পদ্মা ব্যারেজ বাংলাদেশের একটি মাস্টারমাইন্ড প্রকল্প এবং তা বাস্তবায়ন হলে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে মন্তব্য করেছেন পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। একইসঙ্গে এর মাধ্যমে ২৪ জেলার অর্থনৈতিক রূপান্তরের পাশাপাশি কৃষিতে বিপ্লব, বিদ্যুৎ উৎপাদন, মাছ চাষ ও ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার হাবাসপুরে প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের স্থান পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন পানিসম্পদ মন্ত্রী।
শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, এই ব্যারেজের স্বপ্ন দীর্ঘদিনের। দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের মানুষসহ বাংলাদেশের ২৪ জেলার প্রায় ৭ কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন এটি। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই আমরা এখানে এসেছি।
তিনি বলেন, পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের চিত্র পাল্টে যাবে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর ও অর্থনৈতিক বিপ্লবের জন্য এ প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২৪ জেলার অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটবে। একই সঙ্গে কৃষিতে বিপ্লব, বিদ্যুৎ উৎপাদন, মাছ চাষ ও ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে।
মন্ত্রী বলেন, এটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর একটি প্রকল্প। ২০০৪ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সময় প্রকল্পটির কারিগরি সমীক্ষার কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়। ২০২৬ সালে এসে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য একনেকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জনগণের কাছে পদ্মা ব্যারেজ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। নির্বাচনী ইশতেহারেও বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। এখন প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট এলাকার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানান মন্ত্রী।
পদ্মা ব্যারেজের উদ্বোধন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, খুব শিগগিরই, সম্ভবত আগামী বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি অথবা মার্চ মাসের যেকোনো একসময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পাংশার হাবাসপুরে এসে পদ্মা ব্যারেজের শুভ উদ্বোধন করবেন।
মন্ত্রী আরও বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচিকে গুরুত্ব দিয়ে আগামী দিনে দেশে ব্যাপকভাবে খাল খনন ও পুনঃখনন করা হবে। ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের মাধ্যমে এ কর্মসূচিকে আন্দোলন ও বিপ্লবে পরিণত করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে মানুষের মুখে নতুন করে হাসি ফোটানো এবং স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
তিনি বলেন, পদ্মা ব্যারেজসহ এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হবে এবং একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।
পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী ও পদ্মা ব্যারেজ-দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন জাতীয় কমিটির সভাপতি আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, রাজবাড়ী-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. হারুন অর রশিদ, পানি সম্পদ সচিব ড. এ কে এম শাহাবুদ্দিন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক রুহুল আমীন, পদ্মা ব্যারেজ (প্রথম পর্যায়) প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ, ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল হামিদ, রাজবাড়ী জেলা পরিষদের প্রশাসক আব্দুস সালাম মিয়াসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, জেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, পদ্মা (গঙ্গা) ব্যারেজ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য বর্ষাকালে পদ্মা নদীর পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে তা নিয়ন্ত্রিতভাবে সরবরাহ করা। প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে পাংশার হাবাসপুর এলাকায় প্রায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় গত ১৩ মে পদ্মা ব্যারেজ (প্রথম পর্যায়) নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা।
প্রকল্পের আওতায় ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডারস্লুইস, দুটি ফিশ পাস, নৌ-লক, গাইড বাঁধ ও অ্যাপ্রোচ বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া গড়াই, চন্দনা ও হিসনা নদীর অফটেক স্ট্রাকচার নির্মাণ, গড়াই-মধুমতি নদী ব্যবস্থার ১৩৫ দশমিক ৬০ কিলোমিটার ড্রেজিং, হিসনা নদী ব্যবস্থার ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার ড্রেনেজ চ্যানেল পুনঃখনন এবং ১৮০ কিলোমিটার অ্যাফ্লাক্স বাঁধ নির্মাণ করা হবে।
প্রকল্পের আওতায় মোট ১১৩ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার দুটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণেরও পরিকল্পনা রয়েছে।
সময়ের আলো/এনএন