একজন বিশ্বের এক নম্বর। অন্যজন দুই নম্বর। একজনের হাতে বিস্ফোরক শক্তি, অন্যজনের সার্ভ যেন কামানের গোলা। দুজনই ইউএস ওপেনে এখন পর্যন্ত অপরাজিত। ছয় ম্যাচে ছয় জয় নিয়ে তারা দাঁড়িয়ে আছেন আর্থার অ্যাশ স্টেডিয়ামের শেষ প্রান্তে—শিরোপা থেকে মাত্র এক ম্যাচ দূরে।
ইউএস ওপেনের মেয়েদের এককের ফাইনালে তাই এর চেয়ে পরিচিত কিংবা আকর্ষণীয় কোনো সমীকরণ হয়তো চাইতেই পারেনি নিউইয়র্ক। আরিনা সাবালেঙ্কা বনাম এলেনা রিবাকিনা—বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের এক ও দুই নম্বর খেলোয়াড়ের লড়াই। দুই তারকার দ্বৈরথে এমনিতেই আলাদা উত্তাপ থাকে। তার ওপর এবার হাতে গ্র্যান্ড স্লামের শিরোপা।
কাগজে-কলমে ম্যাচটির কোনো পরিষ্কার ফেবারিট নেই। কারণ মুখোমুখি লড়াইয়ের হিসাব ৫-৫। শেষ পাঁচ ম্যাচে সাবালেঙ্কা এগিয়ে ৩-২, কিন্তু বড় মঞ্চে রিবাকিনাও তাকে হারানোর অভিজ্ঞতা রাখেন। অর্থাৎ অতীত বলছে, একজন আরেকজনকে হারাতে পারেন। বর্তমান বলছে, দুজনই দুর্দান্ত ফর্মে।
তাহলে শেষ হাসি হাসবেন কে?
দুজনের গল্প, একই মঞ্চে
সাবালেঙ্কা ও রিবাকিনার টেনিসে মিল যেমন আছে, পার্থক্যও তেমন। দুজনই শক্তিশালী সার্ভের ওপর দাঁড়িয়ে খেলা তৈরি করেন। প্রথম সুযোগেই আক্রমণে যেতে চান। প্রতিপক্ষকে র্যালিতে ঢোকার আগেই চাপে ফেলতে চান।
কিন্তু তাদের আক্রমণের ধরন এক নয়।
সাবালেঙ্কার খেলায় একটা বিস্ফোরণ আছে। তার ফোরহ্যান্ডের গতি, শরীরের শক্তি এবং দ্রুত পয়েন্ট শেষ করার প্রবণতা প্রতিপক্ষকে অনেক সময় প্রথম থেকেই রক্ষণাত্মক করে দেয়। তিনি শুধু নিজের সার্ভিস গেম ধরে রাখতে চান না, প্রতিপক্ষের সার্ভেও চাপ তৈরি করতে চান।
রিবাকিনার শক্তি একটু অন্য জায়গায়। তার সার্ভের গতি ও নির্ভুলতা প্রতিপক্ষকে শুরুতেই অস্বস্তিতে ফেলে। প্রথম সার্ভ ঢুকে গেলে পরের বলেই পয়েন্ট নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ক্ষমতা তার বড় অস্ত্র।
এই দুই ধরনের শক্তির সংঘর্ষই হয়তো ফাইনালের সবচেয়ে আকর্ষণীয় গল্প।
৫-৫ : হিসাব যখন সমানে সমান
সাবালেঙ্কা ও রিবাকিনার মধ্যে এখন পর্যন্ত ১০টি অফিসিয়াল ম্যাচ হয়েছে। জয় সমান—৫-৫।
শেষ পাঁচ ম্যাচে অবশ্য সামান্য এগিয়ে সাবালেঙ্কা। তিনবার জিতেছেন তিনি। চলতি মৌসুমেই ইন্ডিয়ান ওয়েলস ও মিয়ামিতে রিবাকিনাকে হারিয়েছেন বেলারুশের তারকা।
