বাংলা গানের ভুবনে কিছু কণ্ঠ থাকে যা কেবল কানে আরাম দেয় না, সরাসরি ছুঁয়ে যায় হৃদয়ের গভীরতম কোণ। সেই মায়াবী ও পরিশীলিত কণ্ঠস্বরগুলোর অন্যতম একটি নাম ফাহমিদা নবী। বিগত চার দশক ধরে তিনি নিজের মার্জিত গায়কি, স্নিগ্ধ সুর আর অনন্য ব্যক্তিত্ব দিয়ে বাংলা গানকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন। সস্তা জনপ্রিয়তার জোয়ারে গা না ভাসিয়ে শুদ্ধ সংগীতের যে ধারা তিনি বজায় রেখেছেন, তা তাকে করে তুলেছে অনন্য।
সুরের উত্তরাধিকার ও পারিবারিক আবহ
ফাহমিদা নবীর সংগীতে আসাটা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল তার রক্তে। তিনি বাংলা সংগীতজগতের কিংবদন্তি পুরুষ, অমর শিল্পী মাহমুদুন নবীর সুযোগ্য কন্যা। ঘরের ভেতরেই ছিল সুরের এক মহাসমুদ্র। বাবা ছিলেন তার প্রথম শিক্ষক ও অনুপ্রেরণা। শুধু ফাহমিদা নবীই নন, তার বোন সামিনা চৌধুরী এবং ভাই রিদওয়ান নবী পঞ্চমও দেশের সংগীতজগতের সুপরিচিত মুখ। আরেক বোন তানজিদা নবী গানে নিয়মিত না হলেও চর্চা রয়েছে তারও। পারিবারিক এই সাংগীতিক পরিবেশ ফাহমিদা নবীর সুরের ভিতকে করে তুলেছে অত্যন্ত মজবুত ও ধ্রুপদি।
সংগীতকে নিজের জীবনের ধ্রুবতারা মনে করেন ফাহমিদা নবী। সুরের প্রতি নিজের এই চিরন্তন ভালোবাসাকে তিনি ব্যক্ত করলেন অনেকটা এভাবে— সুরের এই পথটাই আমার জীবনের আসল ঠিকানা। গানকে আমি কখনো স্রেফ পেশা হিসেবে দেখিনি, এটি আমার কাছে এক পরম সাধনা। সস্তা ক্যারিয়ার গড়ার মোহে নয়, আমি কণ্ঠ ছাড়ি নিজের আত্মার তৃপ্তির জন্য; সুরহীন জীবন আমার কাছে এক বড় শূন্যতা। শৈশবে বাবা মাহমুদুন নবীর হাত ধরে সুরের যে পাঠ শুরু হয়েছিল, সেই বাবার আদর্শ আর অনুপ্রেরণাই আজীবন আমার পথচলার আলো।
গায়কির নিজস্ব ভুবন— মেলোডির রাজকন্যা
১৯৭৯ সালে পেশাদার সংগীতজীবনে পা রাখার পর থেকেই ফাহমিদা নবী নিজের জন্য একটি আলাদা পথ তৈরি করে নেন। তার গায়কির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো— অতিরিক্ত চড়া সুরের পরিবর্তে এক ধরনের মায়াবী মন্থরতা ও মেলোডির মেলবন্ধন। ধ্রুপদি ও আধুনিক সংগীতের এক চমৎকার মিশেল পাওয়া যায় তার কণ্ঠে। গান গাওয়ার সময় শব্দের উচ্চারণ এবং আবেগের পরিমিত প্রকাশ তাকে শ্রোতাদের কাছে ‘মেলোডির রাজকন্যা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
নিজের এই গায়কির আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে ফাহমিদা নবী বলেন, ‘মেলোডি সুরের আবেদন চিরকালই ছিল। যখনই কোনো গান গাই, তখন মেলোডিকেই প্রাধান্য দিই। আমি মনে করি, গান শুধু গলার খেলা নয়, মনেরও খেলা। গানের কথা যদি নিজে অনুভব করতে না পারি তবে তাতে আবেগের সংকট থাকবেই। আর সেটি হলে গলা যত মিষ্টিই হোক না কেন, গান কিন্তু শ্রোতার মনে পৌঁছাবে না। এ কারণে আমি যখন গাই, সেই কথার ভেতর ডুবে যাই। কথা আর সুরে নিজেকে যখন ডুবিয়ে দিতে পারি তখনই বুঝি গানটা আমি আমার মতো করে গাইতে পারব।’
চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক, আধুনিক গান রবীন্দ্র ও নজরুল— সবখানেই ফাহমিদা নবী তার নিজস্বতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তার কণ্ঠে— লুকোচুরি লুকোচুরি গল্প, মেঘলা মন, তুমি কি সেই তুমি, আকাশ খুলে বসে আছি, আমি আকাশ হব, যায় কি ছেঁড়া বুকের পাঁজর, ইচ্ছে করে, ভুল করে ভালোবেসেছি, এক মুঠো গান, দুপুরের একলা পাখি, চারটা দেয়াল হঠাৎ খেয়াল, একটা নদীর গল্প, আকাশ ও সমুদ্র ওপারে, মনে কি পড়ে না, তুমি অভিমানে, মনচুরি, ভালোবাসা এমনই বুঝি, তুমি কি বলো আসবেসহ আরও অনেক গান দারুণভাবে শ্রোতাদের কাছে প্রশংসিত ও জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
