ব্রাজিল মানেই একসময় ছিল তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, সাম্বার ছন্দ আর মাঠজুড়ে সৃজনশীলতার বিস্ফোরণ। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে সেই ব্রাজিল বহুদিন ধরেই নিজের পুরোনো চেহারা খুঁজে ফিরছে। ২০০২ সালে পঞ্চম বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে শিরোপা তো দূরের কথা, ধারাবাহিকভাবে শেষ চারে ওঠাও সম্ভব হয়নি।
২০২৬ বিশ্বকাপে ব্যর্থতা এসেছে আরও আগেই। শেষ ষোলোতেই নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছে দলটি। তবে সেই হতাশার পর কোচ কার্লো আনচেলত্তিকে সরিয়ে দেওয়ার পথে হাঁটেনি ব্রাজিল। বরং ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত তার ওপর আস্থা রেখেছে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন।
বিশ্বকাপে ব্যর্থতার পরই ব্রাজিল ফুটবলে পরিবর্তনের কথা বলেছিলেন ইতালিয়ান কোচ আনচেলত্তি। সেই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত মিলল বিশ্বকাপের পর আনচেলত্তির প্রথম দল ঘোষণাতেই। ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলা ২৬ জনের মধ্যে মাত্র ৯ জনকে রাখা হয়েছে। নতুন দলে জায়গা পেয়েছেন আটজন অভিষেক প্রত্যাশী। ফলে এটি শুধু একটি নতুন স্কোয়াড নয়, আগামী কয়েক বছরের জন্য ব্রাজিলের সম্ভাব্য কাঠামোও।
নতুন মুখগুলোর মধ্যে আছেন গোলপোস্টে পেদ্রো মরিসকো ও অটাভিও। রক্ষণে আর্থুর দিয়াস, জাইর, মাতেউজিনহো ও মাউরো জুনিয়র। আর মধ্যমাঠে ব্রেনো বিদোন ও গ্যাব্রিয়েল বন্তেম্পো।
দলের বয়সেও এসেছে বড় পরিবর্তন। বিশ্বকাপের দলের গড় বয়স ছিল ২৮.৮ বছর। নতুন দলে সেটি কমে দাঁড়িয়েছে ২৪.৪ বছরে। ছয়জন খেলোয়াড়ের বয়স ২০ বা তার কম। অর্থাৎ আনচেলত্তি এখন শুধু বর্তমানের ফলের দিকে তাকিয়ে নেই, পরবর্তী বিশ্বকাপের জন্য খেলোয়াড়দের প্রস্তুত করার কাজও শুরু করেছেন।
আনচেলত্তির নিজের কথাতেও সেই পরিকল্পনা স্পষ্ট। খেলোয়াড় বাছাইয়ে বয়সকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে না দেখলেও এবার তরুণ প্রতিভাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। তার ভাষায়, ‘সাধারণভাবে আমি খেলোয়াড়দের বয়স দেখি না। তবে এখন সময় এসেছে সম্ভাবনাময় তরুণ খেলোয়াড়দের অগ্রাধিকার দেওয়ার, যারা ভবিষ্যতে দলের সঙ্গে থাকতে পারবে।’
তবে এর অর্থ এই নয় যে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের জন্য জাতীয় দলের দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আনচেলত্তি পরিষ্কার করে দিয়েছেন, ‘৩৪-৩৫ বছর বয়সি কোনো খেলোয়াড়ের ভবিষ্যৎ থাকবে না, তারা দলের বর্তমান।’ আনচেলত্তির ভাষায়, ‘তবে ওই বয়সি কোনো খেলোয়াড় যদি বড় কোনো প্রতিযোগিতায় খেলার জন্য প্রস্তুত থাকে, তা হলে সে ব্রাজিল জাতীয় দলে অবশ্যই থাকবে।’
অভিজ্ঞদের তাই পুরোপুরি ছুড়ে ফেলেননি তিনি। মারকিনিওস, গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস, রাফিনিয়া ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের মতো পরিচিত মুখরা আছেন। তাদের পাশে জায়গা করে নিচ্ছে তরুণরা। এই মিশ্রণটাই হয়তো আগামী দিনের ব্রাজিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হতে পারে।
আক্রমণভাগে অবশ্য ব্রাজিলের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব বেশি দুশ্চিন্তার কারণ নেই। এন্দ্রিক, এস্তেভাও ও রায়ানের মতো তরুণদের নিয়ে ইতিমধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। ভিতোর রেইস ও আন্দ্রে সান্তোসের মতো খেলোয়াড়রাও আনচেলত্তির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় থাকতে পারেন। ক্লাব ফুটবলে নিজেদের জায়গা তৈরি করা এই তরুণদের জাতীয় দলে নিয়মিত সুযোগ দিয়ে ধীরে ধীরে বড় মঞ্চের জন্য প্রস্তুত করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
আনচেলত্তির সামনে তাই কাজটা শুধু সেরা ১১ জন বেছে নেওয়া নয়। কোন তরুণকে কতটা সময় দিতে হবে, অভিজ্ঞদের মধ্যে কারা থাকবেন, মাঝমাঠের ভারসাম্য কীভাবে ফিরবে— এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে তাকে। একই সঙ্গে ব্রাজিলের খেলায় ফিরিয়ে আনতে হবে সেই আত্মবিশ্বাস, যেটি সাম্প্রতিক বিশ্বকাপগুলোতে বারবার ধাক্কা খেয়েছে।
২০২৬ বিশ্বকাপের ব্যর্থতা হয়তো আনচেলত্তির ব্রাজিল অধ্যায়ের শেষ নয়, বরং নতুন অধ্যায়ের শুরু বলা যায়। ২০৩০ বিশ্বকাপ সামনে রেখে এখন যে তরুণদের পরীক্ষা করছেন তিনি, তাদের মধ্য থেকেই হয়তো তৈরি হবে পরবর্তী ব্রাজিলের মূল দল। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ষষ্ঠ শিরোপার অপেক্ষা তাই শুধু আনচেলত্তির কৌশলের ওপর নয়, তার হাতে তৈরি হতে থাকা এই নতুন প্রজন্মের ওপরও নির্ভর করছে।