৫৫ বছর ধরে বিনা পয়সায় পড়াচ্ছেন রমনী কান্ত

মোফাজ্জেল হোসাইন, বরিশাল

সারাদেশ

বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলায় গত ৫৫ বছর ধরে শিশুদের মাঝে বিনামূল্যে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন রমনী কান্ত বেপারী। বয়সের ভার শরীরে স্পষ্ট

2026-09-08T20:08:23+00:00
2026-09-08T20:22:25+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৪ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
৫৫ বছর ধরে বিনা পয়সায় পড়াচ্ছেন রমনী কান্ত
মোফাজ্জেল হোসাইন, বরিশাল
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:০৮ পিএম  আপডেট: ০৮.০৯.২০২৬ ৮:২২ পিএম
৫৫ বছর ধরে বিনা পয়সায় পড়াচ্ছেন রমনী কান্ত
বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলায় গত ৫৫ বছর ধরে শিশুদের মাঝে বিনামূল্যে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন রমনী কান্ত বেপারী। বয়সের ভার শরীরে স্পষ্ট হলেও শিক্ষাদানের নেশায় এখনো ক্লান্ত নন তিনি। প্রত্যন্ত গ্রামের শিশুদের বিনা পয়সায় পড়িয়ে আসছেন বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার ইউনিয়নের রাংতা গ্রামের রমণী কান্ত। কয়েক প্রজন্মের কাছে যার হাতেখড়ি, সেই মানুষটি জীবনের দীর্ঘ সময় উৎসর্গ করেছেন গ্রামের দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের শিশুদের লেখাপড়া শেখাতে।

রাংতা গ্রামের রাখাল বেপারীর ছেলে রমণী কান্ত বেপারী যখন নিজেই স্কুলের ছাত্র, তখন থেকেই এলাকার গরীব পরিবারের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের পড়ানো শুরু করেন। সালটা ছিল স্বাধীনতারও আগে। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুদের পড়ানোর সেই যে শুরু, বয়স ৭০ পেরিয়ে গেলেও তা আর থামেনি আজও। সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে শিক্ষাব্যবস্থা, বদলেছে গ্রামের জীবনযাত্রা, এসেছে আধুনিক স্কুলসহ প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা। কিন্তু রাংতা গ্রামের এই ছোট্ট পাঠশালায় এখনো প্রতিদিন শোনা যায় শিশুদের পড়ার আওয়াজ।

Advertisement
১৯৭৩ সালে চাঁদশী ঈশ্বর চন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মেট্রিকুলেশন (এসএসসি) পাস করার পর ভর্তি হন সরকারি গৌরনদী কলেজে। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হতে পারেনি সদা হাস্যজ্জ্বল রমণী কান্ত। তবে মেধাবী হওয়ায় সে সময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরিতে যোগ দেওয়ার বয়সের ভার স্পষ্ট তবুও শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন বরিশালের রমনী কান্ত

সুযোগ ছিল তার। কিন্তু ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের প্রতি মায়া আর ভালোবাসার কারণে চাকরিতে না গিয়ে বেছে নেন তাদের পড়ানোর পথ। এরপর কেটে গেছে একে একে প্রায় ছয় দশক।


রাংতা সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরের আঙিনাই হয়ে উঠেছে তার পাঠশালা। সপ্তাহে শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সেখানে চলে শিশুদের পাঠদান। বর্তমানে ১৫ থেকে ২০ জন শিশু নিয়মিত তার কাছে পড়াশোনা করছে। পাঠশালা থেকে পড়াশোনা শেষে নিজ হাতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পৌঁছে দেন পার্শ্ববর্তী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

এই দীর্ঘ সময়ে তার কাছ থেকে পড়াশোনা করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন এলাকার অসংখ্য মানুষ। কেউ দেশের বিভিন্ন স্থানে চাকরি করছেন, কেউবা বড় বড় পদে দায়িত্ব পালন করছেন। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে একই পরিবারের তিন প্রজন্মের হাতেখড়িও হয়েছে তার কাছে। যে বাবার হাত ধরে একদিন শিশু অবস্থায় রমণী স্যারের কাছে পড়তে এসেছিলেন, সেই বাবার সন্তানও তার কাছেই পড়েছে এই পাঠশালায়। এখন সেই পরিবারের নাতি-নাতনীও তার কাছেই নিচ্ছেন হাতেখড়ি। রমণী কান্ত বেপারীর পাঠশালায় নেই কোনো মাসিক বেতন। গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা যাতে অর্থের অভাবে পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই লক্ষ্যেই বছরের পর বছর ধরে তিনি শিশুদের পড়িয়ে যাচ্ছেন।