এর পাশাপাশি তিনি বেশ কিছু একক ও মিশ্র অ্যালবাম উপহার দিয়েছেন, যা শুদ্ধ সংগীতের শ্রোতাদের সংগ্রহে রাখার মতো। তার উল্লেখযোগ্য অ্যালবাম— এক মুঠো গান, এক মুঠো গান-২, দুপুরের একলা পাখি, তুমি কি সেই তুমি, মনে কি পড়ে না, চারটা দেয়াল হঠাৎ খেয়াল, তবু বৃষ্টি চাই, ইচ্ছে হয়, আমারে ছুঁয়েছিলে (নজরুলগীতি), তুমি অভিমানে প্রভৃতি। ২০০৭ সালে ‘আহা!’ চলচ্চিত্রের লুকোচুরি লুকোচুরি গল্প গানটির জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।
নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের মেন্টর
ফাহমিদা নবী কেবল নিজেই গান গেয়ে ক্ষান্ত হননি, দেশের সংগীতাঙ্গনে নতুন সুরের সন্ধানেও কাজ করেছেন। বাংলাদেশের জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ক্লোজআপ ওয়ানসহ একাধিক সংগীত প্রতিযোগিতায় তিনি বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন। সেখানে তার গঠনমূলক সমালোচনা, স্নেহশীল আচরণ এবং প্রতিযোগীদের সঠিক গাইডলাইন দেওয়ার পদ্ধতি অত্যন্ত প্রশংসিত হয়েছিল। তরুণ প্রজন্মের শিল্পীদের কাছে তিনি একজন আদর্শ অভিভাবক ও মেন্টর।
তারই ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক সংগীত প্রতিযোগিতা ‘ইউরোভিশন সং কনটেস্ট এশিয়া ২০২৬-এ বাংলাদেশের প্রতিনিধি নির্বাচনের লক্ষ্যে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বঙ্গ আয়োজিত ‘ভয়েস অব বাংলাদেশ’ প্রতিযোগিতায় বিচারকের দায়িত্ব পালন করছেন ফাহমিদা নবী। এই শিল্পীর পাশাপাশি হামিন আহমেদ, বাপ্পা মজুমদার, শওকত আলী ইমন ও আঁখি আলমগীরও রয়েছেন বিচারকদের তালিকায়।
গান-সুরের ব্যস্ততায়
বর্তমানে নিজের বেশ কিছু নতুন একক গান প্রকাশের কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি। এই ব্যস্ততার মধ্যে আলোচিত ব্যাপার হলো— একসঙ্গে ৬টি নতুন মৌলিক গান নিয়ে শ্রোতাদের সামনে হাজির হতে যাচ্ছেন তিনি। এটি ছয় গানের একটি ভিডিও অ্যালবাম। এর মধ্যে তিনটি গানের সুর করেছেন শামস সুমন এবং বাকি তিনটি গানের সুর করেছেন লাবু রহমান, তমাল ও সজীব দাস। ছয়টি গানই লিখেছেন গোলাম মোর্শেদ। গানগুলোর শিরোনাম হলো— দুঃখের দলিল, ইচ্ছে করে, আসলো না বৃষ্টি, উড়ি, হারালে কখন ও ভালোবাসা চাইতে গেলে। প্রযোজনা সংস্থা গান জানালার ইউটিউব চ্যানেল থেকে মুক্ত হবে গানগুলো। এগুলোর ভিডিও নির্মাণ করেছেন আশিক রহমান এবং ভাবনা ও পরিকল্পনায় ছিলেন ফাহমিদা নবী নিজেই। এরই মধ্যে মিউজিক ভিডিওগুলোর শুটিংয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
এদিকে গত মাসে সংগীত সফরে আমেরিকায় গেছেন ফাহমিদা নবী। সেখানে এরই মধ্যে অংশ নিয়েছেন বেশ কিছু অনুষ্ঠানে, আরও কিছু অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবেন তিনি।
সুর-কথায় নিমগ্ন শিল্পী
চলতি ধারার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে অনেকেই যখন সস্তা বা ফিউশন মিউজিকের দিকে ঝুঁকছেন, ফাহমিদা নবী তখনও সুরের ক্লাসিক রূপটিকেই আঁকড়ে ধরে আছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, গানের প্রাণ লুকিয়ে থাকে তার কথায় ও মেলোডিতে। আজকের দিনেও যখন তার কণ্ঠে কোনো নতুন গান আসে, শ্রোতারা থমকে দাঁড়ায় সেই চিরচেনা স্নিগ্ধতার খোঁজে। বাংলা গানের স্বর্ণালি যুগের ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে সুরের সাধনায় নিমগ্ন শিল্পী ফাহমিদা নবী আজও আমাদের সুরের মায়ায় জড়িয়ে রেখেছেন এবং ভবিষ্যতেও তার এই সুরের যাত্রা বাংলা গানকে সমৃদ্ধ
করে যাবে সময়কাল উত্তীর্ণ করে সেটিই শুদ্ধ সংগীতপ্রিয়দের আশা।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও