়েছেন।
এদিকে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পরিচালিত আরও কয়েকটি উদ্ধার অভিযানে এক হামলায় নিহত আবু শারিয়া ও হাসানিয়া পরিবারের ১০০ জনের বেশি সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। কর্মকর্তারা ও স্থানীয় অধিকারকর্মীরা জানিয়েছেন, আল-তাজ টাওয়ার এলাকায় ধ্বংসস্তূপ থেকে আরও ৫০০ জনের বেশি মানুষের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