২০০৭ সালের ভয়াল ঘূর্ণিঝড় সিডরের তাণ্ডবে ভেঙে পড়েছিল বসতঘর। সামর্থ্য না থাকায় সেই ঘরই কোনোভাবে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার বড় কৈবতখালি গ্রামের দিনমজুর লিটন হাওলাদার। এরপর কেটে গেছে প্রায় ১৯ বছর, ঘরটি আর মেরামত করা হয়নি। ৩ সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে সেখানেই মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তিনি।
সরেজমিনে দেখা যায়, জরাজীর্ণ ঘরটির বিভিন্ন অংশে কোনো বেড়া নেই। কাঠের পুরনো কাঠামো অনেকটা নড়বড়ে হয়ে গেছে। ভাঙা দরজাটি বাঁশ দিয়ে ঠেকনা দেওয়া। ছাউনির বিভিন্ন অংশ দিয়ে আকাশ দেখা যায়। বৃষ্টির পানি ঠেকাতে ছাউনির ওপর পলিথিন টাঙানো হয়েছে। কিন্তু তাতেও শেষরক্ষা হয় না। সামান্য বৃষ্টিতেই ঘরের ভেতরে পানি পড়ে মেঝে স্যাঁতসেঁতে হয়ে যায়।
এই ভাঙা ঘরেই মানবেতর জীবন কাটছে দিনমজুর লিটন হাওলাদারের পরিবারের। ছবি : সময়ের আলো
ঘরের এক কোণে গুছিয়ে রাখা সন্তানদের বই-খাতা, জামাকাপড়সহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। বৃষ্টির সময় এগুলো সরিয়ে নিরাপদ জায়গায় রাখার চেষ্টা করেন পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু পুরো ঘরেই যখন পানি ঢোকে, তখন অনেক কিছুই রক্ষা করা সম্ভব হয় না। লিটন হাওলাদার দিনমজুরি করে যা আয় করেন, তা দিয়ে কোনোরকমে পরিবারের খাবার জোটে। নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ, সন্তানদের পড়াশোনা ও চিকিৎসার ব্যয় মেটানোর পর ঘর মেরামতের মতো অর্থ হাতে থাকে না। ফলে, বছরের পর বছর ধরে ঝুঁকিপূর্ণ ঘরেই বসবাস করতে হচ্ছে পরিবারটিকে।
লিটন হাওলাদার বলেন, ‘আমি দিনমজুরি করে সংসার চালাই। খাবার জোগাড় করতেই কষ্ট হয়। ২০০৭ সালের ঝড়ে ঘরটি ভেঙে যাওয়ার পর কোনোভাবে দাঁড় করিয়ে রেখেছি। এত বছরেও ঘরটি ঠিক করতে পারিনি। এখন বেড়া নেই, দরজাও ভাঙা। বাঁশ দিয়ে ঠেকনা দিয়ে রেখেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বৃষ্টি হলে ঘরের মধ্যে পানি পড়ে। সন্তানদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। আমার সামর্থ্য নেই নতুন ঘর করার। সরকার বা কোনো বিত্তবান মানুষ যদি একটু সহযোগিতা করেন, তাহলে সন্তানদের নিয়ে অন্তত মাথা গোঁজার মতো একটা ঘর করতে পারতাম।’
লিটনের স্ত্রী ঝুমুর বেগমের কণ্ঠেও অসহায়ত্ব। তিনি বলেন, ‘সন্তানদের নিয়ে এই ঘরে থাকতে খুব ভয় লাগে। ঝড়-বৃষ্টি হলে মনে হয়, কখন ঘরটি ভেঙে পড়ে। আমাদের পক্ষে নতুন ঘর তৈরি বা পুরনো ঘর মেরামত করা সম্ভব নয়।’
এই পরিবারের সন্তানদের জীবনেও দারিদ্র্যের ছাপ স্পষ্ট। বলাইবাড়ি স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী মুছা হাওলাদার জানায়, ‘বৃষ্টি হলে আমাদের ঘরের ভেতরে পানি পড়ে। বই-খাতা, জামা-কাপড়ও ভিজে যায়। পড়াশোনা করতে খুব কষ্ট হয়। রাতে বৃষ্টি হলে ভয় লাগে। আমাদের যদি একটা ভালো ঘর থাকত, তাহলে এত কষ্ট হতো না।’
লিটনের আরেক সন্তান ইসা অষ্টম শ্রেণির পর অভাবের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেনি। মেয়ে আয়সা বর্তমানে শিশু শ্রেণিতে পড়ছে। পরিবারের সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কা তৈরি করেছে।
স্থানীয়রা জানান, লিটনের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে এমন ঝুঁকিপূর্ণ ঘরে বসবাস করলেও, তাদের জন্য এখনো স্থায়ীভাবে নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা হয়নি। বর্ষা কিংবা দুর্যোগের সময় পরিবারটির দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। ঘরটির অবস্থা এমন যে, বড় ধরনের ঝড় হলে প্রাণহানির আশঙ্কাও রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, শুধু খাদ্য বা আর্থিক সহায়তা নয়, এই পরিবারের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন একটি নিরাপদ বাসস্থান। সরকারি আবাসন প্রকল্প, দুর্যোগ সহনীয় ঘর কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের কোনো সহায়তার আওতায় পরিবারটিকে আনা গেলে ৩ সন্তানসহ পুরো পরিবারটি নিরাপদে বসবাসের সুযোগ পেতে পারে।
এ বিষয়ে রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত আরা মৌরি বলেন, ‘পরিবারটির বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তারা যদি সরকারি আবাসন সহায়তার উপযুক্ত হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের আওতায় তাদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি যাচাই করা হবে। এছাড়া জরুরি ভিত্তিতে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া যায়, সেটিও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেখা হবে।’