নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার বালুভরা ইউনিয়নে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় দুস্থ নারীদের খাদ্য সহায়তার জন্য দেওয়া ‘ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট (ভিডব্লিউবি)’ কার্ড বিতরণে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত দুস্থদের বাদ দিয়ে সচ্ছল পরিবার, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় ইউনিয়নের দরিদ্র মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত দুস্থদের তালিকাভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, দুস্থ নারীদের পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার এ কর্মসূচির পূর্ব নাম ছিল ভিজিডি। ২০২২ সালের ১৬ অক্টোবর পরিপত্রের মাধ্যমে কর্মসূচিটির নাম ভিডব্লিউবি করা হয়। বালুভরা ইউনিয়নে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ কর্মসূচির আওতায় ১৮৬ জন উপকারভোগী রয়েছেন। কর্মসূচির আওতায় দুস্থ নারীদের পরিবারকে প্রতি মাসে ৩০ কেজি চাল দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভিডব্লিউবি কর্মসূচির আওতায় প্রকৃত দুস্থ নারীদের পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার নিয়ম থাকলেও বালুভরা ইউনিয়নে তা যথাযথভাবে মানা হয়নি। ইউপি চেয়ারম্যান আল এমরান হোসেনের পছন্দের ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তালিকায় সচ্ছল পরিবার, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের নাম থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের কোমারপুর গ্রামের গৃহবধূ হাফিজা সুলতানার নামে রয়েছে একটি ভিডব্লিউবি কার্ড। স্থানীয়দের দাবি, তার স্বামী ওয়াসিম আলী ধান ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাদের ইটের পাকা বাড়ি রয়েছে এবং কয়েক বিঘা জমিও আছে। পাশাপাশি তারা জমি বন্ধক নিয়ে চাষাবাদ করেন। ওয়াসিম আলী ইউনিয়ন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় তার স্ত্রীর নামে কার্ড দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।
হাফিজা সুলতানা বলেন, কয়েক মাস ধরে তিনি ভিডব্লিউবির চাল পাচ্ছেন। ভোটার আইডি কার্ড দিয়ে তার নামে কার্ড করে দেওয়া হয়েছে। তার শ্বশুর আব্দুস সাত্তার বলে,, তারা তিন বিঘা জমি বন্ধক নিয়ে চাষাবাদ করেন। সরকারি ভিডব্লিউবি কর্মসূচির চাল পেয়ে তারা উপকৃত হচ্ছেন।
১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আনন্দ কুমার শীল বলেন, তার ওয়ার্ডে কোনো সচ্ছল পরিবারের ভিডব্লিউবি সুবিধা পাওয়ার কথা তার জানা নেই। তবে ধান ব্যবসায়ী ও পাকা বাড়ির মালিক ওয়াসিম আলী এবং তার স্ত্রী হাফিজা সুলতানার নাম উল্লেখ করলে তিনি বলেন, ওই পরিবারকে ইউপি চেয়ারম্যান আল এমরান হোসেন কার্ড দিয়েছেন।
এদিকে ইউনিয়নের সংরক্ষিত ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের নারী ইউপি সদস্য শিউলি বেগমের ছেলে সুমনের স্ত্রী সাম্মী আক্তারের নামও ভিডব্লিউবি তালিকায় রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, শিউলি বেগম, তার ছেলে ও ছেলের স্ত্রী একই বাড়িতে বসবাস করেন এবং তাদের ৪ থেকে ৫ বিঘা ফসলি জমি রয়েছে।
এ বিষয়ে শিউলি বেগম বলেন, তার ছেলের স্ত্রীর নামে কার্ড হলেও ওই কার্ডের চাল অন্য একজনকে দেওয়া হয়। ভোটার আইডি কার্ডের সমস্যার কারণে ওই সময় তার ছেলের স্ত্রীর নামে কার্ড করা হয়েছিল।
৭ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম বালুভরা গ্রামের খোরশেদ আলী সাগিদারের স্ত্রী লাভলী বেগমের নামেও ভিডব্লিউবি কার্ড রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, খোরশেদ আলী সাগিদার ওই গ্রামের বাসিন্দা হলেও প্রায় ১৫ বছর আগে পাশের নওগাঁ সদর উপজেলার কীর্ত্তীপুর ইউনিয়নের শালুকান গ্রামে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তাদের ইটের পাকা বাড়ি রয়েছে। তবে তারা ভিডব্লিউবির চাল পান না বলেও স্থানীয়দের কেউ কেউ জানিয়েছেন। এলাকাবাসী খোরশেদ আলী সাগিদারকে চিনলেও লাভলী বেগমকে চেনেন না বলে দাবি করেছেন।
৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আক্কাস আলী বলেন, খোরশেদ আলী সাগিদার নামে ওই এলাকায় একজন ব্যক্তি রয়েছেন। তারা ভিডব্লিউবির চাল পান।
অভিযোগের বিষয়ে বালুভরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আল এমরান হোসেন বলেন, প্রায় এক বছর আগে ভিডব্লিউবির কার্ডগুলো বিতরণ করা হয়েছে। তালিকায় কীভাবে নাম এসেছে, তা তার জানা নেই। তিনি বলেন, এ বিষয়ে কোনো অনিয়ম হয়নি। এর বেশি কিছু তিনি বলতে চান না।
বদলগাছী উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা ফারুক আহমেদ বলেন, প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে ভিডব্লিউবি উপকারভোগী যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি কমিটি রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান ওই কমিটির সভাপতি। ইউপি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে কমিটি প্রস্তাবনা পাঠানোর পর তা অনুমোদন করা হয়। কোনো সচ্ছল পরিবারের নাম তালিকায় থাকলে ছয় মাসের মধ্যে তা সংশোধনের সুযোগ রয়েছে। তবে বর্তমানে সেই সুযোগ নেই।
সময়ের আলো/জোই