নড়াইলের বিলগুলোতে একসময় শামুকের বেশ প্রাচুর্য ছিল। বর্ষা ও শীত- এই দুই মৌসুমে বিলের পানিতে, কাদায় ও জলজ উদ্ভিদের আশপাশে অসংখ্য শামুক দেখা যেত। এগুলো ছিল বিলের জলজ পরিবেশের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মাছ, হাঁসসহ বিভিন্ন জলজ ও পরিযায়ী পাখির খাদ্যের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল এই শামুক। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বিল ও জলাশয় থেকে নির্বিচারে শামুক সংগ্রহ করায় সেই চিরচেনা চিত্র বদলে গেছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ শামুক তুলে নেওয়ায় বিলগুলোতে শামুকের উপস্থিতি আশঙ্কাজনক হারে কমে এসেছে।
শামুক কমে যাওয়ায় এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে পুরো জলজ পরিবেশে। কমছে বিভিন্ন পাখির খাদ্যের প্রাপ্যতা, বদলে যাচ্ছে বিলের স্বাভাবিক খাদ্যশৃঙ্খল। কোথাও কোথাও পানির স্বাভাবিক পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে। ফলে হুমকির মুখে পড়ছে মাছ, জলজ উদ্ভিদ, পাখি ও অন্যান্য ক্ষুদ্র প্রাণীর আবাসস্থল।
সরেজমিন দেখা গেছে, ভোর থেকেই দলবেঁধে শামুক সংগ্রহ করছেন নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন বয়সি মানুষ। শামুক সংগ্রহ করতে পিছিয়ে নেই শিশুরা পর্যন্ত। কেউ হাতে, কেউ ঝুড়ি বা বস্তা ব্যবহার করে বিলের অগভীর পানি ও কাদামাটি থেকে শামুক তুলে নিচ্ছেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জমে উঠছে বিপুল পরিমাণ শামুক।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সংগৃহীত শামুকের একটি অংশ স্থানীয়ভাবে বিক্রি হয়। আবার বড় একটি অংশ বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। শামুকের খোসা ও মাংস বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় এর ভালো চাহিদা রয়েছে। ফলে চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এর আহরণ।
স্থানীয় বাসিন্দা মিলন শেখ বলেন, বিল থেকে যারা শামুক কুড়াচ্ছে, ছোট শামুকও তাদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। প্রজননক্ষম হওয়ার আগেই ছোট শামুক তুলে নেওয়ায় প্রাকৃতিকভাবে এর বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিল থেকে শামুকের স্বাভাবিক অস্তিত্বই সংকটে পড়তে পারে। স্থানীয় পরিবেশকর্মীরাও একই আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।
পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, একটি জলাশয়ের জীববৈচিত্র্য টিকে থাকে অসংখ্য জীবের পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ওপর। শামুকও সেই ব্যবস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, পাখি ও জলজ প্রাণীর খাদ্য হিসেবে শামুক ব্যবহৃত হয়। আবার জলজ পরিবেশে জৈব পদার্থের প্রক্রিয়াকরণ ও পুষ্টি উপাদানের পুনর্ব্যবচনেও শামুক বড় ভূমিকা রাখে। ফলে কোনো বিল বা জলাশয় থেকে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ শামুক সরিয়ে ফেললে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে খাদ্যশৃঙ্খলের অন্য স্তরেও।
নড়াইলের বিভিন্ন বিল শীত মৌসুমে অতিথি পাখির অন্যতম প্রধান বিচরণক্ষেত্র। প্রতি বছর শীতের শুরুতে দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখি এসব জলাশয়ে আসে। তবে স্থানীয়দের দাবি, আগের তুলনায় অনেক বিলেই অতিথি পাখির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। শামুক নিধনের ফলে খাদ্য সংকট দেখা দেওয়ায় বিলগুলোতে শীত মৌসুমে পাখির বিচরণ কমে গেছে বলেই তাদের ধারণা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শামুক সংগ্রহের সময় অনেক ক্ষেত্রেই বিলের তলদেশের কাদা ও পলি ব্যাপকভাবে নাড়াচাড়া করা হয়। এতে পানিতে অতিরিক্ত পলি ও জৈব পদার্থ মিশে পানির স্বচ্ছতা কমতে পারে। একই সঙ্গে বিলের তলদেশের ক্ষুদ্র জীব ও জলজ উদ্ভিদের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, শামুক সংগ্রহের পর অনেক স্থানে শামুকের খোসা, মৃত শামুক ও অন্যান্য বর্জ্য ফেলে রাখা হয়। এগুলো পচে গেলে পানিতে দুর্গন্ধ সৃষ্টি এবং পানির গুণগত মানের অবনতি ঘটতে পারে।
শামুক সংগ্রহের সঙ্গে জড়িত কতিপয় ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেকেই জীবিকার তাগিদেই এই কাজ করেন। তাদের মতে, অন্য কাজের সুযোগ সীমিত থাকায় বিল থেকে শামুক সংগ্রহ করে বিক্রি করেই তাদের সংসার চালাতে হয়। তবে পরিবেশকর্মীদের প্রশ্ন জীবিকার প্রয়োজন থাকলেও কি কোনো জলজ সম্পদ এভাবে নির্বিচারে আহরণ করা যায়?
