যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব এবার আরও স্পষ্টভাবে পড়েছে জর্ডানে। দেশটির আল-আজরাক এলাকায় অবস্থিত মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এবং গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধবিমান ও সামরিক সরঞ্জাম থাকার কারণে ঘাঁটিটি ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের ইরানি তেলবাহী জাহাজে হামলার জবাব হিসেবে আল-আজরাক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। তবে জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া ২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৮টি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে। বাকি দুটি ক্ষেপণাস্ত্র জনবসতিহীন এলাকায় গিয়ে পড়েছে। সর্বশেষ হামলায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
কোথায় এই আল-আজরাক ঘাঁটি?
আল-আজরাক বিমানঘাঁটির সরকারি নাম মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটি। জর্ডানের রাজধানী আম্মান থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে, দেশটির অপেক্ষাকৃত জনবিরল মরুভূমি অঞ্চলে এর অবস্থান।
জর্ডানের যুদ্ধবিমান চালক লেফটেন্যান্ট মুওয়াফফাক সালতির নামে ঘাঁটির নামকরণ করা হয়। ১৯৬৬ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে তিনি নিহত হন।
ঘাঁটিতে দুটি রানওয়ে রয়েছে। সামরিক পরিবহন থেকে শুরু করে উন্নত যুদ্ধবিমান পরিচালনার জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এফ-৩৫, এফ-১৬ ও এফ-২২-এর মতো যুদ্ধবিমান পরিচালনা ও সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে এই ঘাঁটির। বড় আকারের সামরিক পরিবহন বিমানও এখান থেকে ওঠানামা করে।
কেন ইরানের লক্ষ্য আল-আজরাক?
ঘাঁটিটিকে ইরানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও জর্ডানের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়। এর আওতায় জর্ডানের ১২টি সামরিক স্থাপনা ব্যবহারের সুযোগ পায় যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন কংগ্রেসের গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, জর্ডানে প্রায় ৪ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছেন। তাদের একটি অংশ আল-আজরাক ঘাঁটিতেও মোতায়েন রয়েছে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সরাসরি সংঘাত শুরু হওয়ার পর ঘাঁটিটি স্বাভাবিকভাবেই ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় চলে আসে।
যুদ্ধবিমান ও সামরিক সরঞ্জামের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র
লন্ডনের কিংস কলেজের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষক তাহানি মুস্তাফার মতে, আল-আজরাক এমন একটি ঘাঁটি যেখানে এফ-৩৫, এফ-১৬ ও এফ-২২-এর মতো উন্নত যুদ্ধবিমান রাখার সুযোগ রয়েছে। যুদ্ধবিমান সংরক্ষণের পাশাপাশি সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও বিশেষ হ্যাঙ্গার রয়েছে সেখানে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরানের হামলার অন্যতম লক্ষ্য এসব যুদ্ধবিমান, হ্যাঙ্গার এবং সামরিক কমান্ড ও প্রস্তুতি কেন্দ্র।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ঘাঁটির গুরুত্ব সাম্প্রতিক সংঘাত শুরুর আগেই বেড়েছিল। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের গবেষক ডেভিড শেঙ্কারের মতে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগে আল-আজরাক যুক্তরাষ্ট্রের সি-১৭ সামরিক পরিবহন বিমানের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। তার দাবি, ওই সময় ঘাঁটিতে প্রায় ৬০টি সামরিক বিমানও ছিল।
জর্ডানের ভৌগোলিক অবস্থান কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে জর্ডানের সবচেয়ে বড় সুবিধা তার ভৌগোলিক অবস্থান। ইরানের কাছাকাছি উপসাগরীয় দেশগুলোর তুলনায় জর্ডান কিছুটা দূরে হওয়ায় সেখানে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানের সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, জর্ডান যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ‘কৌশলগত নিরাপদ দূরত্ব’ দেয়। একই সঙ্গে দেশটি থেকে সিরিয়া ও ইরাকের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করাও তুলনামূলক সহজ।
মার্কিন কংগ্রেসের গবেষণা সংস্থার ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, জর্ডানের বিমানঘাঁটিগুলো সিরিয়া ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ এবং সামরিক লক্ষ্য শনাক্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আগেও হামলার দাবি করেছে ইরান
চলমান সংঘাতের মধ্যে আল-আজরাক ঘাঁটিতে এর আগেও একাধিকবার হামলার দাবি করেছে ইরান। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির দাবি অনুযায়ী, মার্চ থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ১০ বারের বেশি ঘাঁটিটিতে হামলা চালানো হয়েছে।
জুনেও আল-আজরাকসহ কুয়েত ও বাহরাইনে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার দাবি করেছিল তেহরান। সে সময় ইরানের দাবি ছিল, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ঘাঁটির হ্যাঙ্গার ও কমান্ড সেন্টারসহ বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করা হয়েছিল।
তবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, এসব ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে এবং হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
জুলাইয়ের হামলায় নিহত হন মার্কিন সেনা
জুলাই মাসেও আল-আজরাক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছিল ইরান। তেহরানের দাবি ছিল, ওই হামলায় মার্কিন যুদ্ধবিমান ও জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান ধ্বংস করা হয়েছে।
পরে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, ওই হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত, একজন নিখোঁজ এবং চারজন আহত হন। আল-আজরাক ঘাঁটিতে ইরানের চালানো হামলাগুলোর মধ্যে সেটি ছিল অন্যতম গুরুতর ঘটনা।
সর্বশেষ হামলায় আইআরজিসি আল-আজরাক ঘাঁটিতে বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে। ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী, এফ-৩৫, এফ-১৬ ও এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের রক্ষণাবেক্ষণ, প্রস্তুতি ও মোতায়েনের স্থান এবং বিমান রাখার হ্যাঙ্গারগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, হামলাটি সফল হয়নি। জর্ডান ও যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বিত আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে বলে জানান তিনি।
চাপে জর্ডান
যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও সরাসরি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে জড়াতে চায় না জর্ডান। একদিকে দেশটি মার্কিন সেনাদের নিজেদের ভূখণ্ডে অবস্থানের অনুমতি দিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বজায় রেখেছে। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও এড়াতে চাইছে আম্মান।
এর আগে, ইরান থেকে জর্ডানের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হলে সেগুলো প্রতিহত করার চেষ্টা করেছে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ফলে জর্ডান এখন এক জটিল পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে, মিত্র যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করতে গিয়ে যেন ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের অংশ না হয়ে যায়, সেটিই দেশটির বড় চ্যালেঞ্জ।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ আল-আজরাক?
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির ক্ষেত্রে আল-আজরাক ঘাঁটির গুরুত্ব কয়েকটি কারণে।
উন্নত যুদ্ধবিমান রাখা, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের সুযোগ রয়েছে।
সামরিক পরিবহন বিমান ও সরবরাহ কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়।
যুদ্ধের প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম ও রসদ সরবরাহে এটি গুরুত্বপূর্ণ।
সিরিয়া ও ইরাকের ওপর নজরদারি চালানো সহজ।
ইরানের কাছাকাছি উপসাগরীয় ঘাঁটিগুলোর তুলনায় তুলনামূলক নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করছে।
এই কারণেই আল-আজরাক যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বিমান পরিচালনা কেন্দ্র। একই কারণে ইরানের কাছেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তু।
ইরানের হামলা অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ ও সামরিক স্থাপনাকেও জড়িয়ে ফেলতে পারে, এমন আশঙ্কা বাড়ছে। আর সেই সম্ভাব্য সংঘাতের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে জর্ডান।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