কিন্তু রিবাকিনারও পাল্টা দেওয়ার ইতিহাস আছে। অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের মতো বড় মঞ্চে সাবালেঙ্কাকে হারিয়েছেন তিনি। ফলে ফাইনালের আগে পুরোনো ফলাফল কোনো পক্ষকেই স্বস্তি দেওয়ার মতো জায়গায় নেই।
বরং এই দ্বৈরথের ইতিহাস বলে, একজন যখন অন্যজনকে হারান, তখন সাধারণত ম্যাচের ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই পার্থক্য তৈরি করে।
একটি ব্রেক পয়েন্ট। একটি দ্বিতীয় সার্ভ। একটি টাইব্রেক। অথবা ৩০-৩০ অবস্থায় একটি দুর্দান্ত রিটার্ন।
ফাইনালেও হয়তো গল্পটা সেখানেই লেখা হবে।
সংখ্যায় রিবাকিনার সার্ভ, সংখ্যায় সাবালেঙ্কার আগ্রাসন
এই ইউএস ওপেনে দুজনের সার্ভের পরিসংখ্যান বেশ চমকপ্রদ।
ছয় ম্যাচে রিবাকিনা মেরেছেন ৪২টি এস। সাবালেঙ্কা ৩৯টি। কিন্তু এসের সংখ্যাই পুরো গল্প নয়।
সাবালেঙ্কার প্রথম সার্ভ ঢোকার হার প্রায় ৬৬ শতাংশ। অর্থাৎ তিনি তুলনামূলক বেশি প্রথম সার্ভ খেলতে পারছেন। সেই সার্ভ থেকে প্রায় ৭২ শতাংশ পয়েন্টও জিতেছেন।
রিবাকিনার প্রথম সার্ভ ঢোকার হার প্রায় ৫৮ শতাংশ। কিন্তু একবার প্রথম সার্ভ ঠিক জায়গায় পড়লে সেটি সামলানো যেন আরও কঠিন। প্রথম সার্ভ থেকে তার পয়েন্ট জয়ের হার প্রায় ৮০ শতাংশ।
এই একটি সংখ্যাই ফাইনালের অন্যতম বড় প্রশ্ন সামনে এনে দেয়।
সাবালেঙ্কা কি বেশি প্রথম সার্ভ ঢুকিয়ে নিজের আক্রমণের সুযোগ তৈরি করবেন, নাকি রিবাকিনা কম প্রথম সার্ভ ঢুকিয়েও প্রতিটি সফল সার্ভ থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা নেবেন?
দ্বিতীয় সার্ভেও ব্যবধান খুব বেশি নয়। সাবালেঙ্কা প্রায় ৫৯ শতাংশ দ্বিতীয়-সার্ভ পয়েন্ট জিতেছেন। রিবাকিনার হার ৫৫ শতাংশের একটু বেশি।
অর্থাৎ ম্যাচ যত টানটান হবে, দ্বিতীয় সার্ভের ওপর চাপ তত বাড়বে।
সাবালেঙ্কার আক্রমণ কি রিবাকিনাকে ভাঙতে পারবে?
সাবালেঙ্কার সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু তার শক্তি নয়, শক্তির ধারাবাহিক ব্যবহার। এই টুর্নামেন্টে ছয় ম্যাচে তিনি ১৬২টি উইনার মেরেছেন।
সংখ্যাটি রিবাকিনার চেয়ে অনেক বেশি। কাজাখ খেলোয়াড়ের উইনার ১৩১টি।
কিন্তু এখানেও একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। সাবালেঙ্কার আনফোর্সড এরর ১২০টি, রিবাকিনার ১৩৬টি।
অর্থাৎ সাবালেঙ্কা বেশি আক্রমণ করছেন, কিন্তু সেই আক্রমণ সব সময় ভুলে পরিণত হচ্ছে না। বরং উইনার ও আনফোর্সড এররের ব্যবধান তার পক্ষে বেশ ইতিবাচক।
ফাইনালে তার সামনে তাই একটি কঠিন ভারসাম্যের প্রশ্ন থাকবে—আক্রমণ করবেন, কিন্তু কতটা?
