পাথরের তলে পরমাণু স্থাপনা

সময়ের আলো ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালে গ্রানাইট পাহাড়ের গভীরে নির্মিত সন্দেহভাজন এক ইরানি পারমাণবিক স্থাপনায় চলতি বছর নির্মাণকাজে ব্যাপক তৎপরতা লক্ষ

2026-09-10T01:26:48+00:00
2026-09-10T01:26:48+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৬ ভাদ্র ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
পাথরের তলে পরমাণু স্থাপনা
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:২৬ এএম 
গ্রানাইট পাহাড়ের গভীরে নির্মিত সন্দেহভাজন ইরানি পারমাণবিক স্থাপনা। ছবি : সংগৃহীত
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালে গ্রানাইট পাহাড়ের গভীরে নির্মিত সন্দেহভাজন এক ইরানি পারমাণবিক স্থাপনায় চলতি বছর নির্মাণকাজে ব্যাপক তৎপরতা লক্ষ করা গেছে বলে জানিয়েছে বিশ্লেষকদের একটি দল। এই দলটি ছয় বছরের স্যাটেলাইট চিত্র পর্যালোচনা করে এমন মন্তব্য করেছে বলে এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন। 

তেহরান থেকে প্রায় ১৪০ মাইল দক্ষিণে নাতানজ পারমাণবিক কমপ্লেক্সের নিকটবর্তী ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ স্থাপনাটি দীর্ঘদিন ধরে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। সংস্থাগুলো মনে করে, ইরান তাদের ভবিষ্যৎ পারমাণবিক কর্মসূচি সুরক্ষিত রাখতে এই স্থানটিকে ব্যবহার করতে পারে।

Advertisement
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) থিঙ্ক ট্যাঙ্কের নতুন স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ অনুযায়ী এ বছর সেখানে ‘নির্মাণকাজে সুস্পষ্ট ঊর্ধ্বগতি’ দেখা গেছে। সিএসআইএস বিশ্লেষকদের মতে, ভূগর্ভস্থ এই স্থাপনাটি ‘সম্ভবত’ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে নকশা করা হয়েছে। ইসরাইলি গোয়েন্দারা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অংশ হিসেবে সেন্ট্রিফিউজগুলো এই স্থানে স্থানান্তরের চেষ্টা করতে পারে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার এই স্থাপনায় হামলার হুমকি দিয়েছেন।

গত সপ্তাহেও সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেছিলেন, আমরা শিগগিরই পিকঅ্যাক্সে আঘাত হানতে পারি। সেসময় তিনি আরও বলেন, সেখানে কারা যাতায়াত করছে, আমরা সব জানি। তবে সিএসআইএস দলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রানাইট পাহাড়টি পেন্টাগনের সবচেয়ে ভারী অ-পারমাণবিক বোমার জন্যও এক কঠিন লক্ষ্যবস্তু। আর এটি একমাত্র ইরানি পারমাণবিক স্থাপনা নয়, যা বর্তমান প্রজন্মের অস্ত্রের নাগালের বাইরে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তবে লক্ষণ দেখা যাচ্ছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানার কোনো উপায় উদ্ভাবনের চেষ্টা চালাচ্ছে। যদিও ইরানের সঙ্গে ছয় মাসের সংঘাতে মার্কিন বাহিনী মূলত অন্য ধরনের লক্ষ্যবস্তুতে মনোনিবেশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর চার দিন আগে, গণবিধ্বংসী অস্ত্র মোকাবিলার দায়িত্বে থাকা পেন্টাগনের একটি অখ্যাত সংস্থার এক কর্মসূচি ব্যবস্থাপক জরুরি ১২ লাখ ডলারের একটি চুক্তির ন্যায্যতা প্রমাণে স্বাক্ষর করেন।

চুক্তিটি ছিল নিউ মেক্সিকোর হোয়াইট স্যান্ডস মিসাইল রেঞ্জে ‘দ্রুত উদীয়মান হুমকির বিরুদ্ধে গোপন সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য নকশা করা লাইভ-ফায়ার পরীক্ষার’ জন্য একটি অনন্য ভূগর্ভস্থ পরীক্ষা কেন্দ্র মেরামত করা। ডিফেন্স থ্রেট রিডাকশন এজেন্সির এই নথিটি ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি ফেডারেল ডাটাবেজে আপলোড করা হয়। যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগের দিন। মেমোতে বলা হয়, ‘দ্রুত পরীক্ষার প্রস্তুতি’ হিসেবে যেভাবে অন্য একটি ডাটাবেজে পেট কনস্ট্রাকশনকে দেওয়া চুক্তিটিকে চিহ্নিত করা হয়েছে তা দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। 

কারণ এটি ‘সংবেদনশীল জাতীয় নিরাপত্তা নির্দেশনার’ সঙ্গে সম্পর্কিত। বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত তিনটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, পরীক্ষাটির পরিকল্পনা ইরান যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল এবং ইরানের গভীরতম ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার উপায় উদ্ভাবন এবং সম্ভবত নির্দিষ্ট পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার মহড়া চালানোর প্রয়োজনীয়তা থেকে এটি করা হয়েছিল।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০২৫ সালের জুনে ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ নামে অভিহিত অভিযানের অংশ হিসেবে পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল। হামলাগুলো তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থান সফলভাবে ধ্বংস করলেও এক শীর্ষ মার্কিন জেনারেল গত বছর দাবি করেন, ইসফাহান পারমাণবিক স্থাপনার কেবল প্রবেশপথগুলোই ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছিল। কারণ পেন্টাগন বিশ্বাস করেছিল যে তাদের বাংকারভেদী বোমা যা ‘ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর (এমওপি)’ নামে পরিচিত সেটি ওই স্থাপনাটিকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করতে পারবে না।

