পূর্ব জেরুজালেমে থাকা ব্রিটিশ কনস্যুলেট ৩০ দিনের মধ্যে বন্ধ করে দিতে যুক্তরাজ্যকে নির্দেশ দিয়েছে ইসরায়েল। ব্রিটেন, ফ্রান্স ও কানাডা ইসরায়েলি বসতিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিগুলোর বিরুদ্ধে ব্রিটেনের নেওয়া বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার জবাবেই কনস্যুলেট বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইসরায়েলের এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে এলো, যখন গাজায় যুদ্ধ এবং পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের কারণে দেশটির সঙ্গে একসময় ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গেও দূরত্ব বাড়ছে।
পূর্ব জেরুজালেমের ব্রিটিশ কনস্যুলেট জেরুজালেম, পশ্চিম তীর ও গাজায় ফিলিস্তিন-সংক্রান্ত বিষয়ে যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধিত্ব করে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আরও কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, ব্রিটেনকে কনস্যুলেট বন্ধ করার জন্য ৩০ দিনের সময়সীমা দেওয়া হয়েছে।
ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধের নির্দেশের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে ইসরায়েল।
দেশটিতে প্রবেশের ওপর ১২ জন ব্রিটিশ রাজনীতিবিদের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরে দায়িত্ব পালন করা ব্রিটিশ কর্মকর্তা ও কূটনীতিক এবং ইসরায়েলে থাকা গাজা-সমন্বয় কেন্দ্রের ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের চলে যেতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্রিটেনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
তবে ফ্রান্স ও কানাডার বিরুদ্ধে এখনো একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেয়নি ইসরায়েল। এই দুই দেশও ইসরায়েলি বসতি থেকে পণ্য আমদানি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে।
কেন নিষেধাজ্ঞা দিল ব্রিটেন?
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড মঙ্গলবার জানিয়েছিলেন, পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতি থেকে পণ্য আমদানির পাশাপাশি এসব বসতির সঙ্গে নির্মাণ, অবকাঠামো, অর্থায়ন ও আবাসন ব্যবসায় যুক্ত কোম্পানি ও ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফ্রান্স ও কানাডাও ইসরায়েলি বসতি থেকে পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। আরও নয়টি দেশ, যার মধ্যে ডেনমার্ক ও পর্তুগালও রয়েছে, ব্রিটেনের এই পদক্ষেপকে সমর্থন করেছে।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড বলেছেন, ইসরায়েলের পক্ষ থেকে পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়া হবে—এটি তারা ধারণা করেছিলেন।
তিনি বলেন, ব্রিটেন পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাব্য লাভ ও ক্ষতি বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইসরায়েলি পদক্ষেপের আশঙ্কায় ব্রিটেন চুপ করে থাকতে পারেনি।
মিলিব্যান্ড আরও বলেছেন, ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতার বিষয়টি উপেক্ষা করেছে। ব্রিটেনের পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা ধরে রাখা।
ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে খুব কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।
ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেছেন এবং ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ তুলেছেন।
তবে হোয়াইট হাউস বা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এ বিষয়ে বড় ধরনের সমালোচনা করেনি।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, পশ্চিম তীরে এমন কোনো পদক্ষেপ তারা দেখতে চান না, যা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে। তবে ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞা নিয়ে তিনি সরাসরি মন্তব্য করেননি।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলোর সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে কূটনীতিকেরা গুরুত্বপূর্ণ হলেও মূলত প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। কারণ ইসরায়েলি বসতি থেকে আসা পণ্য দেশটির মোট রপ্তানির খুবই ছোট একটি অংশ।
তবে এর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ এর মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
গাজায় যুদ্ধ এবং পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ ও বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতার অভিযোগে ইসরায়েল ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে।
২০২৫ সালে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও কানাডা আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে ছিল। এর আগে তারা ইসরায়েলি বসতি এবং ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানির অভিযোগে কয়েকজন ইসরায়েলি মন্ত্রী ও বসতির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছিল।
এদিকে ব্রিটেনের প্রধান রাব্বি নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করে দিনটিকে ‘অন্ধকার দিন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে ব্রিটিশ ইহুদি সংগঠন ইয়াচাদ, যারা দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে, তারা বলেছে—এই পদক্ষেপ ইসরায়েলবিরোধী বা ইহুদিবিদ্বেষী নয়। সংগঠনটি ইসরায়েলের বর্তমান সরকারকে ‘চরমপন্থী’ হিসেবে উল্লেখ করে অভিযোগ করেছে, সরকারটি দখলদারিত্ব স্থায়ী করার ক্ষেত্রে একের পর এক সীমা অতিক্রম করছে।
সব মিলিয়ে, ব্রিটেনের নিষেধাজ্ঞার জবাবে ইসরায়েলের কনস্যুলেট বন্ধের নির্দেশ দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক দূরত্ব আরও বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সূত্র : রয়টার্স
সময়ের আলো/ইউএমএইচ