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিলগুলোতে নিয়মিত নজরদারি না থাকায় শামুক আহরণকারীরা অনেকটাই নির্বিঘে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। কোথাও কোথাও দিনের পর দিন শামুক সংগ্রহ চললেও তা কার্যকরভাবে বন্ধের কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। তাদের দাবি, জেলার গুরুত্বপূর্ণ বিল ও জলাশয় চিহ্নিত করে সেখানে শামুকসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর বর্তমান অবস্থা নিয়ে দ্রুত জরিপ চালানো দরকার। কোন এলাকায় কতটা শামুক আহরণ হচ্ছে, কোথায় এর সংখ্যা কমছে এবং এর সঙ্গে মাছ ও পাখির উপস্থিতির কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না- সেসব বিষয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করা জরুরি।
পরিবেশবিদ ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, নড়াইলের বিলগুলোতে শামুকের নির্বিচার আহরণ বন্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে শামুকের প্রজনন, জলাভূমির জীববৈচিত্র্য এবং অতিথি পাখির খাদ্যশৃঙ্খলের ওপর এর প্রভাব নিয়ে গভীর বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর নড়াইলের উপপরিচালক কৃষবিদ মোহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, শামুক মাটির উর্বরাশক্তি বৃদ্ধি করে। শামুক মাটির নিচে চলাফেরা করার সময় মাটি আলগা করে, যার ফলে মাটিতে বাতাস চলাচলের পথ তৈরি হয়। এ ছাড়া এদের বর্জ্য মাটিতে মিশে মাটির উর্বরাশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে।
নড়াইল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, শামুক পানির ফিল্টার হিসেবে কাজ করে। পানির নিচে যে দূষিত পদার্থ থাকে, সেগুলোকে পরিশোধিত করে পানিকে বিশুদ্ধ রেখে মাছের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে। তবে দিন দিন কিছু অসাধু মৎস্যচাষি নির্বিচারে এই শামুক নিধন করে মাছের (চিংড়ির) খাবারসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করছে, যা প্রাকৃতিক পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলছে। যারা এই কাজগুলো করছে, তাদের আমরা নিরুৎসাহ করছি এবং পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি করছি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে সাড়ে চারশ প্রজাতির শামুক থাকলেও বিল অঞ্চলে সাধারণত ‘অ্যাপল শামুক’ বেশি পাওয়া যায়। অ্যাপল শামুক বাণিজ্যিক দিক থেকে বেশি মূল্যবান। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংক্রান্ত আইনে কয়েকটি প্রজাতির শামুক সংরক্ষণের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও দেশের অভ্যন্তরে বহু আহরিত ও পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘অ্যাপল শামুক’-এর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট উল্লেখ না থাকায় এই প্রজাতির শামুক অতিরিক্ত আহরণ নিয়ন্ত্রণে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
জানা গেছে, ‘দেশীয় প্রজাতির মাছ এবং শামুক সংরক্ষণ ও উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় প্রকল্পভুক্ত ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের ১০টি জেলার ৫২টি উপজেলায় স্থানীয় জ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাইলটিং আকারে বেশ কিছু শামুক প্রদর্শনী খামার স্থাপন করা হয়। এসব খামারে প্রকৃতি থেকে শামুক অথবা শামুকের স্পিউট সংগ্রহ করে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পুকুরে লালন-পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে এই প্রকল্পে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে শামুকের কাঙ্ক্ষিত প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রত্যাশিত মাত্রায় শামুক উৎপাদন বা বাণিজ্যিক পর্যায়ে শামুক চাষের প্রযুক্তি কার্যকর করা যায়নি। এর ফলে প্রকৃতি থেকে শামুক সংগ্রহের ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যও পুরোপুরি অর্জিত হয়নি।
সময়ের আলো/এনএন