সামরিক বাহিনী বর্তমান এমওপির উত্তরসূরি হিসেবে একটি ‘পরবর্তী প্রজন্মের পেনিট্রেটর’ বোমা তৈরি করতে কাজ করছে, যা আরও গভীরের লক্ষ্যবস্তুতেও আঘাত হানতে সক্ষম হবে। পোটোটাইপের কাজ শুরুর জন্য ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে একটি চুক্তি দেওয়া হয় এবং বিমানবাহিনী জুনে নতুন অস্ত্রটির জন্য প্রতিরক্ষা শিল্পের কাছে আবেদন জানায়।


সিএনএন পর্যালোচনা করা স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে হোয়াইট স্যান্ডসের একটি প্রত্যন্ত ডিটিআরএ ও মার্কিন স্ট্র্যাটেজিক কমান্ড পরিচালিত স্থানে খননকাজ শুরু হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল গভীরে সমাহিত লক্ষ্যবস্তুতে অস্ত্রের প্রভাব পরীক্ষা করা। ওই সময়টি জরুরি চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফেডারেল চুক্তি নথি অনুযায়ী, পেট কনস্ট্রাকশন ১৭ ফেব্রুয়ারি পরীক্ষার কাজের জন্য একটি প্রাক্কলন দেয় এবং পরদিনই চুক্তিটি পায়।

‘অল্টারনেট সিসমিক হার্ডরক ইন সিটু টেস্ট সাইট’ নামে পরিচিত প্রত্যন্ত ওই স্থানে মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত কাজ চলতে থাকে, খননকাজের মাটির স্তূপ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। স্যাটেলাইট চিত্র অনুযায়ী, এরপর কার্যক্রম থেমে যায় বলে মনে হয়। পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের মতোই, হোয়াইট স্যান্ডসের ডিটিআরএ পরীক্ষা কেন্দ্রটিও গ্রানাইট পাথরে খোদাই করা, একটি পরিবেশগত মূল্যায়নে এমন তথ্য দেওয়া হয়েছে।

পরীক্ষাটি আদৌ হয়েছিল কি না, বা স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা ডিটিআরএ পরীক্ষা কেন্দ্রের কাজের উদ্দেশ্য কী ছিল তা সিএনএন স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। পেন্টাগনও সিএনএনের প্রশ্নের তাৎক্ষণিক উত্তর দেয়নি। পেট কনস্ট্রাকশন সিএনএন প্রতিবেদকের কলের জবাব দেয়নি।

মার্কিন সামরিক বাহিনী পিকঅ্যাক্সের বিরুদ্ধে হামলার কার্যকরী পরিকল্পনা সংরক্ষণ করে রেখেছে এবং বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত এক সূত্রের মতে, এ বছরের গ্রীষ্মের শুরুতে যখন ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সংঘাত বাড়ানোর হুমকি দিচ্ছিলেন, তখন এটি লক্ষ্যবস্তুর তালিকার অংশ ছিল বা বিবেচনাধীন ছিল। সূত্রটি আরও বলছে, পিকঅ্যাক্সের হামলা পরিকল্পনায় মার্কিন অস্ত্রাগারের সবচেয়ে বড় কিছু বোমা ব্যবহারের কথা ছিল। তবে ওই অস্ত্রগুলো ইরান সেখানে যা কিছু সরিয়ে নিয়ে থাকতে পারে তা ধ্বংস করার মতো যথেষ্ট গভীরে প্রবেশ করতে পারবে কি না বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়।

ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত হামলার পরিকল্পনা তৈরির প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত এক সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, প্রতিরক্ষা দফতরের অভ্যন্তরে সম্প্রতি এই বিষয়ে একটি পরিকল্পনা স্প্রিন্ট অনুষ্ঠিত হয়েছে। সিএসআইএস বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের স্থাপনাটি ‘সম্ভবত’ তিনটি উদ্দেশ্যের যেকোনো একটির জন্য নকশা করা হয়েছে, সবগুলোই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সম্পর্কিত।

এটি হতে পারে সেন্ট্রিফিউজ সংযোজন কেন্দ্র, সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র, অথবা ইউরেনিয়াম ধাতু রূপান্তরের মতো অন্যান্য ‘পারমাণবিক অস্ত্র সংশ্লিষ্ট’ কাজের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল। প্রতিবেদনে সিএসআইএস বিশ্লেষকরা যুক্তি দিয়েছেন, স্থাপনাটির নির্মাণকাজ সক্রিয় খনন থেকে সম্ভবত অভ্যন্তরীণ নির্মাণ ও বাহ্যিক অংশ মজবুতকরণের দিকে সরে গেছে। ২০২৬ সালে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সড়ক কর্মকাণ্ড দেখা গেছে এবং অতিরিক্ত কাজের মধ্যে রয়েছে (টানেল) প্রবেশপথগুলো উঁচু করা ও মজবুত করা, অভ্যন্তরীণ সড়ক নেটওয়ার্ক পাকা করা, প্রবেশ এলাকাগুলোর চারপাশ সুরক্ষিত করা এবং টানেল নির্মাণের সময় খনন করা মাটি সমতল করা ও অপসারণ।

সিএসআইএস বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে তারা যে নিরবচ্ছিন্ন নির্মাণকাজ পর্যবেক্ষণ করেছেন, অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে মিলিয়ে তা ইঙ্গিত দেয় যে স্থাপনাটি এখনও সমৃদ্ধকরণ কাজের জন্য প্রস্তুত নয়, যদি সেটিই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে।


সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে
  বিষয়:   পাথর  পরমাণু  স্থাপনা 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: