রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে প্রথমবারের মতো সম্পন্ন হয়েছে হাঁটু প্রতিস্থাপন অস্ত্রোপচার। দীর্ঘদিন ধরে অস্টিও আর্থ্রাইটিসে ভুগতে থাকা চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৬০ বছর বয়সী বিবিজান নামে রোগীর হাঁটুতে সফলভাবে এ অস্ত্রোপচার করা হয়। এর মধ্য দিয়ে উত্তরাঞ্চলের সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় যুক্ত হলো আধুনিক ও জটিল এই চিকিৎসা সুবিধা।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রামেক হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স সার্জারি বিভাগে অস্ত্রোপচারটি সম্পন্ন হয়। অর্থোপেডিক্স সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. আলমগীর হোসেনের নেতৃত্বে অস্ত্রোপচারটি করা হয়। এতে অংশ নেন সহযোগী অধ্যাপক ডা. মনোয়ার তারিক সাবু, সহযোগী অধ্যাপক ডা. সফিকুল ইসলাম, সহকারী অধ্যাপক ডা. সাইদ আহমেদ, সহযোগী অধ্যাপক ডা. মাতিউল ইসলাম ও ডা. সালেহীন।
বিবিজান দীর্ঘদিন ধরে হাঁটুর তীব্র ব্যথা ও ক্ষয়জনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। একপর্যায়ে তার হাঁটুর ক্ষয়ের মাত্রা এতটাই বেড়ে যায় যে, স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
চিকিৎসকরা জানান, অস্টিও আর্থ্রাইটিসের কারণে হাঁটুর জয়েন্টের কার্টিলেজ ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে গেলে হাড়ের সঙ্গে হাড়ের ঘর্ষণ তৈরি হয়। এতে প্রচণ্ড ব্যথা, হাঁটু বাঁকা হয়ে যাওয়া এবং হাঁটাচলায় জটিলতা দেখা দিতে পারে। ক্ষয়ের মাত্রা গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছালে অনেক ক্ষেত্রে হাঁটু প্রতিস্থাপনই কার্যকর চিকিৎসা হিসেবে বিবেচিত হয়।
ডা. মনোয়ার তারিক সাবু জানান, হাঁটুর ওপরের দিকে দুটি হাড় থাকে। এই অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে পিবিয়ার ওপরের অংশ ৯ মিলিমিটার কাটা হয়। আর খিমারের নিচের অংশ কাটা হয় ৯ মিলিমিটার। এরপর মেটালের আর্টিফিশিয়াল একটি হাঁটু লাগিয়ে দেওয়া হয়। এই হাঁটু খুবই উন্নতমানের। দাম প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। বিবিজানের এক পায়ে এ হাঁটু লাগানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ঢাকায় এই অপারেশন অনেক হয়। তবে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এটাই প্রথম। হাসপাতালে অপারেশন করতে দুই ঘণ্টা সময় লেগেছে। ছয়জনের টিম মিলে এই অপারেশন করা হয়েছে। দেশে বিদেশে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর চিকিৎসকরা এই অপারেশন করেছেন।
প্রফেসর আলমগীর হোসেন জানান, এই অপারেশনের ফলে রোগীর হাটু আগের মত স্বাভাবিক হয়ে যাবে এবং তিনি চলাফেরা সব কিছু করতে পারবেন। শুধু নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে। এখন থেকে সরকারি হাসপাতালে এই অপারেশনের ধারা চলমান থাকবে। এর ফলে উত্তরবঙ্গের মানুষ উপকৃত হবে। পাশাপাশি ঢাকা বা বিদেশ যাওয়ার কষ্ট লাঘব হবে।
চিকিৎসকদের মতে, উত্তরাঞ্চলের রোগীদের জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এতদিন জটিল হাঁটুর চিকিৎসার জন্য অনেক রোগীকেই ঢাকায় যেতে হত। আর্থিক সামর্থ্য থাকলে কেউ কেউ দেশের বাইরে গিয়েও চিকিৎসা নিতেন। ফলে চিকিৎসা ব্যয়ের পাশাপাশি রোগী ও স্বজনদের সময়, যাতায়াত ও আবাসন ব্যয়ও বহন করতে হত।
রামেক হাসপাতালে নিয়মিতভাবে হাঁটু প্রতিস্থাপন অস্ত্রোপচার চালু হলে রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার রোগীরা নিজ অঞ্চলে উন্নত এই চিকিৎসা সুবিধা পাবেন। এতে ঢাকামুখী রোগীর চাপ কমার পাশাপাশি রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তিও অনেকটা কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থোপেডিক্স বিভাগের চিকিৎসকরা বলছেন, বয়স্ক মানুষের মধ্যে হাঁটুর ক্ষয়জনিত সমস্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। দীর্ঘদিনের অস্টিও আর্থ্রাইটিস, অতিরিক্ত ওজন, পুরোনো আঘাতসহ বিভিন্ন কারণে হাঁটুর জয়েন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া গেলে অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার এড়ানো সম্ভব। তবে ক্ষয় অত্যন্ত বেশি হলে হাঁটু প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে।
রামেক হাসপাতালে প্রথম হাঁটু প্রতিস্থাপন অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় বিভাগের চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টরা এটিকে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখছেন। তাদের আশা, পর্যায়ক্রমে আরও রোগীকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় এই আধুনিক চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হবে। এর ফলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল শুধু উত্তরাঞ্চলের বৃহৎ চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবেই নয়, জটিল অর্থোপেডিক্স সার্জারির ক্ষেত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা।
সময়ের আলো/এনএন