হরমুজ প্রণালির পর এখন বড় ধরনের ঝুঁকিতে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি নৌপথ। ইরান-সমর্থিত হুথিদের তৎপরতায় হুমকির মুখে পড়েছে লোহিত সাগরের প্রবেশমুখের বাব আল-মান্দেব প্রণালি। এরইমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকা দখলে নিয়েছে হুথিরা। এতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়ায় তেল সরবরাহে তৈরি হয়েছে নতুন সংকট। বাড়ছে তেলের দাম। তার প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিতেও।
বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সৌদি আরব কোটি কোটি ব্যারেল তেল রফতানিতে বাব এল-মান্দেব ব্যবহার করেছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
গত ৪৮ ঘণ্টায় বাব এল-মান্দেবের ওপর হুতিদের নিয়ন্ত্রণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তারা বন্দরনগরী মোখা দখল করেছে।
ইয়েমেন সরকারের সূত্রের বরাতে জানা গেছে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপও দখলে নিয়েছে তারা। দ্বীপটি এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের মাঝখানে অবস্থিত। এ পরিস্থিতি বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ও জাহাজ চলাচলের ব্যয় নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে।
এই প্রণালি ব্যবহার করা না গেলে অঞ্চলটি থেকে কম তেল সরবরাহ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে জাহাজগুলোকে আরও দীর্ঘ পথে চলতে হবে। এতে পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়তে পারে।
এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে এনার্জি অ্যাসপেক্টসের সহপ্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড ব্রোঞ্জ বলেছেন, ‘হরমুজের বর্তমান পরস্থিতিতে বাব এল-মান্দেব একটি লাইফলাইন ছিল। এই লাইফলাইন হারানো তেলবাজারের জন্য ভয়াবহ সতর্কবার্তা। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি কতটা অস্থিতিশীল তারও ইঙ্গিত।’
তেল পরিবহন ব্যাপক কমেছে
যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। এটি ছিল বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি আরব ইস্ট টু ওয়েস্ট পাইপলাইন দিয়ে অপরিশোধিত তেল পরিবহন শুরু করে। এরপর লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর থেকে তেল রফতানি করা হয়। সর্বোচ্চ পর্যায়ে ইয়ানবু থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রফতানি করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল বাব এল-মান্দেব দিয়ে বের হতো বলে জানান ব্রোঞ্জ।
তবে, হুতিদের হুমকির কারণে আগস্টে বাব এল-মান্দেব দিয়ে সৌদি অপরিশোধিত তেলের প্রবাহ কমে প্রতিদিন প্রায় ৪ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে। বর্তমানে তা আরও কমেছে।
প্রণালিটি এড়িয়ে যেতে অনেক তেলবাহী জাহাজকে এশিয়ায় পৌঁছাতে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হচ্ছে। কিছু জাহাজ সুয়েজ খাল পেরিয়ে ভূমধ্যসাগরে যাচ্ছে। এরপর আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল ধরে মহাদেশটির দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করছে। এই বিকল্প পথে যেতে প্রায় এক মাস অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে। এতে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ছে।
এ প্রসঙ্গে ব্রোঞ্জ বলেছেন, ‘আমরা দেখেছি এশিয়ার অনেক শোধনাগার বিকল্প খুঁজতে গিয়ে অন্য অঞ্চল থেকে তেলের কার্গো কিনছে। ফলে, সেখানে তেলের কার্গোর দাম বাড়ছে। তেলের দাম এত দ্রুত বাড়ার এটিই বড় কারণ।’
বাব এল-মান্দেবের কৌশলগত এলাকাগুলো হুতিদের দখলে যাওয়ার খবর বৃহস্পতিবার তেলের দাম বাড়িয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক বাজারের বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড এবং যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ডব্লিউটিআই উভয়ের দাম ৭ শতাংশের বেশি বেড়ে যথাক্রমে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ও ১০৩ ডলারে পৌঁছে। মে মাসের পর এটিই ছিল তাদের সর্বোচ্চ দাম।
কেপলারের জ্যেষ্ঠ ক্রুড বিশ্লেষক জোহানেস রাউবাল বলেছেন, ‘লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন, সৌদি আরবের তেল উৎপাদন কমানো এবং রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনের হামলার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।’
তিনি বলেছেন, ‘দ্রুত কোনো সমাধানের সম্ভাবনা না থাকায় এবং এসব বিঘ্ন অব্যাহত থাকায় শোধনাগারগুলো অতিরিক্ত অপরিশোধিত তেল সংগ্রহে বাধ্য হচ্ছে। এতে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ছে।’
প্রতিটি জাহাজই সম্ভাব্য লক্ষ্য
লোহিত সাগরের নৌপথ এড়িয়ে চলার অভিজ্ঞতা রয়েছে জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর। ২০২৩ সালের শেষ দিকে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রতিশোধ হিসেবে বাব এল-মান্দেব দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করে হুতিরা।
ফ্রেইট ডেটা প্রতিষ্ঠান জেনেটার প্রধান বিশ্লেষক পিটার স্যান্ডের হিসাবে, বাব এল-মান্দেব দিয়ে জাহাজ চলাচল ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কমেছে। সাম্প্রতিক সময়ের সংঘাত বেড়ে যাওয়ার পর গত কয়েক দিনে জাহাজ চলাচল আরও ৪৬ শতাংশ কমেছে।
তবে, জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে বলে মনে করেন না স্যান্ড। কারণ, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর।
তবু তিনি মনে করেন, প্রতিটি জাহাজই সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
সূত্র : সিএনএন
সময়ের আলো/মহু