তার নিজের জীবনও খুবই সাদামাটা। স্ত্রী রুম্পাকে নিয়ে সংসার। বাড়িতে একটি দোচালা টিনের ঘরেই তাদের বসবাস। একমাত্র ছেলে তাপস বেপারী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। নিজের কিছু কৃষিজমি রয়েছে। অভাব অনটনের এই জীবনের মধ্যেও শিশুদের পড়ানোর আনন্দই যেন তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ও সাফল্য।

রমণী কান্ত বলেন, স্বাধীনতার আগে থেকেই এখানে বসে এলাকার ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের পড়িয়ে আসছি। যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন যেন এভাবেই এই শিশুদের কিছু শিক্ষা দিয়ে যেতে পারি।


তার কাছে পড়তে আসা শিক্ষার্থী শামীম, অর্ক, বিজয়, আকলিমা জানান, এই পাঠশালায় পড়তে তাদের অনেক ভালো লাগে। স্যার ছড়া বলেন, গল্প বলেন, অনেক আদরও করেন। ঐখান থেকে তারা অনেক কিছু শিখতে পারেন।

তার ঐই শিক্ষাদানে সন্তুষ্ট শিশুদের অভিভাবকরাও। অভিভাবক কালাম শিকদার, প্রশান্ত কুমার, গোপাল জানান, রমনী স্যারের কাছে তাদের বাবারাও পড়েছেন। তারাও তার কাছ থেকে শিশু কালে শিক্ষা নিয়েছেন। এখন তাদের ছেলেও পড়ছে। তারা বলেন, আমাদের পরিবারের তিন প্রজন্মই তার কাছে পড়াশোনা করেছে। আমারা আমাদের সন্তানকে প্রতিনিয়ত রমণী স্যারের কাছে পড়াতে নিয়ে আসি। স্যার খুবই ভালো পড়ান। তিনি যত্ন নিয়ে শিশুদের পড়ান। হঠাৎ দুই-একদিন যদি আমাদের সন্তান এখানে না আসে তবে তিনি খোঁজ নিতে আমাদের বাড়িতে চলে যান। এই যুগে তার মতো একজন ভালো লোক পাওয়া আসলেই ভাগ্যের ব্যপার।

রাংতা সার্বজনীন দুর্গা মন্দির কমিটির সভাপতি রনজিত বৈদ্য’র জানান, স্বাধীনতার আগে থেকেই রমণী কান্ত বেপারী এখানে বসে এলাকার শিশুদের পাঠদান দিয়ে আসছে। তার কারণে এলাকার অসহায় ও দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছে। কোনো পারিশ্রমিকের প্রত্যাশা নেই, নেই প্রচারের আকাঙ্ক্ষা। জীবনের প্রায় পুরোটা সময় শিশুদের শিক্ষার পেছনে ব্যয় করে রমণী কান্ত বেপারী যেন নীরবে প্রমাণ করে চলেছেন শিক্ষা শুধু পেশা নয়, মানুষের জীবন বদলে দেওয়ারও এক মহৎ দায়িত্ব। আর তাই ছয় দশক ধরে রাংতা গ্রামের শিশুদের কাছে তিনি শুধু একজন শিক্ষক নন, তিনি এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান, যার পাঠশালায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম জ্বলে উঠেছে শিক্ষার আলো।

সরকারি ভাবে কোন সহযোগীতা পেলে রমণী কান্ত গ্রামের সব শিশুদের মাঝে বৃহত্বর পতিসরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে পারবেন বলে মনে করেন গ্রামবাসী।

সময়ের আলো/জোই
  বিষয়:   বয়স  স্পষ্ট  শিক্ষা  বরিশাল  রমনী কান্ত  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: