একজন ব্যাটসম্যান ১১ মাস প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলেননি। মাত্র ১০ দিন আগেও ছিলেন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ব্যস্ততায়। সেখান থেকে হঠাৎ সাদা পোশাকে, বিদেশের মাটিতে, ডিউক বলের বিপক্ষে টেস্ট খেলতে নেমে গেলেন। ফল—দুই ইনিংসেই শূন্য।
ব্যর্থতার পর তাই প্রশ্নটা শুধু সাইম আইয়ুবকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটা আরও বড়—পাকিস্তান কি টেস্ট ক্রিকেটের প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও কাঠামোকেই গুরুত্ব দিচ্ছে?
ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক নাসের হুসেইনের চোখে উত্তরটা খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। সাইমকে টেস্ট দলে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে তিনি সরাসরি টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি ‘অসম্মান ও অবহেলা’ হিসেবে দেখছেন। আর পাকিস্তানের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড দেখলে তাঁর এমন মন্তব্যকে খুব একটা অমূলকও মনে হচ্ছে না।
টি-টোয়েন্টি থেকে সরাসরি টেস্ট—সাইমকে কেন?
ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগে জ্যামাইকা কিংসম্যানের হয়ে সাইম আইয়ুব ছিলেন ছন্দে। তিন ম্যাচের একটিতে পেয়েছিলেন সেঞ্চুরিও। কিন্তু টি-টোয়েন্টির সেই ছন্দ ধরে রেখেই কি তাকে টেস্ট ক্রিকেটে নামিয়ে দেওয়া যায়?
নাসের হুসেইনের আপত্তি ঠিক এখানেই।
স্কাই স্পোর্টসকে তিনি বলেছেন, সাইম গত ১১ মাসে কোনো প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেননি। অথচ মাত্র ১০ দিন আগেও তিনি খেলছিলেন সিপিএলে। সেখান থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্করণের ক্রিকেটে, বিদেশের কন্ডিশনে, ডিউক বলের বিপক্ষে তাকে নামানোর সিদ্ধান্ত নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন নাসের।
কারণ টেস্ট ক্রিকেট শুধু ব্যাটিং-বোলিংয়ের আরেকটি সংস্করণ নয়। এখানে মানসিক প্রস্তুতি, দীর্ঘ সময় মাঠে থাকা, কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, বলের গতিবিধি বোঝা—সবকিছুর আলাদা প্রস্তুতি লাগে। বিশেষ করে ইংল্যান্ডের কন্ডিশনে নতুন বলে ব্যাটিংয়ের জন্য প্রস্তুতি আরও কঠিন।
সাইমের দুই ইনিংসে শূন্য তাই শুধু একজন ব্যাটসম্যানের ব্যর্থতার গল্প নয়; এটি হতে পারে একটি ভুল প্রস্তুতি ও ভুল পরিকল্পনার প্রতিচ্ছবি।
মাঠে নামার আগেই কি হারিয়ে যায় আস্থা?
পাকিস্তানের সমস্যা অবশ্য সাইমে আটকে নেই। বরং সিরিজের মাঝপথে দলের যে চেহারা বদলে দেওয়া হয়েছে, সেটিই হয়তো আরও বড় সংকেত।
লর্ডস টেস্টের পর একসঙ্গে সাত ক্রিকেটারকে দল থেকে বাদ দিয়ে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের জায়গায় নতুন সাতজনকে দলে নেওয়া হয়েছে, যাদের পাঁচজনই টেস্ট অভিষেকের অপেক্ষায় ছিলেন। কোচিং স্টাফেও এসেছে বড় পরিবর্তন—প্রধান কোচ সরফরাজ আহমেদ ও বোলিং কোচ উমর গুলকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
একটি টেস্ট সিরিজ চলার সময়ই যদি এত বড় পরিবর্তন আসে, তাহলে ড্রেসিংরুমের ভেতরে কী বার্তা যায়?
নাসের হুসেইনের মতে, সেটিই পাকিস্তানের বড় সমস্যা। তার চোখে, একসঙ্গে সাতজন ক্রিকেটারকে মাঝ সিরিজে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়ার অর্থ শুধু সাতটি জায়গা খালি করা নয়; এতে দলের ভেতরের আস্থা ও মৌলিক মূল্যবোধও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
‘আমি কেন দলের জন্য খেলব?’
নাসেরের কথার সবচেয়ে ধারালো অংশ সম্ভবত এখানেই।
একজন ক্রিকেটার যখন দেখেন, তার সতীর্থ কিংবা রুমমেটকে মাঝ সিরিজেই বাদ দিয়ে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এমনকি আগের ম্যাচে পাঁচ উইকেট নেওয়া বোলারও পরের ম্যাচে জায়গা হারাচ্ছেন, তখন তাঁর নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
তখন দল হয়ে খেলার বদলে প্রত্যেকে নিজের জায়গা বাঁচানোর চিন্তায় ব্যস্ত হয়ে পড়তে পারেন।
নাসেরের ভাষায়, খেলোয়াড়েরা এমনও ভাবতে পারেন—দল যখন আমার সতীর্থদেরই গুরুত্ব দিচ্ছে না, তখন আমি কেন দলের জন্য খেলব? তখন নিজের পারফরম্যান্স ও জায়গা ধরে রাখাই হয়ে উঠতে পারে প্রধান লক্ষ্য।
টেস্ট ক্রিকেটে যেখানে ধৈর্য, পারস্পরিক আস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে এই মানসিকতা ভয়াবহ।
মাঠের স্কোরকার্ডও বলছে একই গল্প
পাকিস্তানের ব্যর্থতার সবচেয়ে নির্মম সাক্ষী অবশ্য স্কোরকার্ড।
এজবাস্টনে ইংল্যান্ড প্রথম ইনিংসে তুলেছে ৪৫৩ রান। পাকিস্তান জবাব দিতে নেমে গুটিয়ে গেছে মাত্র ১৩৩ রানে। দ্বিতীয় ইনিংসে দ্বিতীয় দিন শেষে তাদের সংগ্রহ ২ উইকেটে ৫২ রান। অর্থাৎ এখনো ২৬৮ রানে পিছিয়ে তারা।
তিন ম্যাচের সিরিজে এরই মধ্যে ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পাকিস্তান। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এখন পর্যন্ত সিরিজের কোনো ইনিংসেই ২০০ রানের গণ্ডি পেরোতে পারেনি তারা।
এমন পারফরম্যান্সের পর প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক—সমস্যা কি কেবল ব্যাটসম্যানদের ফর্মে, নাকি পুরো ব্যবস্থাপনাতেই?
ব্রডের প্রশ্নও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়
নাসেরের সঙ্গে একই অনুষ্ঠানে ছিলেন ইংল্যান্ডের সাবেক পেসার স্টুয়ার্ট ব্রড। সাইমকে নিয়ে তার প্রশ্ন আরও সরাসরি—দুই ইনিংসেই শূন্য করার পর কি তিনি আবার সুযোগ পাবেন?
ব্রডের মতে, সাইমকে ওপেনিংয়ে নামানোর সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল না।
অর্থাৎ একজন ক্রিকেটারকে এমন একটি জায়গায় নামানো হয়েছে, যেখানে তার প্রস্তুতি ও সাম্প্রতিক ক্রিকেট অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এরপর ব্যর্থতার দায়ও এসে পড়েছে তাঁর কাঁধে।
এখানেই পাকিস্তানের ক্রিকেট ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় অসংগতি চোখে পড়ে—সঠিক প্রস্তুতি ছাড়া খেলোয়াড়কে সুযোগ দেওয়া, এরপর সেই খেলোয়াড়কেই ব্যর্থতার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো।
সংকটটা তাহলে কোথায়?
পাকিস্তানের ক্রিকেটে প্রতিভার অভাব নেই। বিশ্বমানের পেসার, আগ্রাসী ব্যাটসম্যান কিংবা ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার সামর্থ্যসম্পন্ন ক্রিকেটার—সবই আছে। কিন্তু প্রতিভাকে একটি স্থিতিশীল টেস্ট দলে রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়াতেই যেন ঘাটতি।
একদিকে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ব্যস্ততা, অন্যদিকে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে পর্যাপ্ত প্রস্তুতির ঘাটতি। তার ওপর সিরিজ চলার সময় দলে ব্যাপক পরিবর্তন।
ফলে ক্রিকেটারদের সামনে শুধু প্রতিপক্ষের বোলার নয়, নিজের জায়গা নিয়েও লড়াই করতে হচ্ছে।
আর যে দল মাঠে নামার আগে নিজেদের মধ্যেই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তাদের কাছ থেকে পাঁচ দিন ধরে চলা টেস্ট ক্রিকেটে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স আশা করা কঠিন।
পাকিস্তানের জন্য সতর্কবার্তা
এজবাস্টনে পাকিস্তান হয়তো শেষ পর্যন্ত ইনিংস হার এড়াতে পারবে, হয়তো পারবে না। কিন্তু এই টেস্টের ফলের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে অন্য একটি প্রশ্ন—পাকিস্তান আসলে কোন পথে এগোচ্ছে?
সাইম আইয়ুবের দুই শূন্য সেই প্রশ্নটাকে সামনে এনেছে। সাত ক্রিকেটারের আকস্মিক বিদায় সেটিকে আরও বড় করেছে। আর মাঠের পারফরম্যান্স যেন প্রতিদিন সেই প্রশ্নেরই নতুন প্রমাণ দিচ্ছে।
নাসের হুসেইনের সমালোচনা তাই কেবল একজন ক্রিকেটারকে দলে নেওয়া নিয়ে নয়। তার কথার ভেতরে লুকিয়ে আছে পাকিস্তানের টেস্ট ক্রিকেটের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েই প্রশ্ন।
টেস্ট ক্রিকেটে রাতারাতি সাফল্য আসে না। দরকার প্রস্তুতি, ধারাবাহিকতা, আস্থা এবং একটি পরিষ্কার পরিকল্পনা।
পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি অনুপস্থিত মনে হচ্ছে—এই চারটিই।
সময়ের আলো/টিকে