ঘোর অন্ধকারে জ্যোতি

মেহেদী হাসান

খেলা

একটা সময় ভারতকে হারিয়ে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় সাফল্য লিখেছিল। সালমা খাতুন, জাহানারা আলমদের হাত ধরে এসেছিল এশিয়া কাপের

2026-09-12T02:43:53+00:00
2026-09-12T02:43:53+00:00
 
  শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৮ ভাদ্র ১৪৩৩
শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
খেলা
ঘোর অন্ধকারে জ্যোতি
মেহেদী হাসান
প্রকাশ: শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:৪৩ এএম 
অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি। ছবি : সংগৃহীত
একটা সময় ভারতকে হারিয়ে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় সাফল্য লিখেছিল। সালমা খাতুন, জাহানারা আলমদের হাত ধরে এসেছিল এশিয়া কাপের শিরোপা। তখন ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ মানেই ছিল লড়াই, উত্তেজনা আর শেষ বল পর্যন্ত জয়ের আশা। সময় বদলেছে, দল বদলেছে, নেতৃত্ব বদলেছে। কিন্তু বদলায়নি বাংলাদেশের প্রত্যাশা। বরং সুযোগ-সুবিধা, অবকাঠামো আর আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে প্রত্যাশার চাপও বেড়েছে। অথচ সেই প্রত্যাশার জায়গা থেকেই এখন প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট আসলে এগোচ্ছে কতটা? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এসে ঠেকছে অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতির সামনে।

এশিয়া কাপের সেমিফাইনালে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটিই যেন সেই প্রশ্নগুলোর নতুন করে জন্ম দিয়েছে। শুরুতে শক্তিশালী ভারতীয় ব্যাটিং লাইনআপকে চাপে ফেলেছিল বাংলাদেশের বোলাররা। তৈরি হয়েছিল ভারতকে ১৩০ থেকে ১৩৫ রানের মধ্যে আটকে রাখার সুযোগও। কিন্তু একের পর এক ক্যাচ মিস, একটি রানআউটের সুযোগ নষ্ট এবং পরে ব্যাটারদের ব্যর্থতায় ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়। শেষ পর্যন্ত ভারতের কাছে ৪০ রানের হার। এশিয়া কাপের ফাইনালে ওঠার স্বপ্নও থেমে গেল সেমিফাইনালেই।

ভারতের দেওয়া ১৫০ রানের লক্ষ্য তাড়ায় ২০ ওভারে ৭ উইকেটে ১০৯ রান করে বাংলাদেশ। অথচ সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারলে গল্পটা অন্যরকম হতে পারত। সবচেয়ে বড় আক্ষেপ শেফালি ভার্মার ক্যাচ। দ্বিতীয় ওভারেই লং অনে ক্যাচ দিয়েছিলেন ভারতের এই ওপেনার। জীবন পেয়ে শেষ পর্যন্ত ৬৪ রানের ম্যাচজয়ী ইনিংস খেলেন তিনি।

ম্যাচ শেষে সেই সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার হতাশা প্রকাশ করে জ্যোতি বলেন, ‘তারা সুযোগ দিয়েছিল, আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। শেফালি ভার্মার ক্যাচ নিতে পারলে পুরো দৃশ্য অন্যরকম হতে পারত। তবে যেভাবে মেয়েরা লড়াই করেছে, আমি খুশি।’

কিন্তু ক্যাচ মিসের আক্ষেপের চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে বাংলাদেশের ব্যাটিং। বোলাররা যখন ম্যাচে ফেরার রাস্তা তৈরি করেছেন, তখন ব্যাটাররা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি। রান তাড়ার চাপ সামলানোর বদলে একের পর এক উইকেট বিলিয়ে এসেছে বাংলাদেশ।

জ্যোতির ভাষায়, ‘আমরা ওদের ১৩০ রানের মধ্যে আটকে রাখার কথা ভেবেছিলাম। গত কয়েক ম্যাচে যেভাবে বোলিং-ফিল্ডিং করেছি, তবে সেটা হয়নি। আমরা উইকেটও বিলিয়ে এসেছি। এতে রান তাড়া কঠিন হয়ে যায়।’

আর এখানেই বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের সবচেয়ে পুরোনো সমস্যাটি আবারও সামনে এসেছে। ধারাবাহিক ব্যাটিং নেই। একজন রান করলে পরের ম্যাচে তাকেই পাওয়া যাচ্ছে না। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে চাপ সামলাতে গিয়ে ব্যাটিং ভেঙে পড়ছে। এবারের এশিয়া কাপেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, দলের অধিনায়ক নিজেই যখন ব্যাট হাতে ধারাবাহিক নন, তখন দলের কাছ থেকে কতটা নেতৃত্ব আশা করা যায়। এই আসরে জ্যোতির চার ম্যাচের রান যথাক্রমে ১০, ৪, ২৩ ও ১৯। অধিনায়ক হিসেবে মাঠের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি ব্যাট হাতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্বও তার। কিন্তু সেখানেই বারবার ব্যর্থতা দেখা যাচ্ছে।