অতিরিক্ত আক্রমণ করলে রিবাকিনা অপেক্ষা করবেন ভুলের জন্য। আবার বেশি হিসাব করে খেললে সাবালেঙ্কা নিজের সবচেয়ে বড় অস্ত্রটাই হারাতে পারেন।
রিবাকিনার পরিকল্পনা হতে পারে ধৈর্যের
রিবাকিনার পক্ষে ম্যাচের সমীকরণটা হয়তো একটু আলাদা। তাকে সাবালেঙ্কার সঙ্গে শক্তির প্রতিযোগিতায় নামতেই হবে এমন নয়।
নিজের সার্ভ ধরে রেখে সাবালেঙ্কার ওপর চাপ বাড়ানোই হতে পারে তার সবচেয়ে কার্যকর পথ।
ছয় ম্যাচে রিবাকিনা মাত্র ১৭টি ব্রেক পয়েন্টের মুখোমুখি হয়েছেন। এর প্রায় ৫৯ শতাংশ বাঁচিয়েছেন তিনি। সাবালেঙ্কাকে যেখানে ২১টি ব্রেক পয়েন্ট সামলাতে হয়েছে, সেখানে তার সেভের হার প্রায় ৫২ শতাংশ।
এই সংখ্যাগুলো বলছে, রিবাকিনা নিজের সার্ভিস গেমকে তুলনামূলক নিরাপদ রাখতে পেরেছেন।
ফাইনালে সেটিই তার বড় অস্ত্র হতে পারে।
সাবালেঙ্কা যদি কয়েকটি গেমে আক্রমণ করতে গিয়ে ভুল করেন, রিবাকিনা হয়তো সেই ছোট সুযোগটাই কাজে লাগাতে চাইবেন।
রিটার্নে সাবালেঙ্কার বাড়তি চাপ
তবে সাবালেঙ্কাকে কেবল নিজের সার্ভের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না। প্রতিপক্ষের সার্ভেও তিনি নিয়মিত হুমকি তৈরি করেছেন।
টুর্নামেন্টে ৫৪টি ব্রেক পয়েন্ট তৈরি করেছেন তিনি। সেখান থেকে ২৫টি কাজে লাগিয়েছেন—সাফল্যের হার প্রায় ৪৬ শতাংশ।
রিবাকিনা তৈরি করেছেন ৫২টি ব্রেক পয়েন্ট এবং কাজে লাগিয়েছেন প্রায় ৪০ শতাংশ।
ব্যবধান খুব বেশি নয়। কিন্তু ফাইনালের মতো ম্যাচে এমন সামান্য পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে যদি প্রথম কয়েকটি গেমে সাবালেঙ্কা রিবাকিনার সার্ভে চাপ তৈরি করতে পারেন, তাহলে ম্যাচের মানসিক নিয়ন্ত্রণও তার হাতে চলে যেতে পারে।
টাইব্রেকেও কেউ পিছিয়ে নেই
দুজনের ফাইনালে যাওয়ার পথেও চাপ সামলানোর ভালো প্রমাণ আছে।
সাবালেঙ্কা এই টুর্নামেন্টে দুটি টাইব্রেক খেলেছেন, দুটিতেই জিতেছেন। রিবাকিনা একটি টাইব্রেক খেলেছেন, সেটিও জিতেছেন।
তাই কোনো সেট ৬-৬ পর্যন্ত গেলে কাউকেই এগিয়ে রাখার মতো পরিসংখ্যান নেই।
বরং তখন ম্যাচ হয়ে উঠতে পারে সম্পূর্ণ মানসিক শক্তির পরীক্ষা।
একটি সার্ভ, একটি রিটার্ন, একটি ভুল—গ্র্যান্ড স্লামের ফাইনালে এতটুকুই যথেষ্ট।
আর্থার অ্যাশের আলোয় শেষ পরীক্ষা
নিউইয়র্কের আর্থার অ্যাশ স্টেডিয়াম শুধু একটি টেনিস কোর্ট নয়। বড় ম্যাচের চাপ, দর্শকদের শব্দ, রাতের আলো—সব মিলিয়ে এটি নিজেই এক চরিত্র।
এমন মঞ্চে খেলার অভিজ্ঞতা দুজনেরই আছে। তাই ফাইনালের শুরুতে নার্ভাসনেসের চেয়ে বরং দেখা যাবে কে কত দ্রুত নিজের ছন্দ খুঁজে পান।
হার্ডকোর্টে পরিষ্কার ও শক্তিশালী প্রথম বল গুরুত্বপূর্ণ। সার্ভের পরের শটও গুরুত্বপূর্ণ। আর প্রতিপক্ষের রিটার্ন কতটা গভীরে রাখা যাচ্ছে, সেটিও ম্যাচের গতি ঠিক করতে পারে।
দুজনের সার্ভ শক্তি বিবেচনায় শুরুতে দ্রুত গেম হতে পারে। দীর্ঘ র্যালির বদলে কয়েকটি বলের মধ্যেই পয়েন্ট শেষ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
কিন্তু একটি সার্ভিস গেম যখন ডিউসে যাবে, তখনই বদলে যেতে পারে পুরো চিত্র।
কার হাতে উঠবে ট্রফি?
ফাইনালের আগে পরিসংখ্যান সাবালেঙ্কাকে সামান্য এগিয়ে রাখার যুক্তি দিতে পারে। বেশি প্রথম সার্ভ, বেশি উইনার, বেশি ব্রেক পয়েন্ট তৈরি—সব মিলিয়ে আক্রমণাত্মক টেনিসে তিনি কিছুটা এগিয়ে।
রিবাকিনার পাল্টা অস্ত্র আরও নির্দিষ্ট—প্রথম সার্ভ ঢুকলে সেটি থেকে পয়েন্ট জয়ের অসাধারণ হার, কম ব্রেক পয়েন্টের মুখোমুখি হওয়া এবং সার্ভিস গেমকে তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন রাখা।
সুতরাং ম্যাচের সমীকরণটা অনেকটা এমন—সাবালেঙ্কা চাইবেন ম্যাচটিকে তার গতিতে খেলতে। রিবাকিনা চাইবেন সেটি নিজের সার্ভের ছন্দে আটকে রাখতে।
সাবালেঙ্কা যদি প্রথম বল থেকেই আক্রমণ করতে পারেন এবং ভুলের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখেন, তার জয়ের সম্ভাবনা বাড়বে। রিবাকিনা যদি প্রথম সার্ভের কার্যকারিতা ধরে রেখে সাবালেঙ্কার শক্তিশালী রিটার্নকে নিষ্ক্রিয় করতে পারেন, তাহলে ম্যাচ তার দিকেও ঘুরে যেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়তে পারে কয়েকটি পয়েন্টই
এক নম্বর বনাম দুই নম্বর। ৫-৫ মুখোমুখি লড়াই। দুজনই অপরাজিত। সার্ভে শক্তির প্রদর্শন। রিটার্নে চাপ তৈরির ক্ষমতা। টাইব্রেকেও আত্মবিশ্বাস।
সব মিলিয়ে ইউএস ওপেনের মেয়েদের এককের ফাইনাল যেন আগে থেকেই লেখা কোনো গল্প নয়। এখানে কোনো পক্ষের জন্য সহজ পথ নেই।
নিউইয়র্কে তাই শেষ পর্যন্ত হয়তো বড় কোনো ব্যবধানের ম্যাচ নয়, বরং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের লড়াই দেখা যাবে।
একটি দুর্দান্ত রিটার্ন সাবালেঙ্কাকে এগিয়ে দিতে পারে। একটি এস রিবাকিনাকে বাঁচিয়ে দিতে পারে। একটি দ্বিতীয় সার্ভের ভুল ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
আর সেই কারণেই সাবালেঙ্কা-রিবাকিনা ফাইনাল শুধু বিশ্বের এক ও দুই নম্বরের লড়াই নয়। এটি দুই ধরনের শক্তির মুখোমুখি দাঁড়ানো—বিস্ফোরক আক্রমণ বনাম নিখুঁত সার্ভ, চাপ তৈরি করা বনাম চাপ সামলে রাখা।
আর্থার অ্যাশ স্টেডিয়ামে শেষ পর্যন্ত যে-ই ট্রফি তুলুন, নিউইয়র্কের এই রাতের গল্প লেখা হবে খুব ছোট ছোট ব্যবধানে।
সময়ের আলো/টিকে