ইসলামের পবিত্র নগরী মক্কার কাছে একটি হুতি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে সৌদি আরব। মঙ্গলবারের এ ঘটনায় ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংগঠন থেকেও নিন্দা জানানো হয়েছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনীর মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি অভিযোগ করেন, হুথিরা মক্কাকে লক্ষ্য করে ড্রোন পাঠিয়েছিল। তার দাবি, প্রায় এক দশকের মধ্যে এটাই প্রথমবারের মতো গোষ্ঠীটি মক্কাকে লক্ষ্য করেছে।
তিনি বলেন, পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তা সৌদি আরবের জন্য ‘রেড লাইন’। এ ধরনের ঘটনায় প্রয়োজনীয় ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে সৌদি আরব পিছপা হবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।
তবে সৌদি আরবের এই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে হুথিরা। গোষ্ঠীটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেন, তাদের লক্ষ্য ছিল সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটি, যেগুলো পবিত্র স্থানগুলো থেকে অনেক দূরে অবস্থিত।
মক্কাকে লক্ষ্য করে কোনো হামলার পরিকল্পনা তাদের ছিল না উল্লেখ করে সারি সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্যকে ‘মিথ্যা ও অপপ্রচার’ বলে দাবি করেন।
তার ভাষ্য, ইয়েমেন থেকে মক্কার পবিত্র স্থাপনাগুলোর জন্য কোনো ধরনের হুমকি নেই।
সৌদি আরব জানিয়েছে, ড্রোনটি মক্কার নিয়ন্ত্রিত আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই শনাক্ত ও ধ্বংস করা হয়। তবে শহরটি থেকে ড্রোনটি ঠিক কতটা দূরে ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
এদিকে হুতিদের সাম্প্রতিক হামলা ও ইয়েমেনে তাদের অগ্রযাত্রার কারণে সৌদি আরব নতুন করে আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাতের মধ্যেই ইয়েমেন ও সৌদি আরবের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ছে।
মক্কা মুসলিমদের কাছে সর্বাধিক পবিত্র স্থানগুলোর একটি এবং এটি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মস্থান। সামর্থ্য থাকলে প্রত্যেক মুসলমানের জীবনে অন্তত একবার মক্কায় হজ পালন করা ধর্মীয় কর্তব্য। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ সেখানে সমবেত হন।
সৌদি জোট বাহিনীর মুখপাত্র আল-মালিকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় এই ঘটনাকে মুসলিমদের অনুভূতিতে আঘাত ও উসকানি দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন।
ওআইসি ও পাকিস্তানের নিন্দা
ঘটনাটির নিন্দা জানিয়েছে ৫৭ সদস্যের সংগঠন অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি)। সংগঠনটি বলেছে, এ ধরনের হামলা পবিত্র স্থান ও মসজিদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
সৌদি আরবের সঙ্গে সম্প্রতি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও ঘটনাটিকে কঠোর ভাষায় নিন্দা করেছেন। যদিও তার বিবৃতিতে সরাসরি হুথিদের নাম উল্লেখ করা হয়নি, তবে তিনি সৌদি আরবের প্রতি পাকিস্তানের সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
মক্কার কাছে ড্রোন ধ্বংসের ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে হুথিদের হামলা বেড়েছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে খামিস মুশাইত, আবহা ও তাইফসহ কয়েকটি শহরে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। এসব হামলায় অন্তত ১৩ জন বেসামরিক ব্যক্তি আহত হয়েছে বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
রোববার সৌদি সামরিক ঘাঁটিতে হামলার দায়ও হুথিরা স্বীকার করে। বুধবার তারা লোহিত সাগরের বন্দরনগরী ইয়ানবুতে সৌদি আরামকোর একটি স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে।
এর জবাবে সৌদি বাহিনী ইয়েমেনে হুথি নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে হুথিরা।
লোহিত সাগরে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ
ইয়েমেনে সাম্প্রতিক সময়ে হুথিদের সামরিক তৎপরতা আরও বেড়েছে। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা নতুন কিছু এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। গত সপ্তাহে লোহিত সাগরের একটি বন্দরনগরী এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের কাছে একটি দ্বীপও দখলের দাবি করেছে তারা।
এদিকে ইরাকভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার পর সৌদি আরবের প্রধান লোহিত সাগরীয় তেল রফতানি টার্মিনাল ইয়ানবু থেকে তেল পাঠানো সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে। কবে থেকে আবার তেল রফতানি শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট সময় জানানো হয়নি।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ও তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিও চাপের মুখে রয়েছে।
এসব পরিস্থিতির প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গত সপ্তাহে তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