শুরুতেই যেন জানান দিল উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ—নতুন মৌসুমেও গল্পের অভাব হবে না। ২০২৬-২৭ মৌসুমের লিগ পর্বের প্রথম সপ্তাহেই গোলের বন্যার সঙ্গে ফুটবল বিশ্ব দেখেছে একের পর এক ব্যক্তিগত ও দলীয় কীর্তি। কেউ ছুঁয়েছেন কিংবদন্তির রেকর্ড, কেউ গড়েছেন নতুন ইতিহাস, আবার কারও জন্য লেখা হয়েছে ক্যারিয়ারের প্রথম অধ্যায়।
পিএসজির বড় জয়, বায়ার্ন মিউনিখের গোলের মাইলফলক, বার্সেলোনার লামিন ইয়ামালের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স কিংবা ম্যানচেস্টার সিটির আর্লিং হালান্ডের গোলের ধারাবাহিকতা—সব মিলিয়ে প্রথম সপ্তাহেই চ্যাম্পিয়ন্স লিগ পেয়েছে একঝাঁক আলোচিত মুহূর্ত।
চলুন, সংখ্যার গল্পে দেখে নেওয়া যাক প্রথম সপ্তাহের উল্লেখযোগ্য কীর্তিগুলো।
২২—কিশোর ইয়ামালের নতুন রেকর্ড
চ্যাম্পিয়ন্স লিগে নিজের ১২তম গোল করেছেন লামিন ইয়ামাল। কিশোর বয়সে গোলের হিসাবে কিলিয়ান এমবাপের ১৩ গোলের খুব কাছাকাছি এখন বার্সেলোনার এই স্প্যানিশ তারকা।
তবে শুধু গোল নয়, গোলে অবদান রাখার হিসাবে ইতিমধ্যেই এমবাপেকে ছাড়িয়ে গেছেন ইয়ামাল। গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে কিশোর বয়সে তাঁর অবদান এখন ২২ গোলে—চ্যাম্পিয়ন্স লিগে যা নতুন রেকর্ড।
৫৯ ম্যাচে ৫৯ গোল—হালান্ডের অবিশ্বাস্য গতি
আর্লিং হালান্ড যেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগে গোল করার নতুন সংজ্ঞাই লিখছেন। ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে ৫৯ ম্যাচে তার গোলসংখ্যা এখন ৫৯।
অর্থাৎ ম্যাচপ্রতি একটি করে গোল। ন্যূনতম ২০ ম্যাচ খেলা ফুটবলারদের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে গোলের হারে এখন সবার ওপরে নরওয়ের এই স্ট্রাইকার।
এখানেই শেষ নয়। এফসি পোর্তোর বিপক্ষে গোল করে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে তার গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৬-এ। ক্লাবটির হয়ে ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্বের এই প্রতিযোগিতায় সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডে সার্জিও আগুয়েরোর পাশে বসেছেন হালান্ড।
৭১—রাউলের পাশে এমবাপে
রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে কিলিয়ান এমবাপে করেছেন নিজের ৭১তম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ গোল। সেই গোল তাকে নিয়ে গেছে রিয়াল কিংবদন্তি রাউল গঞ্জালেজের পাশে।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় এখন দুজনের গোল সমান—৭১। যৌথভাবে পঞ্চম স্থানে আছেন তারা।
এমবাপের বয়স ও বর্তমান গোলের গতি বিবেচনায় এই তালিকায় তার আরও ওপরে ওঠার সম্ভাবনাও যথেষ্ট।
আট ম্যাচে আট—কেইনের সামনে লেভানদোভস্কি
বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে হ্যারি কেইনের গোলের ধারাও থামছে না। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে টানা আট ম্যাচে গোল করেছেন ইংলিশ স্ট্রাইকার। এই সময়ে তাঁর মোট গোল ১০টি।
বায়ার্নের হয়ে টানা নয় ম্যাচে গোল করার রবার্ত লেভানদোভস্কির রেকর্ড ছোঁয়া থেকে এখন মাত্র এক ম্যাচ দূরে কেইন।
৩০—দেম্বেলের সামনে নতুন মাইলফলক
পিএসজির হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে নিজের ৩০তম গোল পেয়েছেন উসমান দেম্বেলে। এই গোলের মাধ্যমে ফরাসি ফুটবলারদের মধ্যে প্রতিযোগিতাটিতে গোলের হিসাবে দাভিদ ত্রেজেগেকে পেছনে ফেলেছেন তিনি।
ফরাসি গোলদাতাদের তালিকায় এখন আরও ওপরে ওঠার সুযোগ তার সামনে।
ভাইয়ের রেকর্ড, তবে সম্পূর্ণ বিপরীত
কিলিয়ান এমবাপে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ৯৯ ম্যাচ খেলেও কখনো লাল কার্ড দেখেননি। তার ভাই ইথান এমবাপে অবশ্য মাত্র তৃতীয় ম্যাচেই দেখে ফেলেছেন লাল কার্ড।
লিলের হয়ে রিয়াল বেতিসের বিপক্ষে এটি ছিল ইথানের ক্যারিয়ারের প্রথম লাল কার্ড। দুই ভাইয়ের চ্যাম্পিয়ন্স লিগের পথচলায় আপাতত এই পরিসংখ্যানটিই সবচেয়ে অদ্ভুত বৈপরীত্য।
৯০০ পেরিয়ে বায়ার্ন
চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ৯০০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করা দ্বিতীয় দল হয়েছে বায়ার্ন মিউনিখ। জার্মান ক্লাবটির গোলসংখ্যা এখন ৯০৪।
এই তালিকায় বায়ার্নের ওপরে শুধু রিয়াল মাদ্রিদ। স্প্যানিশ ক্লাবটির গোল ১১৩৯টি।
অভিষেকেই ইতিহাস সাবাহর
চ্যাম্পিয়ন্স লিগে নিজেদের অভিষেক ম্যাচেই একাদশে ১১টি ভিন্ন দেশের খেলোয়াড় নামিয়ে অনন্য রেকর্ড গড়েছে আজারবাইজানের ক্লাব সাবাহ।
প্রতিযোগিতাটির ইতিহাসে অভিষেক ম্যাচের একাদশে এত ভিন্ন দেশের খেলোয়াড় নামানোর প্রথম নজির এটি।
অভিষেকেই চার গোল কোমোর
চ্যাম্পিয়ন্স লিগে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই চার গোল করেছে কোমো। ১৯৯১ সালে সাম্পদোরিয়ার পর দ্বিতীয় ইতালিয়ান দল হিসেবে প্রতিযোগিতায় অভিষেক ম্যাচে অন্তত চার গোল করার কীর্তি গড়েছে তারা।
সাম্পদোরিয়া সেবার রোসেনবার্গকে ৫-০ গোলে হারিয়েছিল।
১০০ ম্যাচের ক্লাবে কোর্তোয়া
রিয়াল মাদ্রিদের গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ১০০ ম্যাচ খেলা ৫৬তম ফুটবলার হয়েছেন।
ইউরোপের সবচেয়ে বড় ক্লাব প্রতিযোগিতায় দীর্ঘদিনের ধারাবাহিকতার আরেকটি স্বীকৃতি পেলেন বেলজিয়ান এই গোলরক্ষক।
রায়ার গোল না খাওয়ার রেকর্ড
আর্সেনালের দাভিদ রায়াও গড়েছেন উল্লেখযোগ্য কীর্তি। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে শুরুর একাদশে থাকা ৩৭ ম্যাচের ২০টিতেই গোল হজম করেননি তিনি।
অন্তত ২৫ ম্যাচ খেলা গোলরক্ষকদের মধ্যে ৫৪ শতাংশ ম্যাচে ক্লিন শিট রাখার এই হার এখন প্রতিযোগিতাটিতে সেরা।
তোরেসের হ্যাটট্রিক
পিএসজির ফেরান তোরেস চ্যাম্পিয়ন্স লিগে হ্যাটট্রিক করা নবম স্প্যানিশ ফুটবলার হয়েছেন।
আরও একটি কারণে তার হ্যাটট্রিকটি বিশেষ। ২০১৬ সালে আর্সেনালের হয়ে লুকাস পেরেজের পর লা লিগার বাইরের কোনো ক্লাবের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে হ্যাটট্রিক করা প্রথম স্প্যানিশ ফুটবলার তিনি।
লিভারপুল দেখল ইয়োরেন্তের অন্য রূপ
অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদের মার্কোস ইয়োরেন্তের কাছে লিভারপুল যেন বিশেষ এক প্রতিপক্ষ। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ইংলিশ ক্লাবটির বিপক্ষে পাঁচ ম্যাচে পাঁচ গোল করেছেন তিনি।
অন্যদিকে প্রতিযোগিতার বাকি প্রতিপক্ষগুলোর বিপক্ষে ৫৪ ম্যাচে তার গোলসংখ্যাও মাত্র পাঁচ।
অর্থাৎ ইয়োরেন্তের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ক্যারিয়ারে লিভারপুলই যেন আলাদা এক গল্প।
৩১ মিনিটেই হ্যাটট্রিক
স্টুটগার্টের এরমেদিন দেমিরোভিচ মাত্র ৩১ মিনিট ২১ সেকেন্ডে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে দ্রুততম হ্যাটট্রিকের তালিকায় পঞ্চম স্থানে উঠে এসেছেন।
একই সঙ্গে জেকোর পর দ্বিতীয় বসনিয়ান ফুটবলার হিসেবে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে হ্যাটট্রিক করার কীর্তিও গড়েছেন তিনি।
প্রথম জাপানি গোলরক্ষক
অ্যাস্টন ভিলার জায়ন সুজুকি চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলা প্রথম জাপানি গোলরক্ষক হিসেবে ইতিহাসে নাম লিখিয়েছেন।
তার এই অভিষেক শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, জাপানের গোলরক্ষকদের জন্যও ইউরোপের সর্বোচ্চ ক্লাব প্রতিযোগিতায় নতুন একটি মাইলফলক।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের লিগ পর্বের প্রথম সপ্তাহেই তাই শুধু জয়-পরাজয়ের হিসাব হয়নি। কোথাও কিংবদন্তির রেকর্ডে ভাগ বসেছে, কোথাও ভেঙেছে পুরোনো নজির, আবার কোথাও তৈরি হয়েছে একেবারে নতুন ইতিহাস।
মৌসুমের শুরুতেই যদি এত গল্পের জন্ম হয়, সামনে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের রাতগুলো যে আরও কত রেকর্ডের সাক্ষী হবে—সেটিই এখন দেখার।
সময়ের আলো/টিকে