চট্টগ্রাম বিভাগে হামে আক্রান্ত ৩০০ শিশুর ওপর চালানো যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের ৮৫.২ শতাংশই টিকা পায়নি। আক্রান্ত শিশুদের ৩১ শতাংশ তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছিল। এসব শিশুর শারীরিক জটিলতা ও হামে আক্রান্ত হওয়ার পেছনে অপুষ্টি অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে উঠে এসেছে। এ ছাড়া আক্রান্ত শিশুদের নমুনায় শতভাগ ক্ষেত্রে ‘বি৩ জেনোটাইপ’ ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।
বুধবার দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে আয়োজিত গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের পেডিয়াট্রিক রিসার্চ গ্রুপ যৌথভাবে গবেষণাটি পরিচালনা করে। এতে আর্থিক ও সার্বিক সহায়তা দিয়েছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। গবেষণায় ২ মাস থেকে ১১ বছর বয়সি ৩০০ শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাদের মধ্যে ১১ শতাংশের বয়স ছিল ৬ মাসের নিচে, ২৩.৫ শতাংশের ১ থেকে ৫ বছর এবং ৪৬ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম। অর্থাৎ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু নিয়মিত টিকাদানের নির্ধারিত বয়সে পৌঁছানোর আগেই হামে আক্রান্ত হয়েছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, টিকাবিহীন শিশুদের ৫২ শতাংশের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের অসচেতনতা বা টিকার তারিখ ভুলে যাওয়াকে প্রধান কারণ হিসেবে পাওয়া গেছে। গত ছয় মাসে মাত্র ৩২.১ শতাংশ শিশু ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল পেয়েছে। ভিটামিন ‘এ’ না পাওয়া শিশুদের ৫৯ শতাংশ গুরুতর জটিলতায় ভুগেছে।
আক্রান্তদের ৭৫.৫ শতাংশ শিশু গ্রামীণ এলাকার এবং ৬৪.৮ শতাংশ নিম্ন আর্থ-সামাজিক পরিবারের। সংক্রমণের উৎস বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৫৯.৪ শতাংশ শিশু কোনো না কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা হাসপাতাল থেকে সংক্রমিত হয়েছে। গবেষকদের মতে, এ তথ্য হাসপাতালগুলোর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতার বিষয়টি নির্দেশ করে। আর ১৬.৩ শতাংশ শিশু আগে হামে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছিল।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, ১৮.৯ শতাংশ শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো হয়নি। গবেষকদের মতে, এসব শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক দুর্বল ছিল।
গবেষণার ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং পরীক্ষায় শতভাগ নমুনায় ‘বি৩ জেনোটাইপ’ শনাক্ত হয়েছে। গবেষকদের মতে, এ ফল আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে পূর্বে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দিন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. মো. জসিম উদ্দিনসহ বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসক ও গবেষকরা।
মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। এতে কোনো শিশুর মৃত্যু গ্রহণযোগ্য নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক শিশু টিকার বয়স হওয়ার আগেই আক্রান্ত হচ্ছে। তাই সময়মতো সঠিক নিয়মে টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে। তিনি টিকার কভারেজ ৯৫ শতাংশে উন্নীত করা, অপুষ্টি দূর করা, প্রয়োজনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকাদান এবং হাসপাতালগুলোর সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করার নির্দেশ দেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এসপেরিয়া হেলথ কেয়ার লিমিটেডের চেয়ারম্যান গোলাম বাকি মাসুদ। তিনি বলেন, গবেষণার ফলাফলকে শুধু বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনে সীমাবদ্ধ না রেখে এর উপাত্ত বাস্তবভিত্তিক জনস্বাস্থ্য উদ্যোগে কাজে লাগাতে হবে। গবেষণার মূল উদ্দেশ্য তথ্য তৈরি করা নয়, বরং জীবন বাঁচানো।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা