বান্দরবান জেলা কারাগারে ধারণক্ষমতার তুলনায় চারগুণেরও বেশি বন্দী থাকায় কারাগারের ভেতরে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। অতিরিক্ত হাজতি ও কয়েদীর চাপে কারাগারে তৈরি হয়েছে গাদাগাদি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। প্রচণ্ড গরম, আবাসন সংকট ও সীমিত সুযোগ-সুবিধার কারণে বন্দীদের মধ্যে চর্মরোগসহ নানা শারীরিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। একই সঙ্গে জায়গার সংকটকে কেন্দ্র করে বন্দীদের মধ্যে সামান্য বিষয়েও কথা-কাটাকাটি, হাতাহাতি ও বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটছে বলে জানিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ।
কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালের দিকে বান্দরবান জেলা কারাগারকে সাব-কারাগার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কারাগারটি এখনো সাব-কারাগার হিসেবেই রয়েছে। কারাগারটির অনুমোদিত ধারণক্ষমতা মাত্র ১১৪ জন। বিপরীতে বর্তমানে সেখানে বন্দী রয়েছেন ৫৫৭ জন। অর্থাৎ অনুমোদিত ধারণক্ষমতার তুলনায় বন্দীর সংখ্যা চারগুণেরও বেশি।
বর্তমান বন্দীদের মধ্যে ৪৭৫ জন বিচারাধীন হাজতি এবং ৮২ জন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদী। সীমিত জায়গায় বিপুলসংখ্যক বন্দী রাখায় কারাগারের অবকাঠামো, আবাসন, চিকিৎসা, স্যানিটেশন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
কারাগারে মিয়ানমারের আরাকান আর্মির সদস্য, ভারতীয় নাগরিক, হত্যা মামলার আসামি, নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতা-কর্মী এবং পাহাড়ের সশস্ত্র সংগঠন কেএনএফের সদস্যসহ বিভিন্ন মামলার আসামি বন্দী রয়েছেন। বিভিন্ন শ্রেণির বিপুলসংখ্যক বন্দীকে সীমিত পরিসরে রাখার কারণে কারাগারের স্বাভাবিক ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
কারাগার সূত্র জানায়, অতিরিক্ত বন্দীর কারণে থাকার জায়গা, চলাচল ও দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ বেশি মানুষ একই স্থানে অবস্থান করায় বন্দীদের গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। প্রচণ্ড গরম ও বদ্ধ পরিবেশে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। কারও কারও মধ্যে চর্মরোগসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দিয়েছে।
কারা সংশ্লিষ্টরা জানান, অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে বন্দীদের ব্যক্তিগত পরিসর প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও উত্তেজনার ঝুঁকি বাড়ছে। সামান্য বিষয় নিয়েও কথা-কাটাকাটি থেকে হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনা ঘটছে।
এ ছাড়া কম বয়সী বন্দীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সম্প্রতি কারাগারের ভেতরে এক তরুণ বন্দী যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। অতিরিক্ত ভিড় ও পর্যাপ্ত ব্যক্তিগত পরিসরের অভাব এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বান্দরবান জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ও মানবাধিকারকর্মী অং চ মং মার্মা বলেন, ধারণক্ষমতার তুলনায় চার-পাঁচ গুণ বেশি বন্দী রাখায় বান্দরবান জেলা কারাগারে শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারাবন্দীদের পর্যাপ্ত আবাসন, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। অতিরিক্ত বন্দীর কারণে এসব মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে প্রয়োজনে বন্দীদের অন্য কারাগারে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, বন্দীদের মানবিক ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। এ পরিস্থিতিতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্যদের বান্দরবান জেলা কারাগার সরেজমিনে পরিদর্শন করে বন্দীদের বাস্তব অবস্থা, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নতুন ভবন নির্মাণ অথবা কারাগারের অবকাঠামো সম্প্রসারণ করে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
বান্দরবান সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত মানুষ একই কক্ষে গাদাগাদি করে থাকলে স্বাভাবিকভাবেই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হবে। একই সঙ্গে তাদের বাথরুমও ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়বে।
তিনি বলেন, এমন পরিবেশে চর্মরোগ, যক্ষ্মা, খোসপাঁচড়াসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে কারও হাম বা যক্ষ্মার মতো সংক্রামক রোগ দেখা দিলে অল্প সময়ের মধ্যেই তা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে কারাগারের ভেতরে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বান্দরবান জেলা কারাগারের জেল সুপার (ভারপ্রাপ্ত) মনজুরুল ইসলাম বলেন, কারাগারে ধারণক্ষমতার চারগুণের বেশি বন্দী রয়েছেন। ২৫ জনের থাকার জায়গায় প্রায় ১১০ জনকে থাকতে হচ্ছে। ফলে চর্মরোগসহ নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। অল্প বয়সী বন্দীদের যৌন নিপীড়নের ঘটনাও ঘটেছে। আবাসন সংকটের কারণে সামান্য বিষয় নিয়েও বন্দীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়ে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বন্দীদের আবাসন সংকট ও কারাগারের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন ভবন নির্মাণ এবং কারাগার সম্প্রসারণের জন্য কারা উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) বরাবর লিখিত চিঠি দেওয়া হয়েছে।
সময়ের আলো/জোই