ইরানের ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র শিয়া গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র জমা দিয়ে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছেন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি। তবে শক্তিশালী এসব মিলিশিয়ার বিরোধিতার কারণে তার এই উদ্যোগ বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে বৈঠকের পর জাইদি প্রতিশ্রুতি দেন, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইরানের ঘনিষ্ঠ শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্র করা হবে।
৩০ সেপ্টেম্বরই ইরাক থেকে অবশিষ্ট মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোটের সেনা প্রত্যাহারের নির্ধারিত তারিখ। কিন্তু ইরানে ঘনিষ্ঠ এসব মিলিশিয়া জাইদির আহ্বানে সাড়া দিতে রাজি না হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।
কেন বাধার মুখে প্রধানমন্ত্রী?
ইরাকে ইরানের প্রভাব বহু বছর ধরে শক্তিশালী। দেশটির শিয়া রাজনৈতিক নেতা ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে তেহরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এসব গোষ্ঠীর অনেকগুলোই ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে।
২০২৫ সালে কয়েকটি শক্তিশালী ইরানপন্থী মিলিশিয়া প্রথমবারের মতো অস্ত্র জমা দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত আরও বাড়তে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেই তারা এই অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি।
গত মে মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর জাইদির সামনে এখন এসব গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণে আনার কঠিন দায়িত্ব পড়েছে।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তিনি উল্লেখযোগ্য সমর্থন পাচ্ছেন, অন্যদিকে ইরানের সমর্থনও তার প্রয়োজন। কারণ ইরাকের রাজনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ইরানের প্রভাব অনেক বেশি। ফলে প্রধানমন্ত্রীকে অত্যন্ত সতর্কভাবে পরিস্থিতি সামলাতে হচ্ছে।
মিলিশিয়া নেতাদের গ্রেফতার ঘিরে উত্তেজনা
গত ১৭ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নিয়ন্ত্রণাধীন বিশেষ বাহিনী ইরানঘনিষ্ঠ হারাকাত আল-নুজাবা গোষ্ঠীর গোয়েন্দাপ্রধানকে গ্রেফতার করে।
রয়টার্সের হাতে থাকা একটি নিরাপত্তা নথি ও তিনজন সরকারি কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন স্বার্থে ড্রোন হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে আটক করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র হারাকাত আল-নুজাবাকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
তাকে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা আটকে রাখার পর গোষ্ঠীটির পক্ষ থেকে পাল্টা হামলার হুমকি দেওয়া হয়। পরে কয়েকজন প্রভাবশালী শিয়া রাজনীতিকের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
এর এক সপ্তাহ পর ইরাকি বিশেষ বাহিনী আরও চারজন মিলিশিয়া সদস্যকে গ্রেফতার করে। তাদের মধ্যে স্থানীয় একজন কমান্ডারও ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে মার্কিন স্বার্থে হামলা চালাতে সহযোগিতা করার অভিযোগ রয়েছে।
এই ঘটনাগুলোই দেখিয়ে দিচ্ছে, মিলিশিয়াদের নিরস্ত্র করার পথে প্রধানমন্ত্রীকে কতটা রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত বাধার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
মিলিশিয়ারা কী চায়?
ইরাকের অন্তত পাঁচটি ইরানঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠী সরকারের ৩০ সেপ্টেম্বরের সময়সীমা মেনে অস্ত্র জমা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন শিয়া রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সূত্রগুলো।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব গোষ্ঠীকে অস্ত্র জমা দেওয়ার পাশাপাশি নিজেদের সংগঠন বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীতে যোগ দিতে হবে।
তবে সবচেয়ে শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলোর একটি কাতায়েব হিজবুল্লাহ আগস্টে প্রধানমন্ত্রী জাইদির সমালোচনা করে। তারা সরকারের সঙ্গে আলোচনার জন্য কয়েকটি শর্তও দিয়েছে।
তাদের অন্যতম দাবি হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা যেন ভবিষ্যতে আর ইরাকে ফিরে আসতে না পারে। একই সঙ্গে ইরাকের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রভাব পুরোপুরি বন্ধ করার দাবিও জানিয়েছে গোষ্ঠীটি।
কতটা শক্তিশালী এসব মিলিশিয়া?
ইরাকের ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’ নামে একটি বড় জোটের অংশ। এতে প্রায় ১০টি কট্টরপন্থী শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে।
দুইজন নিরাপত্তা কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, এসব গোষ্ঠীর সম্মিলিত যোদ্ধার সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। তাদের হাতে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিমান প্রতিরোধী অস্ত্রসহ বড় ধরনের অস্ত্রভাণ্ডার রয়েছে।
ইরানের আঞ্চলিক মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নেটওয়ার্কে এই জোটকে গুরুত্বপূর্ণ একটি শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
গত কয়েক বছরে ইরাক ও সিরিয়ায় মার্কিন সেনা এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চালানো বহু ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দায়ও এই জোটের সদস্যরা স্বীকার করেছে।
সম্প্রতি এসব গোষ্ঠী আরও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্ভুল ড্রোন হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে।
শুধু সামরিক শক্তিই নয়, মিলিশিয়াগুলোর অর্থনৈতিক প্রভাবও রয়েছে। নির্মাণ, আবাসন ব্যবসা এবং মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ব্যবসায় তাদের স্বার্থ রয়েছে বলে জানিয়েছে নিরাপত্তা সূত্র।
সামনে বড় পরীক্ষা জাইদির
ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো— তিনি কি ইরানের ঘনিষ্ঠ এসব শক্তিশালী মিলিশিয়াকে সত্যিই অস্ত্র জমা দিতে বাধ্য করতে পারবেন?
একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা, অন্যদিকে ইরানের প্রভাব এবং দেশের অভ্যন্তরে শক্তিশালী মিলিশিয়াগুলোর চাপ সামলানো— দুই দিক থেকেই জাইদি কঠিন অবস্থার মধ্যে রয়েছেন।
শিয়া রাজনৈতিক নেতাদের একটি অংশ ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে, মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত কঠোর ব্যবস্থা নিলে ইরাকে নতুন করে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
ফলে ৩০ সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে মিলিশিয়াদের নিরস্ত্র করার উদ্যোগ সফল হবে কি না, সেটিই এখন ইরাকের রাজনীতি ও নিরাপত্তার অন্যতম বড় প্রশ্ন।
সূত্র : রয়টার্স
সময়ের আলো/ইউএমএইচ