জ্যোতি নিজেও সমস্যাটিকে অস্বীকার করেননি, ‘এটা দীর্ঘদিন ধরেই আমাদের বড় এক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত দুই ম্যাচে যারা রান করেছে, এবার তারা রান পায়নি। রানের এই অধারাবাহিকতাই আমাদের ভোগাচ্ছে।’

সমস্যাটি অবশ্য শুধু একটি ম্যাচ কিংবা একটি টুর্নামেন্টের নয়। ঘরের মাঠে এশিয়া কাপে সেমিফাইনালেই উঠতে পারেনি বাংলাদেশ। বিদেশের মাটিতে দুবার সেমিফাইনালে গিয়ে থেমেছে পথচলা। এবারও নকআউটের মঞ্চে ভারতের কাছে হার। অর্থাৎ বড় ম্যাচে নিজেদের সেরা ক্রিকেটটা খেলতে না পারার পুরোনো রোগ এখনও সারেনি।

২০১৮ সালে ভারতকে হারিয়েই এশিয়া কাপের শিরোপা জিতেছিল বাংলাদেশ। সেই দলের সালমা, জাহানারারা ভারতের বিপক্ষে লড়াই করার মানসিকতা তৈরি করেছিলেন। এখন সেই স্মৃতিই যেন বর্তমান দলের জন্য চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ প্রত্যাশা বেড়েছে, কিন্তু পারফরম্যান্স সেই অনুপাতে এগোয়নি।

প্রশ্ন উঠছে কোচিং নিয়েও। জাতীয় দলের কোচের পদ কোনো ‘অলংকারিক সম্মান’-এর দায়িত্ব নয়। একটি দলকে গড়ে তুলতে, তার দুর্বলতা চিহ্নিত করতে এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য প্রস্তুত করতে প্রয়োজন অভিজ্ঞতা ও আধুনিক পরিকল্পনা। দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ থেকে তাই নারী দলে একজন বিদেশি, হাই-প্রোফাইল কোচ নিয়োগের প্রয়োজনীয়তাও সামনে আসছে। উন্নয়নের পরিকল্পনায় বিসিবি বিষয়টিকে কতটা গুরুত্ব দেয়, সেটিই এখন দেখার।

দলের বর্তমান অবস্থা নিয়ে সাবেক এক নারী ক্রিকেটারের কথাতেও ফুটে উঠেছে হতাশা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘এই দলটা যেমন পারফরম্যান্স করছে, তাতে সামনের দিনগুলোতে খুব বেশি কিছু আশা করতে পারছি না। বিশেষ করে দলের অধিনায়কই যখন ম্যাচের পর ম্যাচ পারফরম্যান্সহীন, তখন বাকিদের থেকে বেশি কিছু আশা করাও কঠিন।’

‘আমার মনে হয়, বিসিবির এখনই সময়, নেতৃত্বের সঙ্গে কোচিং প্যানেল নিয়েও ভাবা’— যোগ করেন তিনি। ভারতের কাছে এই হার শুধুই আরেকটি সেমিফাইনাল হার নয়। এটি বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের পুরোনো সমস্যাগুলোকে আবারও আয়নার সামনে দাঁড় করিয়েছে। বোলাররা লড়াইয়ের মঞ্চ তৈরি করেছেন, ফিল্ডাররা সেই সুযোগ নষ্ট করেছেন, ব্যাটাররা পারেননি ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত টেনে নিতে। আর মাঝখানে অধিনায়ক জ্যোতির পারফরম্যান্সও পারেনি দলকে সেই বাড়তি আত্মবিশ্বাস দিতে।

সুন্দর সুন্দর কথা দিয়ে ক্রিকেট হয় না। দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্বে থাকা, বারবার বড় মঞ্চে সুযোগ পাওয়া, সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো, উন্নয়নের কথা বলা, সবকিছুর শেষ হিসাবটা হয় মাঠে। সেখানে জয়-পরাজয়ের পাশাপাশি দেখা হয় দল কতটা উন্নতি করেছে, কোথায় দাঁড়িয়ে আছে এবং সামনে যাওয়ার পথটা কতটা পরিষ্কার।

বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট এখন সেই কঠিন হিসাবের মুখে। আর সেই হিসাবের সবচেয়ে বড় উত্তরদাতা হয়ে দাঁড়িয়েছেন নিগার সুলতানা জ্যোতি। অধিনায়ক হিসেবে সামনে থেকে দলকে ঘুরে দাঁড় করাতে না পারলে প্রশ্ন আরও বড় হবে। ভারতের কাছে ৪০ রানের এই হার তাই হয়তো একটি ম্যাচের সমাপ্তি, কিন্তু জ্যোতির জন্য শুরু হতে পারে আরও কঠিন এক পরীক্ষার। কারণ এ মুহূর্তে শুধু এশিয়া কাপ নয়, জ্যোতির সামনেই যেন ঘোর অন্ধকার।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও
  বিষয়:   ঘোর অন্ধকার  জ্যোতি  ভারত  বাংলাদেশ  নারী ক্রিকেট 


Advertisement
Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: