বোরো ধানের লোকসান পুষিয়ে নিতে আউশ চাষ করেও লোকসান গুনতে হচ্ছে নওগাঁর কৃষকদের। ফলে দেশের অন্যতম খাদ্য উদ্বৃত্ত এই জেলার ধান চাষিদের মুখে নেই হাসি। মাঠভরা ফসল ঘরে তোলার আনন্দের বদলে তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা ও হতাশা। বাজারে ধানের দরপতনের কারণে উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
চালকল মালিকদের দাবি, বাজারে ধানের দরপতনের অন্যতম কারণ চাল আমদানি ও গত বোরো মৌসুমে ভালো ফলন। শুধু আউশ মৌসুমেই নয়, সামনে আমন মৌসুমেও কৃষকরা ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে নওগাঁয় ৫১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের আবাদ হয়েছিল। এবার আবাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮ হাজার ৪৭৩ হেক্টরে। এর মধ্যে মহাদেবপুর উপজেলাতেই ১৫ হাজার ৩১৫ হেক্টর জমিতে পারিজা, বিনা ধান-১৯ ও ব্রি ধান-৯৮ জাতের আউশ ধানের চাষ হয়েছে।
নওগাঁর বিভিন্ন হাটে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিআর-১৯, বিআর-৫৬, বিআর-৫৮, বিআর-৫৫ ও পারিজা জাতের ধান বর্তমানে মানভেদে প্রতি মণ ৬৮০ থেকে ৮৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কৃষকদের হিসাবে, এলাকাভেদে এক বিঘা জমিতে আউশ ধান উৎপাদনে খরচ হচ্ছে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। অথচ এক বিঘা জমির ধান বিক্রি করে প্রায় ওই পরিমাণ টাকাই পাওয়া যাচ্ছে। এতে কৃষকের নিজস্ব শ্রম ও পরিবহন খরচও লোকসানের হিসাবে চলে যাচ্ছে।
কৃষকরা জানান, গত বছরের তুলনায় এবার প্রতি মণ ধানের দাম ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। তাদের অভিযোগ, সরকারিভাবে আউশ ধান না কেনার সুযোগে ব্যাপারি ও মিলাররা সিন্ডিকেট করে ধানের দাম কমিয়ে দিয়েছেন।
মহাদেবপুর উপজেলার রাইগাঁ এলাকার কৃষক রহমত আলী বলেন, ‘সার, ডিজেল আর কীটনাশকের যে দাম, তাতে বিঘাপ্রতি ১৩ হাজার টাকার ওপর খরচ হয়ে গেছে। হাটে ধান বিক্রি করলাম ৮০০ টাকা মণে। গাড়ি ভাড়া আর নিজের খাটুনি বাদ দিলে পকেটে কিছুই থাকে না। উল্টো পাওনাদারের চাপে এই দামেই বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি।’
উত্তরগ্রামের কৃষক আব্দুল আজিজ বলেন, ‘ফলন ভালো হলেও দাম পাই না, আর ফলন খারাপ হলেও তো মরণ! ধান বিক্রির সময় ব্যবসায়ী ও মিলাররা জিম্মি করে কম দামে ধান হাতিয়ে নেওয়ার এক পুরোনো ফন্দি।’
মোল্লাকুড়ি এলাকার কৃষক আক্তার হোসেন বলেন, ‘গত বছরও যে ধান ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, এবার সেই ধানের দাম এক লাফে মণপ্রতি ৪০০ টাকা কমে গেছে। খরচের টাকাই যদি না ওঠে, তবে আমন মৌসুমে সেচ, সার ও শ্রমিকের টাকা কীভাবে দেব?’
নওগাঁর চকগৌরি এলাকার ধান ব্যবসায়ী শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আউশ ধান বাজারে আসার পর থেকেই দর কমতে শুরু করেছে। বর্তমানে ধানের বাজার নিম্নমুখী। কৃষকের উৎপাদন খরচ যখন ঊর্ধ্বমুখী, ঠিক তখনই বাজারদর নেমে গেছে। এতে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ওপর।’
নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, ‘গত বছর অতিরিক্ত চাল আমদানির কারণে বর্তমানে বাজারে পর্যাপ্ত চাল মজুত রয়েছে। ফলে মোকামে চালের চাহিদা কমে যাওয়ায় মিলমালিকরা ধান কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। এই আমদানির প্রভাব যদি কাটানো না যায়, তবে আমনের ভরা মৌসুমেও কৃষকরা ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাজার চাঙ্গা করতে ও কৃষকদের বাঁচাতে অবিলম্বে সরকারিভাবে আউশ ধান ও চাল কেনার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’
নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর রহমান বলেন, ‘প্রতি একর আউশ ধান উৎপাদনে কৃষকের গড় খরচ হয়েছে ৬৪ হাজার টাকা। প্রতি মণ ধান ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা দরে বিক্রি করতে পারলে কৃষক লাভবান হতে পারতেন।’
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ফরহাদ খোন্দকার বলেন, ‘ধানের দাম কমে যাওয়ায় কৃষকরা কীভাবে উৎপাদন খরচ তুলবেন, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। কৃষকরা যাতে ন্যায্য দাম পান, সে জন্য আউশ মৌসুমে সরকারিভাবে চাল কেনার পাশাপাশি ধান থেকে বায়োফুয়েল উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য ব্যবসায়ীদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’
সময়ের আলো/এসএকে