মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ায় তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকায় তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। গত ২৪ জুলাইয়ের পর এই প্রথম প্রতীকী এই সীমা অতিক্রম করল তেলের দাম।
বুধবার সকাল ৭টা ২১ মিনিটে (জিএমটি) ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার্সের দাম ২ দশমিক ১৫ ডলার বা ২ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ দশমিক ০৭ ডলারে দাঁড়ায়। খবর রয়টার্স, আলজাজিরা ও সিএনএনের।
এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৭০ ডলার বা ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৪ দশমিক ৭৩ ডলারে ওঠে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে গোল্ডম্যান স্যাকস, ব্যাংক অব আমেরিকা ও এইচএসবিসিসহ ক্রমবর্ধমান-সংখ্যক ব্যাংক অপরিশোধিত তেলের দামের পূর্বাভাস বাড়িয়েছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একটি মার্কিন নৌযান আক্রান্ত হওয়ার পর তারা ওমান উপসাগর ও খারগ দ্বীপের কাছে ইরানের পাঁচটি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস করেছে।
ওমান উপসাগরে থাকা ইরানের চারটি তেলবাহী জাহাজ— এম/টি কাভিজ, এম/টি চারমিনার, এম/টি হরাইজন ১ ও এম/টি রিয়েস্কো এবং খারগ দ্বীপের কাছে থাকা এম/টি দারিয়ায় হামলা চালিয়ে সেগুলো ধ্বংসের কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)।
সেন্টকম জানায়, জাহাজগুলোতে হামলার আগে সেগুলোর ক্রুদের জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে হামলা চালিয়ে জাহাজগুলো অচল করে দেওয়া হয়। এর জবাবে আইআরজিসি জানিয়েছে, তাদের বাহিনী দুটি মার্কিন নৌযান ও আটটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলা চালিয়েছে। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালিতে ‘নিষিদ্ধ ও অনিরাপদ অঞ্চলের’ মধ্য দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করার অভিযোগে আরও ১০টি হামলা চালানো হয়েছে।
আইআরজিসি আরও জানিয়েছে, তারা জর্ডানে আল-আজরাক ঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। হামলায় মার্কিন যুদ্ধবিমান রাখার কয়েকটি হ্যাঙ্গার ধ্বংস হয়েছে বলেও দাবি করে তারা। আইআরজিসি আরও দাবি করে, মার্কিন নৌবাহিনীর ডিডিজি-১১৯ ও ডিডিজি-৫৩ ডেস্ট্রয়ারে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ‘বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে। পরে এক বিবৃতিতে তারা জানায়, অঞ্চলটিতে থাকা ‘দুটি মার্কিন জাহাজ ও আটটি ট্যাঙ্কার’ লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে এবং এতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
ইরানের এসব দাবির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনো মন্তব্য করেনি। জাহাজে হামলার আগে আইআরজিসি কুয়েত ও বাহরাইনের বন্দরে থাকা তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোতে হামলার হুমকি দিয়েছিল। একই সঙ্গে সেখানে থাকা ট্যাঙ্কারের ক্রুদের দ্রুত সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল তারা। জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরান থেকে ছোড়া ২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলা করেছে। এর মধ্যে ১৮টি সফলভাবে ভূপাতিত ও ধ্বংস করা হয়েছে। বাকি দুটি ক্ষেপণাস্ত্র জনবসতিহীন এলাকায় গিয়ে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, পরিস্থিতি ‘বেশ সরল’। কলম্বিয়া সফরের সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘ইরান বারবার মার্কিন নৌযানে হামলার চেষ্টা করছে। তারা যতবার এমন করবে বা চেষ্টা করবে, ততবারই তাদের ট্যাঙ্কার হারাতে হবে। আজও এর পুনরাবৃত্তি দেখতে পারেন।’
ইরান আরও পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। কুয়েত ও বাহরাইনের বন্দরের কাছে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ট্যাঙ্কারগুলোর ক্রুদেরও অবিলম্বে সরে যেতে বলেছে দেশটি। এর আগে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইরান। সেন্টকম জানিয়েছে, জাহাজটি হামলা এড়িয়ে যায় এবং কোনো মার্কিন সেনা আহত হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, হামলার শিকার পাঁচটি ট্যাঙ্কার ইরানের বহু বিলিয়ন ডলারের ‘ছায়া নেটওয়ার্কের’ অংশ। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আইআরজিসি ও ইরান-সমর্থিত আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন করা হয়। ইরানের প্রধান তেল রফতানি টার্মিনাল খারগ দ্বীপে অবস্থিত। দেশটির মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ এই টার্মিনালের মাধ্যমে রফতানি করা হয়।
এদিকে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথিরা সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনা ও বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, এতে ৭৩ জন আহত হয়েছেন। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তেল স্থাপনাগুলোতে আগুন ধরে যায় এবং কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
মঙ্গলবার ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে দেশটির নৌবাহিনী দাবি করে, হরমুজ প্রণালিতে তারা একটি মার্কিন চালকবিহীন সাবমেরিন জব্দ করেছে। সেন্টকমের মুখপাত্র মার্কিন নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেন, ‘এক দিনেরও বেশি সময় আগে মার্কিন বাহিনী পরিচালিত একটি পানির নিচের ড্রোনে ত্রুটি দেখা দেয়।’ চলমান সামরিক অভিযানের সহায়তায় আঞ্চলিক জলসীমা পর্যবেক্ষণে ড্রোনটি ব্যবহার করা হচ্ছিল। তিনি জানান, ত্রুটিপূর্ণ ড্রোনটি ছিল পুরোনো মডেলের। এতে কোনো সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা ছিল না। কোনো গোপন স্বর্ণ বা রাডার সরঞ্জামও ছিল না। তবে আঞ্চলিক জলসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে