২০০৩ সালে অ্যান্ডি রডিক যখন ইউএস ওপেনের ট্রফি হাতে তুলেছিলেন, বেন শেলটনের বয়স তখন মাত্র ১১ মাস। তখন কে জানত, দুই দশকেরও বেশি সময় পর সেই একই শহরের টেনিসের সবচেয়ে বড় মঞ্চে আমেরিকার আরেক তরুণকে ঘিরে এমন অপেক্ষা তৈরি হবে?
রডিকের পর আর কোনো আমেরিকান পুরুষ খেলোয়াড় ইউএস ওপেনের শিরোপা জিততে পারেননি। ২৩ বছরের সেই অপেক্ষার শেষটা এবার শেলটনের হাত ধরে হবে কি না, তার উত্তর মিলবে ফ্লাশিং মিডোজের ফাইনালে। তবে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এমন একজন, যিনি নিজেও এই মঞ্চে অসমাপ্ত গল্প শেষ করতে মরিয়া—আলেক্সান্দার জভেরেভ।
জার্মান তারকা শুধু প্রতিপক্ষ নন, শেলটনের ‘আমেরিকান ড্রিমের’ সবচেয়ে বড় বাধাও। সেমিফাইনালের পর জভেরেভের কথাতেই ছিল সেই চ্যালেঞ্জের স্পষ্ট ইঙ্গিত। স্বাগতিক দুই খেলোয়াড়ের লড়াই দেখে তার উপলব্ধি ছিল একটাই—রোববার তিনি আমেরিকান স্বপ্ন পূরণ হতে দিতে চান না।
দুই খেলোয়াড়ের প্রেরণার জায়গাটিও আলাদা। জভেরেভের সামনে পুরোনো ক্ষত সারানোর সুযোগ। ছয় বছর আগে এই ইউএস ওপেনেই প্রথমবার গ্র্যান্ড স্লামের ফাইনালে উঠেছিলেন তিনি। ডমিনিক থিয়েমের বিপক্ষে সেই ফাইনালে জয়ের খুব কাছে গিয়েও শেষ পর্যন্ত ট্রফি ছুঁতে পারেননি। এবার আবার নিউইয়র্কের ফাইনালে। এর মধ্যে আরও কয়েকটি গ্র্যান্ড স্লামের শেষ মঞ্চে উঠেছেন, কিন্তু অধরা থেকে গেছে কাঙ্ক্ষিত শিরোপা।
খাচানভকে হারিয়ে এবার টানা তৃতীয় গ্র্যান্ড স্লামের ফাইনালে উঠেছেন জভেরেভ। রুশ প্রতিপক্ষকে ৬-৩, ৭-৬, ৭-৬ গেমে হারিয়ে জায়গা করে নিয়েছেন শিরোপার লড়াইয়ে। বছরের দ্বিতীয় গ্র্যান্ড স্লাম জয়ের সুযোগও এখন তার সামনে।
অন্যদিকে শেলটনের গল্পটা যেন আরও বড়।
কার্লোস আলকারাজকে হারিয়ে সেমিফাইনালে ওঠার পরই বোঝা যাচ্ছিল, নিউইয়র্কে নিজের সেরা টেনিস খেলছেন তিনি। সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষ ছিলেন বন্ধু ফ্রান্সিস তিয়াফো—যাকে বয়সে পাঁচ বছরের বড় হওয়ায় শেলটন ‘বড় ভাইয়ের মতো’ মনে করেন। কিন্তু আর্থার অ্যাশ স্টেডিয়ামে বন্ধুত্বের জায়গা ছিল না। ছিল শুধু ফাইনালে ওঠার লড়াই।
৩ ঘণ্টা ১৭ মিনিটের ম্যাচে তিয়াফোকে ৪-৬, ৬-৩, ৬-৩, ৭-৫ গেমে হারিয়ে প্রথমবারের মতো গ্র্যান্ড স্লামের ফাইনালে উঠেছেন শেলটন। তার শক্তিশালী সার্ভিস, ক্ষিপ্রতা আর আক্রমণাত্মক টেনিস শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দিয়েছে।
শেলটনের এই জয় শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, আমেরিকান টেনিসের জন্যও বিশেষ একটি মুহূর্ত।
কারণ ইউএস ওপেনের পুরুষ এককের সেমিফাইনালে প্রথমবার মুখোমুখি হয়েছিলেন দুই কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান খেলোয়াড়। ফলে ফল যা-ই হোক, নিশ্চিত ছিল ইতিহাস। ১৯৭২ সালে আর্থার অ্যাশের পর প্রথমবার কোনো কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান পুরুষ খেলোয়াড় ইউএস ওপেনের ফাইনালে উঠবেন—শেষ পর্যন্ত সেই নামটি হয়েছে শেলটনের।
অর্থাৎ শেলটন এখন শুধু রডিকের উত্তরসূরি হওয়ার অপেক্ষায় নেই। তার সামনে রয়েছে আরও বড় একটি ইতিহাস।
১৯৬৮ সালে ইউএস ওপেন জিতে আর্থার অ্যাশ প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ খেলোয়াড় হিসেবে গ্র্যান্ড স্লাম জয়ের ইতিহাস গড়েছিলেন। পরে ১৯৮৩ সালের ফ্রেঞ্চ ওপেনে সেই তালিকায় যোগ দেন ফ্রান্সের ইয়ানিক নোয়া। শেলটন যদি জভেরেভকে হারাতে পারেন, তাহলে ইতিহাসের তৃতীয় কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ খেলোয়াড় হিসেবে গ্র্যান্ড স্লাম জয়ের কীর্তি গড়বেন তিনি।
আর সেই ইতিহাসের মঞ্চও হবে আর্থার অ্যাশ স্টেডিয়াম—যার নামই যেন এই গল্পকে আরও অর্থবহ করে তুলেছে।
তবে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিতে হলে আগে হারাতে হবে জভেরেভকে।
জার্মান তারকারও কম অনুপ্রেরণা নেই। ছয় বছর আগের সেই ফাইনালের স্মৃতি এখনো তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। এবার টানা তৃতীয় গ্র্যান্ড স্লামের ফাইনালে উঠে তার সামনে ক্যারিয়ারের বহুদিনের অপূর্ণতা পূরণের সুযোগ। শেলটন যেমন আমেরিকার দীর্ঘ অপেক্ষার শেষ দেখতে চাইছেন, জভেরেভ তেমনি নিজের গ্র্যান্ড স্লাম-অপেক্ষার ইতি টানতে চান।
তাই ফাইনালটি কেবল একজন তরুণ আমেরিকানের স্বপ্ন বনাম এক জার্মান তারকার প্রতিরোধ নয়। একদিকে ২৩ বছরের আমেরিকান অপেক্ষা, অন্যদিকে ছয় বছর আগের জভেরেভের ক্ষত। একদিকে ইতিহাসের হাতছানি, অন্যদিকে অসমাপ্ত গল্প শেষ করার তাগিদ।
নিউইয়র্কের রাত শেষ হলে একজনের স্বপ্ন পূরণ হবে, অন্যজনকে আবার অপেক্ষা করতে হবে।
প্রশ্ন শুধু একটাই—শেলটনের ‘আমেরিকান ড্রিম’ কি সত্যিই পূরণ হবে, নাকি জভেরেভ সেটিকে আটকে দেবেন আর্থার অ্যাশ স্টেডিয়ামেই?
সময়ের আলো/টিকে