রক্ষণ থেকে আক্রমণে, সব পজিশনেই সেরা : কীভাবে ইউরোপের সেরা খেলোয়াড় হয়েছিলেন রুউড গুলিত

ক্রীড়া ডেস্ক

খেলা

ফুটবলে এমন খেলোয়াড় খুব কমই এসেছেন, যাদের নির্দিষ্ট কোনো একটি পজিশনের সঙ্গে আটকে রাখা যায় না। রক্ষণভাগ থেকে শুরু করে

2026-09-12T14:08:05+00:00
2026-09-12T14:20:31+00:00
 
  শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৮ ভাদ্র ১৪৩৩
শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
খেলা
রক্ষণ থেকে আক্রমণে, সব পজিশনেই সেরা : কীভাবে ইউরোপের সেরা খেলোয়াড় হয়েছিলেন রুউড গুলিত
ক্রীড়া ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:০৮ পিএম  আপডেট: ১২.০৯.২০২৬ ২:২০ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
ফুটবলে এমন খেলোয়াড় খুব কমই এসেছেন, যাদের নির্দিষ্ট কোনো একটি পজিশনের সঙ্গে আটকে রাখা যায় না। রক্ষণভাগ থেকে শুরু করে মাঝমাঠ, উইং কিংবা আক্রমণভাগ—প্রায় সব জায়গাতেই সমান দাপট দেখিয়েছেন রুউড গুলিত। শারীরিক শক্তি, গতি, টেকনিক ও মাঠের বুদ্ধিমত্তার অনন্য সমন্বয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আশির দশকের ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা। 

সুরিনামিজ বংশোদ্ভূত এই ডাচ তারকা ছিলেন লম্বা, শক্তিশালী ও দুর্দান্ত গতির অধিকারী। তার মাথাভর্তি লম্বা ড্রেডলকসও তাকে মাঠে আলাদা পরিচয় দিত। কিন্তু রুউড গুলিতের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তার বহুমুখী প্রতিভা। কখনো সুইপার, কখনো সেন্টার-ব্যাক, কখনো রাইট উইঙ্গার, আবার কখনো অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার কিংবা স্ট্রাইকার—যে ভূমিকাতেই খেলেছেন, নিজেকে সেরাদের একজন হিসেবে প্রমাণ করেছেন। 

সাবেক সতীর্থ রবার্তো দোনাদোনি একবার গুলিত সম্পর্কে বলেছিলেন, তার শারীরিক সক্ষমতা এমন ছিল যে তাকে যেকোনো পজিশনে খেলানো যেত। পিএসভির সাবেক সতীর্থ রেনে ফন ডার গেইপও মনে করতেন, রাইট-ব্যাক থেকে স্ট্রাইকার—প্রায় প্রতিটি পজিশনেই গুলিত সেরা হতে পারতেন। 

ডিফেন্ডার থেকে গোলমেশিন

গুলিতের ফুটবলযাত্রার শুরুটা হয়েছিল রক্ষণভাগে। ১৯৭৭ সালে হ্যার্লেমের কোচ ব্যারি হিউজ ১৫ বছর বয়সী খুলিতকে তার স্কুল ফুটবল দল ডিডব্লিউএস থেকে তুলে আনার জন্য তার বাড়িতে যান। প্রথমবার তার বাবা রাজি হননি। এক বছর পর ঠিক একই দিনে, একই সময়ে আবার হাজির হন হিউজ। এবার গুলিতকে হ্যার্লেমে নিয়ে যেতে সফল হন তিনি। 

মাত্র ১৬ বছর ২৪৫ দিন বয়সে হ্যার্লেমের হয়ে অভিষেক করে সে সময়ের এরেদিভিসির সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড়ের রেকর্ড গড়েন গুলিত। শুরুতে খেলতেন সুইপার হিসেবে। কিন্তু দ্বিতীয় মৌসুমে কোচ তাকে আক্রমণভাগে তুলে আনেন। সেখানেই বদলে যেতে শুরু করে তার ক্যারিয়ার। 

নিজের ডিফেন্ডার হিসেবে পাওয়া অভিজ্ঞতাকেই আক্রমণভাগে কাজে লাগিয়েছিলেন গুলিত। তিনি বুঝতে পারতেন একজন ডিফেন্ডার কী করতে চান। তাই গোলের সামনে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের বদলে বল কোথায় রাখতে হবে, সেটাই শিখতে শুরু করেন। নিয়মিত অতিরিক্ত অনুশীলনের পর গোল করা তার কাছে সহজ হয়ে যায়। 

হ্যার্লেমকে শীর্ষ বিভাগে ফেরাতে ১৪ গোল করেন খুলিত এবং নির্বাচিত হন Eerste Divisie-এর সেরা খেলোয়াড়। পরের মৌসুমে অ্যাটাকিং মিডফিল্ড ও উইংয়ে খেলেও ১৪ গোল করেন। তখনই স্পষ্ট হয়ে যায়, এই তরুণের জন্য হ্যার্লেম খুব ছোট হয়ে পড়ছে। 

ক্রুইফের হাতে নতুন শিক্ষা

পরের গন্তব্য ফেইনুর্ড। সেখানে তার ক্যারিয়ারে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—জোহান ক্রুইফ। ৩৬ বছর বয়সে ক্রুইফ যখন ফেইনুর্ডে যোগ দেন, তখন অনেকেই তার সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু গুলিত দ্রুতই বুঝতে পারেন, বয়সের সঙ্গে এই কিংবদন্তির ফুটবল বুদ্ধিমত্তার কোনো সম্পর্ক নেই। 

ক্রুইফ শুধু সতীর্থ ছিলেন না, হয়ে উঠেছিলেন গুলিতের পরামর্শদাতাও। দুজনের বোঝাপড়া ফেইনুর্ডকে বদলে দেয়। গোল করা ও করানোয় তারা হয়ে ওঠেন দুর্দান্ত জুটি। ক্রুইফের প্রভাব গুলিতের ফুটবল দর্শনেও বড় পরিবর্তন আনে। 

সেই মৌসুমে ফেইনুর্ড ১০ বছর পর লিগ শিরোপা জেতে। গুলিত হন ডাচ ফুটবলার অব দ্য ইয়ার। ক্রুইফ তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছিলেন—পরের ক্লাবে গেলে হয়তো সবাই তাকে পছন্দ করবে না, কিন্তু তাকে এমনভাবে খেলতে হবে যাতে তার চারপাশের খেলোয়াড়রাও আরও ভালো হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে পিএসভি ও এসি মিলানে গিয়ে খুলিত বুঝতে পারেন, ক্রুইফের সেই কথার গভীরতা কতটা ছিল। 

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত


পিএসভিতে পূর্ণতা

ফেইনুর্ডের পর পিএসভিতে গিয়ে গুলিত আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠেন। ১৯৮৬-৮৭ মৌসুমে ৩৪ ম্যাচে করেন ২২ গোল। একই সময়ে তিনি কখনো অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার, কখনো উইং, আবার প্রয়োজনে সুইপার হিসেবেও খেলেছেন। তার এই বহুমুখী সামর্থ্যই তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তুলেছিল। 

পিএসভির হয়ে টানা লিগ শিরোপা জেতার পর ১৯৮৭ সালে খুলিতের ক্যারিয়ারে আসে বড় পরিবর্তন। কোচ হ্যান্স ক্রাইয়ের সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি এবং নিজের পজিশন নিয়ে অসন্তোষ শেষ পর্যন্ত তাকে পিএসভি ছাড়ার পথে নিয়ে যায়। এসি মিলান তখন তাকে দলে নিতে মরিয়া। শেষ পর্যন্ত ১৭ মিলিয়ন গিল্ডারে ট্রান্সফার সম্পন্ন হয়। 

ইউরোপের রাজা

১৯৮৭ সালের শেষ দিকে গুলিত পান ব্যালন ডি’অর। পিএসভিতে তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স এবং এসি মিলানে প্রথম কয়েক মাসের নৈপুণ্য তাকে ইউরোপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার এনে দেয়। 

এসি মিলানে গুলিতের সঙ্গে যোগ দেন মার্কো ফন বাস্তেন ও পরে ফ্রাঙ্ক রাইকার্ড। কোচ আরিগো সাক্কির অধীনে তৈরি হয় ইউরোপের অন্যতম স্মরণীয় দল। ১৯৮৭-৮৮ মৌসুমে মিলান সিরি আ শিরোপা জেতে। গুলিত তখন মূলত ডান উইংয়ে খেললেও তার প্রভাব ছিল পুরো আক্রমণভাগজুড়ে। 

এরপর আসে ইউরো ১৯৮৮। নেদারল্যান্ডসের অধিনায়ক হিসেবে গুলিত প্রথম ম্যাচে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে সমালোচনার মুখে পড়লেও পরের ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার নেতৃত্বে ফন বাস্তেনের হ্যাটট্রিক ডাচদের ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করে। ফাইনালে আবার সেই সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে গুলিতের হেডেই এগিয়ে যায় নেদারল্যান্ডস। পরে ফন বাস্তেনের ঐতিহাসিক ভলিতে আসে জয়। খুলিত হন প্রথম ডাচ অধিনায়ক, যিনি বড় কোনো আন্তর্জাতিক ট্রফি হাতে তোলেন। 

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত


মিলানের ইউরোপ জয়

রাইকার্ড মিলানে যোগ দেওয়ার পর ফন বাস্তেন, গুলিত ও রাইকার্ডের ত্রয়ী পূর্ণতা পায়। ১৯৮৯ সালের ইউরোপিয়ান কাপ সেমিফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদকে দুই লেগ মিলিয়ে ৬-১ গোলে উড়িয়ে দেয় মিলান। ফাইনালে স্টেয়াউয়া বুখারেস্টের বিপক্ষে ৪-০ জয়ে খুলিত নিজেই দুটি গোল করেন। 

তবে এরপরই চোট তার ক্যারিয়ারে বড় ধাক্কা হয়ে আসে। হাঁটুর মেনিসকাসের চোটের কারণে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকতে হয়। পরবর্তী সময়ে মিলানে তার ভূমিকা কমতে থাকে। যদিও আরও একটি সিরি আ শিরোপা জিতেছিলেন, আগের সেই অপ্রতিরোধ্য গুলিত আর দেখা যায়নি। 

চেলসিতে শেষ অধ্যায়

১৯৯৫ সালে গুলিত যোগ দেন চেলসিতে। শুরুতে আবারও রক্ষণভাগে খেলানো হলেও তার আক্রমণাত্মক মানসিকতা তাকে মাঝমাঠে উঠে আসতে বাধ্য করে। পরে গ্লেন হডলের অধীনে তিনি চেলসির খেলোয়াড়-কোচ হন। ১৯৯৭ সালে তার নেতৃত্বে চেলসি এফএ কাপ জেতে, যা ছিল ক্লাবটির দীর্ঘ সময় পর বড় ট্রফি জয়। 

পরবর্তীতে নিউক্যাসলের কোচ হন গুলিত । এরপর ফেইনুর্ড, এলএ গ্যালাক্সি ও তেরেক গ্রোজনির মতো দলের সঙ্গে কোচিংয়ে যুক্ত হলেও শেষ পর্যন্ত ব্যবস্থাপনার কাজ থেকে সরে আসেন। 

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত


রুউড গুলিতের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাই শুধু তার ব্যালন ডি’অর, ইউরোপিয়ান কাপ কিংবা ইউরো জয় নয়। তার আসল বিশেষত্ব ছিল পজিশনের সীমাকে অস্বীকার করা। একজন ডিফেন্ডার হয়ে শুরু করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আক্রমণভাগের নায়ক, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রক এবং ইউরোপের সেরা খেলোয়াড়। ফুটবলে ‘অলরাউন্ডার’ শব্দটির সবচেয়ে শক্তিশালী উদাহরণগুলোর একটি হয়ে আজও টিকে আছে তার নাম।

সময়ের আলো/টিকে
  বিষয়:   রক্ষণ  আক্রমণে  পজিশন  সেরা  ইউরোপ  সেরা  খেলোয়াড়  রুউড গুলিত  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: